kalerkantho

বদরগঞ্জের গোপালপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র

চিকিৎসা দেন পিয়ন!

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, রংপুর   

১৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চিকিৎসা দেন পিয়ন!

রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসক না থাকায় চিকিৎসা দিচ্ছেন পিয়ন সুভাষ চন্দ্র রায়। ছবিটি গত বুধবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গোপালপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে পদ রয়েছে চারটি। কিন্তু কেন্দ্রটিতে নিয়োগ পাওয়া চিকিৎসক কর্মরত আছেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে।

ফার্মাসিস্ট পদটি শূন্য। উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা অফিস করেন তাঁর ইচ্ছামতো। ফলে প্রায়ই বন্ধ থাকে কেন্দ্রটি। আর যখন খোলা থাকে এবং ওই কর্মকর্তা অনুপস্থিত থাকেন তখন রোগীদের চিকিৎসা দেন কেন্দ্রের পিয়ন। জটিল, কঠিন রোগসহ নানা রোগের ব্যবস্থাপত্রও দেন তিনি।

এলাকাবাসীর এসব অভিযোগের সত্যতা মিলেছে সম্প্রতি গোপালপুর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে। গত বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে দেখা যায়, কেন্দ্রটির দরজা-জানালা বন্ধ। চিকিৎসক, উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, পিয়ন—কেউ উপস্থিত নেই। চিকিৎসা ও বিনা মূল্যের ওষুধ নিতে আসা বেশ কিছু রোগী কেন্দ্রের সামনে অপেক্ষা করছেন।

রোগী ও তাঁদের স্বজনরা জানালেন কেন্দ্রের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে তাঁদের নানা ভোগান্তির কথা। এ সময় সেখানে আচমকা উপস্থিত হলেন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পিয়ন সুভাষ চন্দ্র রায়। তিনি কক্ষের তালা খুলে ভেতরে ঢুকে স্বাভাবিকভাবেই বসলেন চিকিৎসকের চেয়ারে। আর রোগীরা হুমড়ি খেয়ে পড়ে নানা রোগের বর্ণনা দিলেন তাঁকে। তিনি রোগীর বর্ণনা শুনে একে একে ব্যবস্থাপত্রসহ ওষুধ দিলেন।

গোপালপুর ইউনিয়নের বসন্তপুর গ্রামের নুর বানু (২৫) ও তাঁর চার বছরের মেয়ে ঋতু মনি জ্বরে আক্রান্ত হয়ে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে এসেছে। আরেক রোগী খালেদা বেগম (৩৬) সুভাষ চন্দ্রকে বলেন, ‘স্যার, কয়দিন থাকি মোর শরীর দিয়া জ্বর বয়া যাওচে। পেটোত গ্যাস হওছে। ভালো ওষধু দেন। ’

খালেদা ও নুর বানুর রোগের বর্ণনা শোনার পর তাঁদের কয়েকটা অ্যান্টাসিড ও প্যারাসিটামল জাতীয় ট্যাবলেট দেন সুভাষ চন্দ্র রায়।

চিকিৎসকের পরিবর্তে কেন তিনি চিকিৎসা দিচ্ছেন—এমন প্রশ্নে সুভাষ চন্দ্র বলেন, ‘আমি চিকিৎসক নই ঠিক। আমি এমএলএসএস পদে চাকরি করি। স্যারেরা যখন থাকে না তখন আমি চিকিৎসা দিতে বাধ্য হই। আমিও না থাকলে এলাকার গরিব লোকজন চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যেত। (চিকিৎসকের) চেয়ারে আমার বসার যোগ্যতা নেই ঠিক। কিন্তু বসতে বাধ্য হচ্ছি। জাকির স্যার আমাকে বসতে বলেছেন। ’ তবে সুভাষ চন্দ্র জানান, উপসহকারি কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাকির হোসেন যখন কেন্দ্রে থাকেন, তখন তিনিই চিকিৎসা দেন।

বদরগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১১ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে গোপালপুর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র। সূত্র জানায়, গোপালপুর ইউনিয়ন ও পাশের রংপুর সদরের চন্দনপাট ইউনিয়নের প্রায় ২৫ হাজার মানুষের একমাত্র জরুরি চিকিৎসাকেন্দ্র এটি। সেখানে প্রতিদিন ৭০ থেকে ১০০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে যায়। কেন্দ্রটিতে একটি এমবিবিএস, একটি উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, একটি ফার্মাসিস্ট ও একটি এমএলএসএস (পিয়ন) পদ রয়েছে। এর মধ্যে চার বছর ধরে শূন্য ফার্মাসিস্ট পদ। কাগজে-কলমে সেখানে একজন এমবিবিএস চিকিৎসক থাকলেও তিনি চিকিৎসা দেন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাকির হোসেন থাকেন রংপুর সদরে। অফিসের কাজে ব্যস্ত থাকার অজুহাতে প্রায় প্রতিদিনই তিনি কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন বলে এলাকাবাসীর অভিযোগ। তিনি অল্প সময়ের জন্য উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে রোগী দেখে তাঁদের ওষুধ দিয়ে চলে যান। এতে ‘নিরুপায় হয়ে’ দিনের পর দিন চিকিৎসা দেন এমএলএসএস সুভাষ চন্দ্র রায়।

নিয়মানুযায়ী, সকাল ৯টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রটি খোলা থাকার কথা। কিন্তু গত বুধবার বেলা সাড়ে ১২টায় কেন্দ্রেটি বন্ধ থাকার কারণ জানতে চাইলে সুভাষ চন্দ্র রায় বলেন, ‘আমি অফিস না খুললে বন্ধই থাকত। সকাল থেকে খোলা ছিল। জাকির স্যার সকালের দিকে রংপুরে চলে যাওয়ায় আমি বন্ধ রেখে নাশতা করতে গেছিলাম। ’

চিকিৎসা নিতে আসা বসরাতপুর গ্রামের মনির হোসেন (৪০) অভিযোগ করে বলেন, ‘এই হাসপাতালে (উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র) ডাক্তারোক কোনোদিন চোখেও দেখি নাই। চিকিৎসা ও ওষুধ দেন পিয়ন। ’ নন্দনপুর গ্রামের মাজেদা আক্তারের (৪০) অভিযোগ, ‘এখানকার ডাক্তার ক্যায়, আর ক্যায় পিয়ন, তা হামরা চিনমো কি করি। প্রায় সমায় সুভাষ দাদায় তো ডাক্তারি করে। ’

অভিযোগ অস্বীকার করে উপসহকারী কমিউনিটি স্বাস্থ্য কর্মকর্তা জাকির হোসেন মোবাইল ফোনে বলেন, ‘ওই দিন একটু ব্যস্ততার কারণে পিয়নকে দায়িত্ব দিয়ে বাড়ি চলে যাই। ’

গোপালপুর ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের দায়িত্বরত চিকিৎসক ইসতিয়াক মাহমুদ বলেন, ‘ইউনিয়ন পর্যায়ের কেন্দ্রগুলো শুধু দিনের বেলা খোলা থাকে। কিন্তু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স খোলা থাকে ২৪ ঘণ্টা। চিকিৎসক সংকটের কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে আমাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ’

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (টিএইচও) ডা. মনোয়ারা বেগম বলেন, ‘গোপালপুর উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের চিকিৎসাব্যবস্থা নিয়ে এর আগেও অভিযোগ এসেছে। ওই কেন্দ্রে চিকিৎসকের দায়িত্বে আছেন ইসতিয়াক মাহমুদ। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক সংকট থাকায় তাঁকে এখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। ’ পিয়ন চিকিৎসা দিতে পারেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রংপুর সিভিল সার্জন জাকিরুল ইসলাম লেলিন বলেন, ‘পিয়নের চিকিৎসা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এ ধরনের কোনো অভিযোগ থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য