kalerkantho


গোপালগঞ্জের চার মুক্তিযোদ্ধা হত্যা

মামলা ঝুলছে ৪৪ বছর

প্রসূন মন্ডল, গোপালগঞ্জ   

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দীর্ঘ ৪৪ বছরেও গোপালগঞ্জের চার মুক্তিযোদ্ধা হত্যা মামলার বিচারকাজ শেষ হয়নি। প্রভাবশালী আসামিরা মামলাটি বিভিন্ন আদালত ঘুরিয়ে কালক্ষেপন করেন।

তার ওপর উচ্চ আদালতের নির্দেশে অন্তত ছয়বার মামলার কার্যক্রম স্থগিত হয়েছে। মামলাটি এখন নিম্ন আদালতে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলার টুপুরিয়া ব্রিজের কাছে ভরদুপুরে কুপিয়ে হত্যা করা হয় গোপালগঞ্জের চার মুক্তিযোদ্ধাকে। হত্যার শিকার মুক্তিযোদ্ধারা হলেন ৮ ও ৯ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযুদ্ধকালীন কমান্ডার ও কমিউনিস্ট পার্টি-ন্যাপ ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনীর প্রধান সমন্বয়কারী ওয়ালিউর রহমান লেবু, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী ন্যাপ নেতা কমলেশ বেদজ্ঞ, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা বিষ্ণুপদ ও মানিক।

মামলা সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ন্যাপ নেতা কমলেশ বেদজ্ঞ কোটালীপাড়া আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। নির্বাচনী কাজ শেষে ১০ মার্চ সকালে কোটালীপাড়ার সিকির বাজার থেকে নৌকায় করে গোপালগঞ্জের উদ্দেশে রওনা হন। নৌকাটি টুপুরিয়া ব্রিজের কাছে পৌঁছালে একদল দুর্বৃত্ত ওই চারজনকে রামদা, কোদাল, লোহার রড ও ছেনি দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। তাঁদের সঙ্গে থাকা বর্তমান জেলা কৃষক লীগ নেতা লুত্ফর রহমান গঞ্জরকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে গেলে ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান।

ঘটনার এক দিন পর ১১ মার্চ লুত্ফর রহমান গোপালগঞ্জ থানায় একটি মামলা করেন (নং-৫, তাং ১১-০৩-১৯৭৩, জিআর নং-৯৬/৭৩)।

মামলায় হেমায়েত উদ্দিনসহ ২১ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে বর্তমানে ৯ জন জীবিত রয়েছেন। তবে মামলার প্রধান আসামি হেমায়েতসহ ১২ জন মৃত্যুবরণ করেছেন।

নিহত মুক্তিযোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞের মেয়ে সুতপা বেদজ্ঞ ক্ষোভ আর হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘১৯৭৩ সালের ১০ মার্চ হেমায়েত বাহিনীর প্রধান হেমায়েতের নেতৃত্বে একদল দুর্বৃত্ত আমার বাবাসহ চার মুক্তিযোদ্ধাকে কুপিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এত দিন আসামিপক্ষ কৌশলে মামলাটির বিচারকাজ বন্ধ রাখে। বিগত ২০১২ সালে গোপালগঞ্জ জেলা জজ আদালতে মামলাটির বিচারকাজ শুরু হয়। ভেবেছিলাম দীর্ঘদিন পরে হলেও বাবার হত্যাকারীদের বিচার হবে। কিন্তু জামিনে থাকা প্রভাবশালী আসামিরা নানাভাবে মামলাটি প্রভাবিত করছেন। এর মধ্যে প্রধান অভিযুক্ত হেমায়েত উদ্দিন মারা গেছেন। ’

নিহত ওয়ালিউর রহমান লেবুর ভাই জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির (জাপা) প্রেসিডিয়াম সদস্য সাইদুর রহমান টেপা বলেন, তাঁর মা এ বিচার দেখে যেতে পারেননি। তাঁর ভাইসহ চার মুক্তিযোদ্ধা হত্যাকারীদের যাতে শাস্তি হয় সে জন্য তিনি প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

কমিউনিস্ট পার্টি গোপালগঞ্জ শাখার সভাপতি অধ্যক্ষ আবু হোসেন বলেন, ‘দীর্ঘ ৪৪ বছরেও মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ পর্যন্ত হয়নি। প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যার ঘটনা, এর যথেষ্ট প্রমাণও রয়েছে। আমাদের দাবি, মামলার কার্যক্রম আবার চালু করে এর বিচারকাজ সম্পন্ন করা হোক। ’

গোপালগঞ্জ জেলা উদীচীর সভাপতি মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, যাঁরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করলেন, তাঁদের এভাবে হত্যা করা হলো। এ হত্যাকাণ্ডের বিচার না হলে মুক্তিযোদ্ধাদের অসম্মান করা হবে।

মামলার আইনজীবী দেলোয়ার হোসেন সরদার জানিয়েছেন, ১৯৯৬ সালে হাইকোর্টের নির্দেশে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৯৮ সালে গোপালগঞ্জে জেলা ও দায়রা জজ আদালতে এ মামলার বিচারকাজ শুরু হয়। ১৯৯৯ সালের ২৬ আগস্ট হেমায়েত উদ্দিনসহ আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের দিন ধার্য করা হয়। এর আগেই আসামিরা হাইকোর্টে মামলাটি স্থগিত করেন। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল গোপালগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়।

সর্বশেষ ২০১৩ সালের ৮ অক্টোবর উচ্চ আদালতের বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও মো. জাহাঙ্গীর হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে আসামিরা মামলাটি স্থগিতের আবেদন করেন। তখন আদালত স্থগিতাদেশ দেন। পরে বিচারপ্রার্থীদের লিভ টু আপিলের পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট মামলা পরিচালনার জন্য নিম্ন আদালতকে নির্দেশ দেন। এখন মামলাটি শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।


মন্তব্য