kalerkantho


আখাউড়া

‘বন্দুকযুদ্ধের’ ভয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া   

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার উত্তর ইউনিয়নের এক চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীর মনে এখন ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ভয়। তিনি চাইছেন তাঁর ভয়ের কথা জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করতে। মনিয়ন্দ ও দক্ষিণ ইউনিয়নের দুই মাদক ব্যবসায়ী কয়েক দিন ধরে ‘গাঢাকা’ দিয়েছেন। যেকোনো সময় গ্রেপ্তার কিংবা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ মতো পরিস্থিতিতে পড়তে হতে পারে বলে তাঁদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে।

আখাউড়াকে মাদকমুক্ত করার বিষয়ে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী (কসবা-আখাউড়ার সংসদ সদস্য) আনিসুল হকের ঘোষণার পর এখানকার মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত ১০ ফেব্রুয়ারি আখাউড়ার মনিয়ন্দ ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সম্মেলনে উপজেলাকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা দেন মন্ত্রী। সম্মেলনে ছাত্রলীগের স্থানীয় এক নেতার বক্তব্যের রেশ ধরে মন্ত্রী আখাউড়াকে মাদকমুক্ত করার দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. মিজানুর রহমানের হুঁশিয়ারি উচ্চারণের পর। গত ২ মার্চ আখাউড়া রেলওয়ে জংশন স্টেশন এলাকায় এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হবে। মাদক ব্যবসায়ীদের যেখানে-সেখানে মৃত্যুর সংখ্যা প্রয়োজনে বাড়তে থাকবে বলে তিনি তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন।

এ অবস্থায় গত শুক্রবার সকালে আখাউড়া উপজেলার আজমপুরের কৌড়াতলী গ্রামের দেলোয়ার হোসেন ওরফে দেলু নামের এক মাদক ব্যবসায়ীর লাশ পাওয়া যায় জেলার কসবা উপজেলার সৈয়দাবাদ এলাকায়।

এর আগে গত বছরের ২৩ আগস্ট আখাউড়ার মনিয়ন্দ গ্রামের মাদক ব্যবসায়ী রহিজ উদ্দিন কসবার গোপীনাথপুর এলাকায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন। ওই দুজনের বিরুদ্ধেই মাদকের বেশ কয়েকটি মামলা আছে।

পুলিশের দাবি, নিহত দেলোয়ারের বিরুদ্ধে মাদক চোরাচালানসহ বিভিন্ন অপরাধে অন্তত ১১টি মামলা আছে। মাদক নিয়ে বিরোধের জের ধরে মাদক ব্যবসায়ীরা তাঁকে হত্যা করতে পারেন। লাশের পাশে ৩৫ বোতল ফেনসিডিল পাওয়া যায়। এ বিষয়ে কসবা থানায় দুটি মামলা করা হয়েছে।

তবে দেলোয়ার হোসেনের বাবা মরহম আলী বলেন, ‘তাঁর ছেলে বেশ কিছুদিন ধরে চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় থাকতেন। গত বুধবার রাতে পুলিশ তাঁকে আটক করে। পরে সেখানকার একটি থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। একপর্যায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে সেখানে অবস্থানরত তাঁর এক ভায়রাভাই আবার কৌশলে তাঁকে পুলিশের হাতে তুলে দেন। মোবাইল ফোনসেটে এ খবর পাওয়ার পর আমরা আখাউড়া থানা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করি। প্রয়োজনের ছেলেকে নিয়ে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার কথা বলেছি। কিন্তু পুলিশ এ বিষয়ে কোনো কর্ণপাত করেনি। শুক্রবার সকালে কসবায় লাশ পড়ে থাকার খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে দোলোয়ারকে শনাক্ত করা হয়। ’

এর আগে গত ২৩ আগস্ট কসবা উপজেলার গোপীনাথপুর গ্রামে আখাউড়ার মনিয়ন্দে পাথারিয়াটেক গ্রামের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী রহিজ উদ্দিনের লাশ পাওয়া যায়। মাদকবিরোধী অভিযানে রহিজ উদ্দিন বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় বলে তখন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এর আগেও মাদকবিরোধী অভিযানে গিয়ে রহিজ উদ্দিনের হামলার শিকার হয় পুলিশ। রহিজ উদ্দিনের বিরুদ্ধে আখাউড়া ও কসবা থানায় অন্তত ১৫টি মামলা আছে বলে পুলিশ জানায়। তবে রহিজ উদ্দিনের পারিবারিক সূত্রের দাবি, কসবা থানা পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে মেরে ফেলে।

সংবাদ সম্মেলন করতে ইচ্ছুুক এক মাদক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি মাদকের মামলা আছে। কিন্তু কখনো আমার কাছ থেকে মাদক উদ্ধারের ঘটনা ঘটেনি। এখন শুনতে পাচ্ছি, মাদকের মামলা আছে এমন লোকজনের তালিকা করা হয়েছে ক্রসফায়ারে দেওয়ার জন্য। আমি তো দেখেছি, জঙ্গিদেরও ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া হয়। এসব বিষয় নিয়ে আমি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে চাই। ’

এদিকে আখাউড়ায় মাদকবিরোধী জনসচেতনাও দিন দিন বাড়ছে। সম্প্রতি বিভিন্ন এলাকার তরুণদের উদ্যোগে মাদকবিরোধী কর্মসূচি পালিত হয়। এলাকাভিত্তিক একাধিক সভায় মাদক ব্যবসায়ীদের ভালো পথে ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। তওবা পড়ানো হয় একাধিক মাদক ব্যবসায়ীকে। আখাউড়ার বিভিন্ন এলাকায় মাদকবিরোধী ব্যানার-ফেস্টুন ও দেয়াল লিখন দেখা যায়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত মাদকবিরোধী সাইকেল  শোভাযাত্রা ব্যাপক সাড়া ফেলে। তরুণসমাজের পক্ষ থেকে মাদকবিরোধী জনসভা ও কনসার্ট আয়োজনেরও প্রস্তুতি চলছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আখাউড়াকে মাদকমুক্ত করতে সব ধরনের উপায়ই কাজে লাগানো হবে। এ কাজে আপনাদের (সাংবাদিক) সহযোগিতা চাই। আখাউড়াকে মাদকমুক্ত করার বিষয়ে মন্ত্রীর দেওয়া ঘোষণা সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। ’

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক রেজওয়ানুর রহমান এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘তরুণসমাজ উন্নয়নের সুফল ভোগ করবে। আর এ কারণে তাদের মাদকমুক্ত রাখতে আখাউড়া কেন, জেলাজুড়ে জনসচেতনতা প্রয়োজন। ’


মন্তব্য