kalerkantho


টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র

নিম্নমানের খাবার, নিবাসীদের অরুচি

মো. মাহবুুবুল আলম, টঙ্গী (গাজীপুর)   

৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



ঢাকার ইব্রাহীমপুর এলাকার দরিদ্র রিকশাচালক আবু জাফর আধা কেজি গরুর মাংস রান্না করে নিয়ে এসেছেন ছেলের জন্য। ছেলে বলেছে, মাংস দিয়ে পেটপুরে ভাত খাবে। টঙ্গীর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের গেটে এমন অনেকেই ছেলের জন্য রান্না করা খাবার নিয়ে অপেক্ষা করেন। কারণ পেটপুরে নাকি খেতে পায় না কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের অপরাধী কিশোররা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে জনপ্রতি এক বেলা খাবার বাবদ বরাদ্দ ১৬ টাকা ৬৬ পয়সা। যার মধ্যে জ্বালানি খরচও অন্তর্ভুক্ত। এ অবস্থায় চাহিদা অনুসারে পুষ্টিসম্পন্ন খাদ্য পাচ্ছে না তারা। বাড়ন্ত কিশোরদের সরবরাহ করা খাবারে দেহের ক্ষয়পূরণ ও বৃদ্ধিসাধন ব্যাহত হচ্ছে। নিবাসী কিশোররা খাবারে বিশেষ অতৃপ্তি নিয়েই সংশোধনী কার্যকাল কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

গতকাল বৃহস্পতিবার মাসিক অভিভাবক দিবসে উন্নয়ন কেন্দ্রে সরেজমিনে গিয়ে কজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বর্তমান বাজার দরে এ সামান্য ওই অর্থে কেনা খাবারে কিশোররা মোটেই তুষ্ট নয়। নিয়ম অনুসারে ভাত, মাছ, সবজি, মাংস ও ডাল প্রতিদিনের খাবার তালিকায় থাকলেও যা তাদের পাতে দেওয়া হয়, তা নিতান্তই সামান্য।

এ অবস্থায় কিশোররা এখানে থাকার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। মা-বাবার কাছে আবদার করছে হয় খাবার বাড়ি থেকে এনে দিতে, নয়তো এখান থেকে মুক্তি দিতে। সপ্তাহে এক টুকরা মাংস তারা খেতে চায় না।

অভিভাবক দিবসে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, অনেক অভিভাবক বাড়ি থেকে রান্না করা খাবার নিয়ে এসেছেন। তাঁরা জানান, কেন্দ্রের খাবারে পেট ভরে না, মন ভরে না তাই সারা মাস ছেলেরা বাড়ির খাবারের জন্য অপেক্ষায় থাকে।

দেশে ক্রমবর্ধমান শিশু-কিশোর অপরাধপ্রবণতা নিয়ন্ত্রণে ‘শাস্তি নয়, সংশোধন’—এ স্লোগানকে সামনে রেখে ১৯৭৮ সালে টঙ্গীতে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় কিশোর অপরাধী সংশোধনী প্রতিষ্ঠান। দীর্ঘদিনেও প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক সময়োপযোগী ও আকর্ষণীয় করে তোলা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি অপরাধপ্রবণ শিশু-কিশোরদের মান উন্নয়নে আশানুরূপ ভূমিকা রাখতে পারছে না। দেশে শিশু-কিশোর অপরাধীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও এ প্রতিষ্ঠানে অভিভাবকরা অপরাধী শিশু-কিশোরদের ভর্তির ক্ষেত্রে তেমন আগ্রহী নয়।

নিবাসী কিশোর ফাহাদ হোসেনের বাবা সুলতান মাহমুদ বলেন, তাঁর ছেলে পুলিশ কেসে এই কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছে। এ বছর তাঁর জেএসসি পরীক্ষা দেওয়ার কথা থাকলেও সে পরীক্ষা দিতে পারছে না। কারণ কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে লেখাপড়ার সুযোগ রয়েছে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। শিশু আইন অনুসারে অনূর্ধ্ব ১৬ বছর বয়সী কিশোরদের এখানে থাকার কথা। কিন্তু এ বয়সী কিশোররা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার কথা থাকলেও এ কেন্দ্রে সেই সুযোগ নেই। কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে নেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো পৃথক টিচারস স্টাফ। এখানকার সাধারণ কর্মচারীরাই লেখাপড়ার দায়িত্বে নিয়োজিত। কেন্দ্রে সংশোধনী কার্যক্রমের পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণের যে ব্যবস্থা রয়েছে, তাও মান্ধাতা আমলের। প্রশিক্ষণের বিষয়গুলো হচ্ছে কাঠমিস্ত্রির কাজ, দর্জি, বৈদ্যুতিক মিস্ত্রির কাজ ও অটোমোবাইল।

অভিভাবকরা বলেন, প্রশিক্ষণের জন্য কম্পিউটারসহ আধুনিক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি। অভিভাবক হাবিবুর রহমান, ইশতিয়াক হোসেন, লতিফা পারভীন ও জান্নাতুন নেছা বলেন, তাঁদের সন্তানরা এখানে থাকতে চায় না। এখানে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বলতে কিছু নেই। বড় ছেলেরা ছোটদের প্রতি নির্দয় আচরণ করে। কোনো কোনো কর্মচারীর আচরণও ভালো নয়, তারা স্নেহের বদলে তিরস্কার করে। মৌসুমি ফল খেতে দেওয়া হয় না। প্রতি বৃহস্পতিবার ২০০ গ্রাম দুধ দেওয়া হয়, যা খাওয়ার উপযোগী নয়। তারা ঠিকমতো খাবারই যেখানে পায় না, সেখানে সংশোধন হবে কী করে? কেন্দ্রে ডাক্তার নেই, অসুস্থ হলে ভুগতে হয় দীর্ঘদিন।

বর্তমান কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে ৪২৪ জন কিশোর অবস্থান করছে। এদের মধ্যে ১৮০ জন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে, অন্যরা শিক্ষার সুযোগ থেকে বাইরে রয়েছে। বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছে ৮০ জন। বেশির ভাগ কিশোর মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থী। তারা বেশির ভাগ সময় অলস সময় কাটায়।

অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানকার ৯৫ শতাংশ কিশোরই নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্য। এখানকার শিক্ষা, খাদ্য, বিনোদন, প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য বিষয় মানসম্পন্ন না হওয়ায় শিক্ষিত, বিত্তশালী ও আধুনিক চিন্তা-চেতনার অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের এখানে ভর্তি করতে আগ্রহী হন না। অভিভাবকরা জানান, পুলিশ কেসে আটক কিশোরদের মধ্যে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ ত্রুটির কারণে বিদ্রোহ ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার ঘটনা ঘটে। পালিয়ে যাওয়া, সহপাঠী ও কেন্দ্রের কর্মকর্তাদের ওপর হামলা, আত্মহত্যার চেষ্টা ও ভাঙচুরের মতো ঘটনা কিশোরদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে, যা নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। কিশোরদের আকৃষ্ট করা ও অভিভাবকদের আগ্রহী করে তুলতে বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। পুলিশ কেসে আটকদের আদালতে আনা-নেওয়ার ব্যাপারে কোনো নিরাপত্তামূলকব্যবস্থা নেই। প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব যানবাহন না থাকায় দড়ি দিয়ে বেঁধে অথবা হাতকড়া লাগিয়ে সাধারণ পাবলিক বাসে তাদের আদালতে আনা-নেওয়া হয়।

তবে কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের তত্ত্বাবধায়ক জাহাঙ্গীর হোসেন চৌধুরী দাবি করেন, প্রচলিত নিয়ম অনুসারে এখানে সব কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারপ্রদত্ত বাজেট অনুসারে খাবার ও অন্যান্য সুবিধা দেওয়া হয়। সন্তানের প্রতি ভালোবাসার কারণে অভিভাবকরা তাঁদের জন্য খাবার নিয়ে আসতেই পারেন।


মন্তব্য