kalerkantho


সোহাগপুর গণহত্যা

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চান ছয় বীরাঙ্গনা

শেরপুর প্রতিনিধি   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘আমাদের ওপর যে অত্যাচার হয়েছে, এইটা ভাষায় বলার মতন না। বুকের মধ্যে সব সময় আগুন চাপা দিয়া কষ্ট সহ্য করছি। গণহত্যায় আমার স্বামীসহ পরিবারের তিনজনরে হারিয়েছি। নির্যাতনের ঘটনার বর্ণনা দিয়া ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিছি। ছয়জনের সরকার স্বীকৃতি দিছে। আমরা আবেদন করছি। আমগরে স্বীকৃতি দিলে শেষ বয়সে শান্তি নিয়ে মরবার পারতাম। ’

জীবন সায়াহ্নে এসে মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সোহাগপুর বীরকন্যা পল্লীর শহীদ পরিবারের বিধবা করফুলি বেওয়া (৬৯) জানাচ্ছিলেন নিজের এই আকুতির কথা। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে ওই পল্লীতে গিয়ে জানা যায়, করফুলি বেওয়াসহ সোহাগপুর এলাকার ছয় বীরাঙ্গনা ‘নারী মুক্তিযোদ্ধা’ স্বীকৃতির জন্য মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। তাঁরা বেঁচে থাকতে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি নিয়ে মরতে চান।

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি চাওয়া এই ছয় বীরকন্যা হলেন সোহাগপুর গ্রামের করফুলি বেওয়া (৬৯), হাজেরা খাতুন (৬৯), আমেনা বেওয়া (৬৭), মোছা. অজুফা (৮৯), কাকরকান্দি গ্রামের হাছনে আরা (৬৯) ও জরিতন বেওয়া (৮১)।

১৯৭১ সালে পাক হানাদার  বাহিনী ও এদেশীয় দোসরদের চালানো গণহত্যায় এই ছয় নারীর সবার স্বামী শহীদ হন এবং নারীরা পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন, যা সোহাগপুর গণহত্যা হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে পরিচিত।

জানা গেছে, সোহাগপুর গণহত্যা ও নির্যাতনের শিকার ১৪ নারীর মধ্যে ইতিমধ্যে ছয়জনকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে জীবিত ছয় বিধবা নারী স্বীকৃতির আশায় বুক বেঁধে আছেন। স্বীকৃতি পেতে তাঁরা গত সোমবার (১৩ মার্চ) মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন। নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি নিয়ে তাঁরা জীবনের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার দাবি জানিয়েছেন।

এলাকাবাসী ও নির্যাতিত নারীদের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী সোহাগপুর গ্রামে গণহত্যা চালায়। সে সময় পাকহানাদার বাহিনী তাদের এ দেশীয় দোসরদের সহায়তায় ছয় ঘণ্টার তাণ্ডব চালিয়ে গুলি করে বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে ১৮৭ জন পুরুষকে হত্যা করে। ওই ঘটনায় ৬২ জন নারী বিধবা হন। তাঁদের মধ্যে ১৪ জন নারী পাকহানাদার বাহিনী ও রাজাকারদের হাতে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন। তাঁদের মধ্যে ইতিমধ্যে দুজন মারা গেছেন। বেঁচে আছেন নির্যাতিত ১২ জন নারী। এঁদের মধ্যে ছয়জনকে সরকার সম্প্রতি নারী মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে।

বাকি ছয়জন স্বীকৃতির আশায় রয়েছেন। এঁদের মধ্যে করফুলি বেওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন। একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে সাতটি অভিযোগের মধ্যে তৃতীয় অভিযোগ ছিল সোহাগপুরে হত্যাযজ্ঞ ও ধর্ষণ। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেন। পরে ২০১৫ সালের এপ্রিল মাসে কামারুজ্জামানের ফাঁসির রায় কার্যকর হয়।

সোহাগপুর শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির সভাপতি মো. জালাল উদ্দিন বলেন, ইতিমধ্যে সরকার ছয়জন নারীকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়েছে। জীবিত ছয়জন সরকারের কাছে আবেদন করেছেন। আমরা চাই সরকার তাঁদেরকে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁদের শেষ বয়সের আশা পূরণ করবে।

কাকরকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান অভিনেতা শহিদুল্লাহ তালুকদার মুকুল বলেন, নির্যাতিত নারীদের মধ্যে ইতিমধ্যে সরকার ছয়জনকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিয়েছে। বেঁচে থাকা নির্যাতনের শিকার বাকি ছয় নারীকে স্বীকৃতি দেওয়া হলে, শেষ জীবনে তাঁরা একটু স্বস্তি পাবেন।

সোহাগপুরের বিধবাদের মাঝে ভাতা প্রদান

সোহাগপুর গণহত্যার শিকার শহীদ পরিবারের বিধবাদের মাঝে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাক তাদের ক্ষুদ্র অর্থায়ন কর্মসূচির আওতায় মাসিক ৪০০ টাকা করে সম্মানী ভাতা এক বছরের অর্থ প্রদান করেছে। এতে বর্তমানে জীবিত শহীদ পরিবারের ২৫ জন বিধবার মাঝে প্রতিজনের জন্য এক বছরের একত্রে এক হাজার ৮০০ টাকা করে অর্থ বিতরণ করা হয়। জেলা প্রশাসক ড. মল্লিক আনোয়ার হোসেন ভাতার অর্থ শহীদ পরিবারের বিধবাদের হাতে তুলে দেন।

ভাতা বিতরণী উপলক্ষে বিধবাপল্লীর শহীদ স্মৃতিস্তম্ভের পাশের খোলা মাঠে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরফদার সোহেল রহমান। ব্র্যাক জেলা প্রতিনিধি আতাউর রহমানের সঞ্চালনায় আরো বক্তব্য দেন কাকরকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান শহীদুল্লাহ তালুকদার মুকুল, উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জিয়াউল হোসেন মাস্টার, সাংবাদিক এম এ হাকাম হীরা, ব্র্যাকের আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক মাজহারুল আনোয়ার, সোহাগপুর বিধবাপল্লী শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন প্রমুখ বক্তব্য দেন।


মন্তব্য