kalerkantho


গাইবান্ধার ‘অগ্রদূত’

অমিতাভ দাশ হিমুন, গাইবান্ধা   

২১ এপ্রিল, ২০১৭ ০০:০০



গাইবান্ধার ‘অগ্রদূত’

গাইবান্ধায় অসুস্থ শিশুকে বাঁচাতে টাকা সংগ্রহে নেমেছে অগ্রদূতের কিশোর-কিশোরীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

হাতে প্লাস্টিকের কৌটা। সবার গায়ে বড় অক্ষরে ‘অগ্রদূত’ লেখা সাদা টি-শার্ট। এক দল কিশোর-কিশোরী রাস্তায় পথচারী, ব্যবসায়ী কিংবা পার্কে ঘুরতে আসা মানুষের কাছে হাত পাতছে। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ছোট্ট শিশু লিমাকে (৯) বাঁচানোর জন্য টাকা তুলছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বৃষ্টিভেজা গাইবান্ধা শহরে এ দৃশ্য দেখা গেছে।

প্রশ্নের উত্তরে দলটির সদস্য জাহিন নাওয়ার কবীর তটিনী বলে, ‘অর্থের অভাবে চিকিৎসা না পেয়ে দরিদ্র পরিবারের সন্তান লিমা পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাবে, আমরা তা ভাবতে পারি না। তাই অসুস্থ লিমার চিকিৎসার জন্য পথে নেমেছি। ’ সে জানায়, পড়াশোনার পাশাপাশি বিপন্ন অসহায় মানুষের জন্য কিছু করতে চায়। সেই উদ্দেশ্য থেকে তারা অগ্রদূত নামে সংগঠন গড়েছে।

সমরিতা সরকার শ্রয়ী বলে, ‘কোথাও কোনো দরিদ্র পরিবারের শিশু-কিশোরের অসুস্থতা, লেখাপড়ায় বিঘ্ন ঘটার খবর পেলে ছুটে যাই। আমরা ছোট; কিন্তু কেউ আমাদের ফেরান না।

শুরুর কথা

গত বছরের গোড়ার দিকে গাইবান্ধার এক দল কিশোর-কিশোরীর উদ্যোগে অগ্রদূত নামের সংগঠনটি গড়ে ওঠে। সংগঠনের সবাই সপ্তম থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল। এখন সদস্য সংখ্যা ২১। তাদের মধ্যে ছয়জন কলেজে পড়ে। লেখাপড়ায়ও অদম্য মেধাবী তারা। গাইবান্ধার শিক্ষা, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক যেকোনো আয়োজনে শেখার জন্য হাজির তারা। পাশাপাশি যেখানে প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত অসহায় মানুষ, সেখানে অগ্রদূত। মেয়র পৌরসভায় বসে বৈঠক করার সুযোগ দিয়েছেন। এর বাইরে খোলা মাঠ, পৌর পার্ক তাদের আলোচনার জায়গা।

সবাই রাজা

দলের সদস্য আবু সালেহ মো. নাহিয়ান শ্রাবণ বলে, ‘এ দলের কোনো কমিটি বা নেতা নেই। কোনো সিদ্ধান্ত নিতে বসলে প্রত্যেকে স্বাধীন মতামত দিতে পারে। আমরা বিশ্বাস করি, আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে। ’

এ দলে রয়েছে, তাসমিয়া শবনম কবীর তোড়া, নুজহাত নাওয়ার কবীর তিলোত্তমা, জান্নাতুল রুহিতা, তানজিলা জাহান অন্তু, সুমাইয়া ইসলাম সৃষ্টি, সমরিতা সরকার শ্রয়ী, ইশরুনা রহমান ইশাকা, ফারিয়া ফাতেমা স্বস্তি, জারিন তাসনিম কবির কাংখিতা, সামিও আল হাশিম, মঞ্জুর আসিফ শান্ত, তোয়াসিন হক তোর্ষা, রাতিফুজ্জামান ফাহিম, নওশাবা হৃদিতা, কাজী নাবিলা রাইসা, আরিফ শাহরিয়ার অনিক, সাবির আল হাশিম অর্ক, তাসমিয়া তাছিয়া ঐশী, আবু সালেহ মোহাম্মদ নাহিয়ান শ্রাবণ, জাহিন নাওয়ার কবীর তটিনী ও শাহ আবরার মাহির তরঙ্গ।

কর্মযজ্ঞ

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ আর বাঙালির বীরত্বগাথাসংবলিত যেকোনো অনুষ্ঠানের চত্বরে তিন-চার দিন আগে থেকে অগ্রদূতের এই কিশোর-কিশোরীরা রঙের কৌটা আর তুলি নিয়ে হাজির। গত দেড় বছরে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। আলপনা, গ্রামবাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য আর মুক্তিযুদ্ধের দৃশ্য এঁকে তারা বর্ণিল করে তোলে অনুষ্ঠান চত্বর। নীরবে নিভৃতে কাজ করে চুপচাপ পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে তারা। মঞ্চে ওঠার আগ্রহ নেই।

তবে অতি সম্প্রতি ২৬ মার্চকে সামনে রেখে গাইবান্ধা পৌর বিজয়স্তম্ভে ‘চল ফিরে যাই একাত্তরে’ নামের অনুষ্ঠানটি তাদের যোগ্যতাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যায়। এই অনুষ্ঠানে মুক্তিযোদ্ধারা সম্মাননা লাভের পাশাপাশি বিভিন্ন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের রণাঙ্গনের গল্প শোনান। মুক্তিযোদ্ধা মাহামুদুল হক শাহাজাদা বলেন, ‘ওরা বয়সে অনেক ছোট। তার পরও এজাতীয় অনুষ্ঠান এর আগে কেউ করেনি। এর বাইরেও বিভিন্ন জাতীয় অনুষ্ঠানগুলোতে তারা সব সময় আলাদা কিছু করে নিজেদের স্বাতন্ত্র্য প্রমাণ করেছে। ’

বড়দের চোখে

শিশু সংগঠক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কবি সরোজ দেব বলেন, ‘গাইবান্ধার শিশু সংগঠনগুলো বিলুপ্ত হয়েই গেছে প্রায়। ফলে নতুন প্রজন্ম যেখানে ক্রীড়া ও সংস্কৃতিবিমুখ হচ্ছে, সেখানে অগ্রদূতের এ ভূমিকা আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে। ’

গাইবান্ধা পৌরসভার মেয়র অ্যাডভোকেট শাহ মাসুদ জাহাঙ্গীর কবীর মিলন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ওদের প্রতিটি কর্মসূচি প্রশংসার যোগ্য। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর দিক থেকেও ওরা এগিয়ে। নতুন প্রজন্মের কাছে এরই মধ্যে অগ্রদূতের ভূমিকা উদাহরণ হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। আমরা ওদের পাশে আছি। ’


মন্তব্য