kalerkantho


সীতাকুণ্ডে জঙ্গি আস্তানা

নিহতরা নাইক্ষ্যংছড়ির বাড়ি ছেড়ে যায় ৯ মাস আগে

মনিরুল ইসলাম মনু, বান্দরবান   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে বোমা বিস্ফোরণে নিহত জঙ্গি কামাল হোসেন (২৫) ও তার স্ত্রী জুবাইদার (২১) বাড়ি বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার উত্তর বাইশারি এলাকায়। ৯ মাস আগে জুবাইদার বড় ভাই জহির, ছোট বোন মোনজি আরা ও স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাসানসহ তারা এলাকা ছেড়ে চলে যায়। পরিবার ও আত্মীয়স্বজন এরপর আর ওদের কোনো খবর পায়নি। কামালের বাবা মোজাফফর আহমদ ও জুবাইদার বাবা নুরুল আলম নাগুর সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

কুমিল্লায় কয়েক দিন আগে আটক হওয়ার পর পত্রিকায় ছবি দেখে হাসানের জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কথা জানতে পারলেও সীতাকুণ্ডে নিহত কামাল-জুবাইদা দম্পতি ও তাদের শিশুসন্তানের কোনো খবর এখনো এলাকায় পৌঁছেনি। জুবাইদা ও কামালের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, মাটির ঘর টিনের চালা, গাছপালায় ভরা খামারবাড়িতে মা-বাবা-মা ও পরিবারের অন্যরা নিরুদ্বেগে বসবাস করছে। সীতাকুণ্ডের ঘটনার পর কামাল, জুবাইদা, হাসান, আকলিমা ও মোনজি আরার বাড়িঘর চেনা গেলেও সেখানে তাদের কোনো জাতীয় পরিচয়পত্র বা চেনা যায় এমন কোনো ছবি বা কাগজপত্র পাওয়া যায়নি।

নুরুল আলম নাগু জানান, জহির কিছুদিন আগে তার মায়ের সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলে জানিয়েছিল যে তারা ঢাকায় থাকে। এর বাইরে তারা আর কিছুই জানেন না। তিনি জানান, জহির বরাবরই নামাজ-রোজা করত। তবে তার কোনো আচরণে তাকে মৌলবাদী বলে মনে হতো না।

আকলিমাকে বিয়ের পর থেকেই তার আচার-আচরণ পুরোপুরি বদলে যায়। অন্য আত্মীয়স্বজন তো দূরের কথা, আকলিমাকে শ্বশুর-দেবরদের সঙ্গেও কথাবার্তা বলা বা দেখা করতে দিত না জহির। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির পর সে আলাদা ঘর বেঁধে সেখানে অনেকটা বন্দিজীবন কাটাত। ওই ঘরে কারো প্রবেশাধিকার ছিল না। এ নিয়ে গালাগালি করায় রাগ করে স্ত্রী আকলিমা, নবজাতক পুত্রসন্তান ও শ্যালিকা মোনজি আরাকে নিয়ে বাড়ি ছাড়ে জহির।

এলাকাবাসী জানায়, জমিজমা চাষ করে সংসার চালাত কামাল ও জহির। ক্ষদ্র ব্যবসায়ী হাসান আলীর সঙ্গে তার গভীর সখ্য ছিল। অবসর পেলেই তারা একসঙ্গে বসে বৈঠক করত। তবে কী নিয়ে তারা কথা বলত তা কেউ জানে না। কামাল, জহির ও হাসানকে সবাই ধর্মপ্রাণ (নামাজি) হিসেবেই চেনে। এর মধ্যে কুমিল্লায় হাসান ধরা পড়ার খবরে তারা সবাই অবাক হয়ে যায়।

কামাল হোসেনের বাবা মোজাফফর আহমদ কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারানালা এলাকার বাসিন্দা। বছর দশেক আগে বাইশারির যৌথ খামারপাড়ায় এসে জমি চাষবাস এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। জুবাইদার বাবাও কক্সবাজারের মহেশখালী এলাকার আদি বাসিন্দা। ৩০ বছর ধরে বাইশারি আদর্শ গ্রামে বসবাস করছেন তিনি। আর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হাসান আলী বাইশারির লম্বাঘোনা এলাকার নূর হোসেনের ছেলে। প্রথমে পান-সিগারেটের দোকান এবং পরে চালের দোকান চালাত। ৯ মাস আগে সব ছেড়ে দিয়ে নিরুদ্দেশ হয়।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, জঙ্গি সংশ্লিষ্ট এই মানুষগুলোর কেউই তেমন লেখাপড়া করেনি। এই মানুষগুলো কিভাবে জঙ্গি নেটওয়ার্কে জড়িয়ে পড়ল তা ভেবে পাচ্ছেন না কেউ। আর ৯ মাস আগে বাড়ি ছেড়ে নিখোঁজ থাকলেও সংশ্লিষ্টদের পরিবার পুলিশকে বিষয়টি জানায়নি। এত দিন ধরে নিখোঁজ থাকার বিষয়ে খবর নেননি স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান কিংবা গ্রামপুলিশ বা চৌকিদারও।

মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার বাইশারি এলাকায় বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক রাবার বাগান রয়েছে। এসব বাগানে কাজ করছে শত শত শ্রমিক। অভিযোগ রয়েছে, শ্রমিক পেশার আড়ালে এখানে অনেকেই জড়িয়ে যাচ্ছে জঙ্গি তত্পরতায়। এ ছাড়া ওই এলাকায় ধর্মভিত্তিক কয়েকটি বিদেশি এনজিও কাজ করছে। মসজিদ-মাদরাসা নির্মাণের নামে তারা নতুন নতুন জঙ্গি রিক্রুট করছে কি না সে বিষয়টিও ভেবে দেখার কথা বলেছেন এলাকার কয়েকজন।

বান্দরবানে নিরাপত্তা জোরদার : বান্দরবানের পুলিশ স্টেশন ও ক্যাম্পসহ বিভিন্ন স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সুপারের নির্দেশে গতকাল বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে জরুরি বেতার বার্তায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সদর থানার ওসি রফিক উল্লাহ জানান, থানা বা পুলিশ ক্যাম্পগুলোতে তল্লাশি ছাড়া যাতে কেউ ঢুকতে না পারে সেই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে সংশ্লিষ্টদের। তবে কোন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে এ ব্যবস্থা সে ব্যাপারে তিনি কোনো তথ্য জানাতে পারেননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, ঢাকার আশকোনায় র‌্যাব সদর দপ্তর স্থাপনের জন্য নির্ধারিত এলাকায় বোমাসহ আত্মঘাতী জঙ্গি প্রবেশ করে বোমার বিস্ফোরণ ঘটানো এবং কুমিল্লায় আটক ও সীতাকুণ্ডে নিহত জঙ্গিদের মধ্যে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি এলাকার বাসিন্দা থাকায় এ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।


মন্তব্য