kalerkantho


কোটি টাকার আষাঢ়ে গল্প!

জাহাঙ্গীর হোসেন, রাজবাড়ী   

১১ নভেম্বর, ২০১৭ ০০:০০



কোটি টাকার আষাঢ়ে গল্প!

দশটি গ্রাম নিয়ে রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়ন। গত ১৫ ও ১৬ আষাঢ় এই গ্রামগুলোর কোথাও ওয়াজ মাহফিল ও নামযজ্ঞ হয়নি।

অথচ ওই দুই দিনে ১৪৭টি ওয়াজ মাহফিল এবং তিনটি নামযজ্ঞ অনুষ্ঠান দেখিয়ে ৪৫০ মেট্রিক টন সরকারি চাল উত্তোলন করা হয়েছে। যার বাজারমূল্য সোয়া কোটি টাকা। এমন ‘আষাঢ়ে গল্প’ (আজগুবি কথা) শুনে স্থানীয়রা হতবাক হয়েছেন।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রাজবাড়ীর ডিসির (জেলা প্রশাসক) ২৮ জুনের চিঠি মোতাবেক ১৫০টি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে খানাপিনার জন্য ৪৫০ মেট্রিক টন জিআর চাল বরাদ্দ করা হয়। ২৯ জুন পৃথক তিনটি চিঠির মাধ্যমে কালুখালীর ভারপ্রাপ্ত ইউএনও (উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা) মো. নাজমুল ইসলাম চালের ছাড়পত্র দেন। এরপর উপজেলা পিআইও (প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা) মো. মকসেদুল আলম ও কালিকাপুর ইউপি (ইউনিয়ন পরিষদ) চেয়ারম্যান আতিউর রহমান নবাব ভুয়া পিআইসি (বাস্তবায়ন কমিটি) দেখিয়ে সব চাল উত্তোলন করেন।

কালিকাপুর ইউনিয়নের গ্রামগুলো হচ্ছে ঝাউগ্রাম, শ্যামলবাড়ী, মৌকুড়ী, সামলাবাড়ী, চাঁদপুর, গোপালপুর, রায়নগর, আফড়াপাড়া, সাতটা ও কালিকাপুর। এসব গ্রামে মোট ভোটার ১০ হাজার। উত্তোলন করা চাল সব ভোটারকে দিলে তারা প্রত্যেকে ৪৫ কেজি করে চাল পেতেন।

উপজেলার রতনদিয়া বাজারের চাল ব্যবসায়ী সুরুজ আলী বলেন, ‘৩০ হাজার টাকা টন হিসেবে ৪৫০ মেট্রিক টন চালের বর্তমান বাজারমূল্য এক কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ইউনিয়নের একাধিক বাসিন্দা জানান, কালিকাপুর ইউপি চেয়ারম্যান আতিউর রহমান নবাব অত্যন্ত প্রভাবশালী ব্যক্তি। তিনি শুধু ইউপি চেয়ারম্যানই নন, ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতিও। তাঁর বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস গ্রামের মানুষের নেই। যে কারণে সাধারণ মানুষ তাঁর কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনাও করে না। তাঁরা আরো জানান, এ ইউনিয়নের কোথাও গত জুন থেকে এ পর্যন্ত ওয়াজ মাহফিল ও নামযজ্ঞ অনুষ্ঠান হয়নি।

কয়েকজন পিআইসি সভাপতি নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, চাল উত্তোলনের বিষয়টি তাঁরা কিছুই জানেন না। আবার অনেক কমিটির নাম-ঠিকানাও সঠিক না।

পাড়াবেলগাছী গ্রামের বাসিন্দা ও রায়নগর মাদরাসার শিক্ষক ইউনুস ক্বারি বলেন, ‘এ বছর এলাকাবাসীর উদ্যোগে ও আর্থিক সহযোগিতায় কালিকাপুর ইউনিয়নের ১৪টি স্থানে ওয়াজ মাহফিল হয়েছে, যা ফেব্রুয়ারি থেকে মার্চে শেষ হয়েছে। আমি প্রতিটি ওয়াজ মাহফিলেই দাওয়াত পাই। সেসব ওয়াজ মাহফিলে যোগদানও করি। ’ তাঁর দাবি, গত জুন থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত কালিকাপুরে কোনো ওয়াজ মাহফিল হয়নি এবং কোনো সরকারি বরাদ্দও পাওয়া যায়নি।

ইউপির ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য বিল্লাল মণ্ডল বলেন, ‘সব কাজ কি ঠিকমতো হয়? নয়ছয় তো করতেই হয়। আমার এলাকায় ১০টি ওয়াজ মাহফিল হওয়ার কথা ছিল। তবে কিছু করেছি। প্রতিটি ওয়াজ মাহফিলের জন্য মোটা অঙ্কের টাকা চেয়ারম্যান বরাদ্দ পেয়েছেন। ’ এ ওয়ার্ডের ঝাউগ্রামের মালেক বিশ্বাসের বাড়ির সামনের বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলের তিন মেট্রিক টন চাল বরাদ্দের কথা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ‘ওই নামে কাউকেই চিনি না। ’

কালুখালী উপজেলা আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদবিষয়ক সম্পাদক ও কালিকাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য রজব আলী বলেন, ‘এ দেশে শুধু শীতকালে ওয়াজ মাহফিল ও নামযজ্ঞ হয়। আষাঢ়ে প্রচুর বৃষ্টি হয়। এ সময় ওয়াজ ও নামযজ্ঞ করা যায় না, হয়ও না। ১০টি গ্রামে মাত্র দুই দিনে ১৫০টি ওয়াজ ও নামযজ্ঞ ম্যাজিশিয়ানও (জাদুকর) করতে পারবেন না। ফলে বরাদ্দ চাল ইউপি চেয়ারম্যান পিআইওর সহযোগিতায় আত্মসাৎ করেছেন। ’ অভিযুক্ত ইউপি চেয়ারম্যান আতিউর রহমান নবাব বলেন, ‘এ বিষয় নিয়ে পরে কথা বলব। ’

পিআইও মো. মকসেদুল আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার কল করলেও রিসিভ করেননি।

কালুখালীর ভারপ্রাপ্ত ইউএনও মো. নাজমুল ইসলাম জানান, ‘প্রতিটা ইউনিয়নে সারা বছর ওয়াজ ও নামযজ্ঞ অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। কালিকাপুর ইউনিয়নেও হয়েছে। এ কারণে আমরা ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে আসা ৪৫০ মেট্রিক টন চাল ইউপি চেয়ারম্যানকে বরাদ্দ দিয়েছি। কাগজ-কলমে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নও হয়েছে। ’

কালুখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান কাজী সাইফুল ইসলাম বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘উপজেলা পরিষদে যেকোনো বরাদ্দ এলে আমার জানার কথা। কালিকাপুর ইউনিয়নে চাল বরাদ্দের ব্যাপারে কিছুই জানি না। কোন ওয়াজ অথবা নামযজ্ঞ অনুষ্ঠান হলে আয়োজকরা আমাকে আমন্ত্রণ করেন। অথচ মাত্র দুই দিনে এত ওয়াজ ও নামযজ্ঞ অনুষ্ঠান হলো আর কিছুই জানলাম না!’ তবে তিনি বুঝতে পারছেন, ওয়াজ ও নামযজ্ঞ অনুষ্ঠানের নামে আসা বিপুল পরিমাভ চালের অর্থ নয়ছয় হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। ’

রাজবাড়ীর ডিসি মো. শওকত আলী বলেন, ‘বিগত ২৫, ২৬ ও ২৭ জুলাই ঢাকায় ডিসিদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে ডিসিরা দাবি জানিয়েছেন, এ ধরনের প্রকল্পের বরাদ্দ অর্থবছরের শেষ মুহূর্তে নয়, ৩০ মার্চের মধ্যে দেওয়ার। তাতে প্রকল্প বাস্তবায়নে সুবিধা হবে। ’ তিনি জানান, ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে বরাদ্দ দেওয়ায় তাঁরা তা সংশ্লিষ্ট উপজেলায় পাঠিয়ে দিয়েছেন। রাজবাড়ী-২ আসনের আরো কয়েকটি ইউনিয়নে এ ধরনের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে পাংশা উপজেলায় বরাদ্দ আসা প্রকল্পের কাজ না হওয়ায় তিন হাজার মেট্রিক টন চাল তিনি ফেরত পাঠিয়েছেন।

 


মন্তব্য