kalerkantho


হুমকিতে পড়তে পারে পদ্মা সেতু ও দোহার রক্ষা বাঁধ প্রকল্প

পদ্মার বালু লোপাট

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি   

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পদ্মার বালু লোপাট

ঢাকার দোহারের পদ্মা নদী ও নদীতীরবর্তী চরে এভাইে চলছে বালু লোপাটের মচ্ছব। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঢাকার দোহারের পদ্মা নদী ও নদীতীরবর্তী চরে চলছে বালু লোপাট। দেশের বৃহত্তম পদ্মা সেতু প্রকল্পের অবস্থান দোহারের কাছে। অপরিকল্পিত বালু তোলার ফলে ভাঙনের হুমকিতে পড়তে পারে ওই প্রকল্প এলাকা। দোহারকে নদীভাঙন থেকে রক্ষায় সরকারের ২১৭ কোটি টাকার চলমান প্রকল্পটিও ভেস্তে যেতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, দোহারের মুকসুদপুর ইউনিয়নের গোড়াবন গ্রাম লাগোয়া পদ্মার চরে দাঁড়িয়ে পাঁচ-সাতটি ট্রাক। শ্রমিকরা তিনটি ভেকু দিয়ে চর থেকে বালু কেটে ভরছে ট্রাকে। আর গ্রামের রাস্তা ও ফসলি জমির ওপর দিয়ে বালুভর্তি সে ট্রাকগুলো ছুটছে নিয়মিত বিরতিতে। প্রতিদিন এভাবেই নদীর বুক কেটে দেড় শ থেকে দুই শ ট্রাক বালু বিক্রি হচ্ছে। অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে চরে সৃষ্টি হয়েছে বিশাল বিশাল গর্ত। অনেক স্থানে পুকুরের মতো খনন করে বালু তোলায় ভূগর্ভস্থ পানি বের হয়ে আছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দোহারে সরকারিভাবে কোনো বালুমহাল নেই।

কিন্তু রাজনৈতিক প্রভাবে গোড়াবনের বিস্তীর্ণ এই পদ্মার চর কেটে বিক্রি করছেন এলাকার প্রভাবশালী মোকছেদ শিকদার, শাহীন শিকদার ও টিটু শিকদার। চরে অবস্থান করা ভেকু তিনটি এই তিনজনের। যৌথভাবে শিকদার এন্টারপ্রাইজের ক্যাশমেমোতে ট্রাকে ট্রাকে অবৈধভাবে বিক্রি হচ্ছে চরের এই বালু।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার বেশ কয়েকজন ব্যক্তি বলেন, যাঁরা বালু তোলেন তাঁদের বিরুদ্ধে এলাকার কেউ কথা বলার সাহস পায় না। কাকডাকা ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বালুর ট্রাকের যন্ত্রণায় এলাকাবাসী অতিষ্ঠ। কিন্তু কে কথা বলবে ওই প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে? প্রশাসনও সব দেখে না দেখার ভাণ করছে।

বালু বিক্রির জন্য পদ্মার চরে তৈরি করা হয়েছে একটি ঝুপড়ি ঘর। সেখানে বসে শিকদারদের পক্ষে বালু বিক্রির টাকা আদায় করেন ব্যবস্থাপক কৃষ্ণ কমল সিংহ। প্রথমে কথা বলতে রাজি না হলেও পরে বলেন, ‘এগুলো (পদ্মার চরে) সব ব্যক্তিগত জমি। এ জমি কিনে নিয়ে বালু কাটছেন টিটু শিকদার, শাহিন শিকদার ও মোকছেদ শিকদার। সিএস, এসএ, আরএস সব রেকর্ড আছে। এখানে কোনো সরকারি জমি নেই। ’

গত বুধবার দুপুরে সেখানেই পাওয়া যায় বালু ব্যবসায়ী উপজেলার দুবলী বাজারের রোদেলা এন্টারপ্রাইজের মালিক শহিদুল ইসলাম দুলুকে। তিনি বলেন, ‘আমাদের অনেকেরই ট্রাক আছে এখানে। প্রতি ট্রাক বালু ১৫০ টাকা করে কিনতে হয় এখান থেকে। এগুলো দূরত্বভেদে আমরা এক হাজার থেকে এক হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি করি। এখান থেকে বালু নিয়ে জায়গামতো পৌঁছে দিতে শ্রমিকদের ৩৭ শতাংশ কমিশন দিতে হয়। ’

বুধবার দেখা যায় গোড়াবন চরের পাশে নদীতে রয়েছে বড় একটি ড্রেজার, বড় বড় পাইপ ও কাটার (ড্রাম)। নদী থেকে সরাসরি বালু উত্তোলনে এগুলো ব্যবহৃত হয়। নদী থেকে তোলা বালু দিয়ে বালুমহাল (বড় বড় বালুর ঢিবি) তৈরি করা হয়েছে। সব মিলিয়ে গোড়াবনের পদ্মা নদী ও চর যেন শিকদারদের বালু সাম্রাজ্য।     

অনুসন্ধানে জানা যায়, শুধু গোড়াবন পদ্মার চর নয়, দোহারের বিলাসপুর, মাহমুদপুর, নারিশা, মুকসুদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় পদ্মা নদীর মাঝ ও নদীতীরবর্তী চর থেকে অবৈধ ও অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলা হচ্ছে। নদীর ভেতরে রয়েছে ছয়-সাতটি ড্রেজার (কাটার) মেশিন। অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করায় নদীভাঙন থেকে রক্ষায় উপজেলার নয়াবাড়ী ইউনিয়নে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২১৭ কোটি টাকার নির্মীয়মাণ বাঁধটি ভেঙে যেতে পারে। হুমকিতে পড়তে পারে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পও।

বিষয়টি স্বীকার করে বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেন দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম আল-আমিন। তিনি বলেন, ‘দোহারের কোথাও কোনো বালুমহাল নেই। যদি কেউ বালু উত্তোলন করে থাকে, তাহলে সেটি অবৈধ। বিষয়টি আমাদেরও নজরে এসেছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি স্থানে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। ’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলেন, ‘পানি প্রবাহের একটি গতিপথ রয়েছে। অপরিকল্পিত বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে হুমকির মুখে পড়তে পারে নয়াবাড়ী ইউনিয়নের বাঁধ প্রকল্প ও পদ্মা সেতু প্রকল্প। এ কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্পের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে এখানে বালু উত্তোলন বন্ধের বিষয়ে আমাকে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে এ মাসে উপজেলার আইন-শৃঙ্খলা ও সমন্বয় সভায় উপস্থাপন করা হয়েছে। বালু উত্তোলন বন্ধে এলাকার জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ’


মন্তব্য