kalerkantho


সীতাকুণ্ডের ছায়ানীড়ে আরো ১৫ বোমা

চট্টগ্রামের বোমা ঢাকায় বিস্ফোরণ!

এস এম রানা, চট্টগ্রাম   

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চট্টগ্রামের বোমা ঢাকায় বিস্ফোরণ!

ঢাকার আশকোনায় প্রস্তাবিত র‌্যাব সদর দপ্তর এবং খিলগাঁওয়ে র‌্যাবের চেকপোস্টে আত্মঘাতী জঙ্গিদের বিস্ফোরণ ঘটানো বোমাগুলো চট্টগ্রাম থেকে গেছে বলে তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা। চট্টগ্রাম থেকে দফায় দফায় গ্রেনেড-বিস্ফোরক দ্রব্য ঢাকায় পাঠিয়েছিল নব্য জেএমবি। সর্বশেষ গত ৭ মার্চ চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট এলাকা থেকে মনিরের দেওয়া গ্রেনেড নিয়ে ঢাকায় যাওয়ার পথে কুমিল্লার চান্দিনায় গিয়ে হাইওয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জঙ্গি হাসান ও ইমতিয়াজ। এই দুই জঙ্গিই কাউন্টার টেররিজম ইউনিট ও পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রশ্নের জবাবে একাধিকবার গ্রেনেড ঢাকায় পাচারের তথ্য স্বীকার করেছে। তারা যে গ্রেনেডগুলো নিয়ে যাচ্ছিল, সেগুলো ঢাকার যাত্রাবাড়ী নিয়ে ‘ব্ল্যাক’ নামের এক ব্যক্তির কাছে হস্তান্তরের কথা ছিল।

পরে হাসান ও ইমতিয়াজ গোয়েন্দাদের কাছে স্বীকার করে, বিদেশি নাগরিক, অর্থনৈতিক জোন, মাজার, সংখ্যালঘু ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে জঙ্গিরা। পাশাপাশি চট্টগ্রাম মহানগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলা এলাকায় জঙ্গিদের ‘সেফ হোম’ তৈরির তথ্যও প্রকাশ করে তারা। এসব তথ্য পাওয়ার পরপরই গত বুধবার এক দিনেই সীতাকুণ্ড পৌর এলাকায় জঙ্গিদের দুটি সেফ হোমের সন্ধান পায় পুলিশ।

সেফ হোমে অভিযানকালে কুমিরা এলাকার তৃতীয় সেফ হোম ছেড়ে বৃহস্পতিবার ভোরে জঙ্গিদের পালিয়ে যাওয়ার তথ্য পায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ ছাড়া হাসান-ইমতিয়াজের দেওয়া তথ্যের সত্যতা গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয় শুক্রবার দুপুরে ঢাকায় র‌্যাবের প্রস্তাবিত সদর দপ্তর এলাকা এবং ভোররাতে খিলগাঁওয়ে আত্মঘাতী জঙ্গিদের বিস্ফোরণ ঘটানোর মধ্য দিয়ে।

তথ্য বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলেন, জঙ্গিরা বড় ধরনের  পরিকল্পনা করেছে।

সে অনুযায়ী চট্টগ্রাম থেকে বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড-বিস্ফোরক ঢাকায় নেওয়া হয়ে থাকতে পারে। আবার তথাকথিত সেফ হোমেও বিপুল পরিমাণ গ্রেনেড-বোমা পাওয়া যাচ্ছে। এসব গ্রেনেড বড় নাশকতার জন্যই তৈরি হয়েছে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।

বোমাভরা ‘সেফ হোম’ : সীতাকুণ্ডের চৌধুরীবাড়ির ছায়ানীড় থেকে পুলিশকে লক্ষ্য করে পাঁচটি গ্রেনেড ছুড়ে মারা হয়েছিল বুধবার। বৃহস্পতিবার সকালেও বড় আকারের তিনটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে উদ্ধার করা অন্য গ্রেনেড দেখে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের অতিরিক্ত উপকমিশনার কাজী সানোয়ার সাংবাদিকদের বলেন, এত বড় গ্রেনেড অতীতে তৈরি করেনি জঙ্গিরা।

ওই দিন জঙ্গিদের ‘সেফ হোম’ ছায়ানীড় থেকে বিপুল পরিমাণ বোমা উদ্ধার করে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল। কিন্তু গতকাল শনিবার দুপুরে আবার ওই আস্তানায় ১৫টি বোমা পাওয়া যায়। বৃহস্পতিবারের তল্লাশিতে বোমাগুলো কেন শনাক্ত করা যায়নি, সেই বিষয়ে বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিটের সদস্য ও চট্টগ্রাম মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের উপপরিদর্শক আফতাব হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বৃহস্পতিবার পুরো আস্তানাটি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে তল্লাশি করা যায়নি। তল্লাশির এক পর্যায়ে সেখানে আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। তখন ফায়ার সার্ভিস আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরে রাত হয়ে যাওয়ায় ওই দিন আস্তানায় বোমার অনুসন্ধান সাময়িক বন্ধ রাখা হয়। শনিবার দ্বিতীয় দফায় তল্লাশি শুরুর পর ১৫টি বোমা পাওয়া গেছে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার তাজা বোমা পাওয়া গিয়েছিল ১০টি। এ ছাড়া একাধিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছিল জঙ্গিরা। ’

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা বলেন, বোমাগুলো পর্যায়ক্রমে নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। এ ছাড়া সেখানে রাসায়নিক পদার্থভর্তি ছয়টি ড্রাম পাওয়া গেছে। এসব ড্রামে হাইড্রোজেন পারক্সাইড ও এসিড আছে। এসব রাসায়নিক বোমা তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। তিনি বলেন, আস্তানার তিনটি কক্ষ তল্লাশি শেষ করতে সময় লাগছে। পাশাপাশি সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ আস্তানা থেকে বিভিন্ন ধরনের আলামত সংগ্রহ করছে।

সোহেল, শাহানাজ, মনির, ব্ল্যাকের খোঁজে পুলিশ : গোয়েন্দারা জানায়, চট্টগ্রামের নিউ মার্কেট এলাকা থেকে ঢাকায় ‘ব্ল্যাক’ নামে এক ব্যক্তির কাছে গ্রেনেড পাঠায় মনির। মিরসরাইয়ের সেফ হোমের অর্থ জোগানদাতাও এই মনির আর সীতাকুণ্ডের সেফ হোমের অর্থ জোগানদাতা সোহেল রানা ও তার স্ত্রী শাহানাজ। এদের ধরার জন্য হন্যে হয়ে খুঁজছে চট্টগ্রামের পুলিশ। শুক্রবার পুলিশের দায়ের করা চারটি মামলার একটির এজাহারে সোহেল ও শাহানাজের নাম রয়েছে।  

জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ শুরু : সীতাকুণ্ডের সাধন কুটির থেকে গ্রেপ্তার জহিরুল হক ও রাজিয়া সুলতানা আর্জিনা দম্পতিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১২ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে চট্টগ্রামের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট হোসাইন মো. রেজার আদালতে সোপর্দ করার পর চার মামলায় দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৩০ দিনের রিমান্ড আবেদন করে পুলিশ। শুনানি শেষে আদালত ১২ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার নুরে আলম মিনা কালের কণ্ঠকে বলেন, জঙ্গি দম্পতিকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের শিশুসন্তানটিকে মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। একজন নারী কনস্টেবল শিশুটির দেখভাল করছে। জহিরুল-আর্জিনা দম্পতিকে আলাদা কক্ষে রেখে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। তারা ইতিমধ্যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে; ছায়ানীড়ে থাকা জঙ্গিদের নাম প্রকাশ করেছে। এ ছাড়া তারা অতীতে চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় কারাগারে গিয়ে আগে থেকে সেখানে হাজতবন্দি থাকা জঙ্গিদের সঙ্গে দেখা করেছে কি না সেই বিষয়েও অনুসন্ধান করছে পুলিশ।

লাশ পড়ে আছে মর্গে : ছায়ানীড়ে পরিচালিত অপারেশন অ্যাসল্ট-১৬-র পর এক শিশু ও এক নারীসহ চার জঙ্গির মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। সেগুলো এখনো চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে আছে। গতকাল বিকেল পর্যন্ত লাশ নেওয়ার জন্য কেউ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। শিশুসহ তিনটি লাশের পরিচয় শনাক্ত হয়েছে। নিহত কামাল উদ্দিন ও তার স্ত্রী জুবাইদা বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারি ইউনিয়নের বাসিন্দা। সেখানে তাদের স্বজনদের কাছে খবর পাঠিয়েছে পুলিশ।

ওই দিন মারা যাওয়া আরো দুজনের মরদেহ ঢাকার মিরপুর থেকে নিখোঁজ রাফিদ ও আয়াদের বলে কাউন্টার টেররিজম ইউনিট সন্দেহ করলেও মৃতদেহ দুটি ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ায় সেগুলো শনাক্ত করা যায়নি।


মন্তব্য