kalerkantho


কসবায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’

কবিরাজ হত্যার নির্দেশদাতা মামা হুজুর নিহত

বিশ্বজিৎ পাল বাবু, ব্রাহ্মণবাড়িয়া    

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



কবিরাজ হত্যার নির্দেশদাতা মামা হুজুর নিহত

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় কবিরাজ ফরিদ মিয়া হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা তাজুল ইসলাম আল মাহমুদ (৪৬) গত বুধবার গভীর রাতে পুলিশের সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। তাজুল ইসলামের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার নবীনগর উপজেলার ৬ নম্বর খোরসা ইউনিয়নের সাদুল্লাপুর গ্রামে। তিনি কসবায় ‘মামা হুজুর’ নামে পরিচিত ছিলেন।

পুলিশের দাবি, নিহত মামা হুজুর নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল জিহাদের আঞ্চলিক কমান্ডার। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় অন্তত পাঁচটি মামলা আছে। এর মধ্যে একটিতে তিনি সাজাপ্রাপ্ত। জঙ্গি হামলার প্রস্তুতির খবর পেয়ে কুটি এলাকায় অভিযানে গেলে মামা হুজুরসহ তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে পুলিশের বন্দুকযুদ্ধ হয়। নিজ দলের সদস্যদের গুলিতে মারা যান মামা হুজুর। এতে পাঁচ পুলিশ সদস্যও আহত হন। ঘটনাস্থল থেকে ককটেলসহ বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

বিভিন্ন সূত্র জানায়, কসবার জগন্নাথপুর গ্রামে কবিরাজ ফরিদ মিয়া খুনের ঘটনার পর মামা হুজুরের নাম আলোচনায় আসে।

খুনের ঘটনায় জহির মিয়া নামের এক ব্যক্তি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ধর্ষণ, প্রতারণাসহ কবিরাজের নানা কর্মকাণ্ডে মামা হুজুর ক্ষুব্ধ ছিলেন। ফলে তিনি কবিরাজকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। তাঁর নির্দেশেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটনো হয়। মামা হুজুর বেশ কয়েক মাস কসবার শাহপুর গ্রামে অবস্থান করেন। ১৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ নিজ বাড়ি থেকে ফরিদ মিয়ার গলা কাটা লাশ উদ্ধার করে। ২৪ ফেব্রুয়ারি জহির মিয়া আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

পুলিশের সঙ্গে কথা বলে ও বেতার বার্তা থেকে জানা যায়, রাত পৌনে ২টায় টহল পুলিশের মাধ্যমে খবর আসে, কুটি এলাকার মা অটো ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দক্ষিণ পাশে আব্দুল মোতালেবের খালি জায়গায় তাজুল ইসলাম আল মাহমুদসহ অজ্ঞাতপরিচয় চার-পাঁচজন অবস্থান করছে। এই অবস্থায় পুলিশ আরো সংঘবদ্ধ হয়ে ওই এলাকা ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে পুলিশকে লক্ষ্য করে ককটেল নিক্ষেপ ও গুলি ছোড়া হয়। আত্মরক্ষার্থে পুলিশ ৯ রাউন্ড কার্তুজ ছোড়ে। হামলায় আহত হন কসবা থানার এসআই মো. বেলাল হোসেন, মো. নুরুল হক, এএসআই মো. মহিউদ্দিন, কনস্টেবল নিজাম উদ্দিন ও মো. ইব্রাহিম। সহযোগীদের গুলিতে তাজুল ইসলাম আল মাহমুদ মারা যান।   ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ ৩৫টি ককটেল, পাঁচটি চাপাতি, একটি পাইপগান ও ৯টি কার্তুজ উদ্ধার করে। একই সঙ্গে তাজুল ইসলামের লাশ থানায় নিয়ে আসা হয়।

কসবা পৌরসভার মেয়র মো. এমরান উদ্দিন জুয়েল বলেন, ‘তাজুল ইসলাম ওরফে মামা হুজুরকে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি না। তবে কবিরাজ হত্যাকাণ্ডের পর তার সম্পর্কে আমি জানতে পারি। সে এলাকায় থেকে নানা ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত ছিল। পুলিশের কাছ থেকে জানতে পেরেছি সে নাকি জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গেও জড়িত। ’ 

কসবা থানার ওসি মো. মহিউদ্দিন কালের কণ্ঠকে জানান, হরকাতুল জিহাদ নেতা এই নিহত তাজুল ইসলাম। কসবায় তিনি মামা হুজুর হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কবিরাজ ফরিদ মিয়া খুনের ঘটনায় জহির মিয়া নামে এক ব্যক্তির আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে নির্দেশদাতা হিসেবে তাজুল ইসলামের নাম বলেন। এর পর থেকেই পুলিশ সেই মামা হুজুরকে খুঁজছিল। গত বুধবার গভীর রাতে তাঁর অবস্থান সম্পর্কে জানতে পেরে সেখানে অভিযান চালানো হয়।

ফিরে দেখা : কবিরাজ হত্যাকাণ্ডে জবানবন্দি

ধর্ষণ, প্রতারণা ঠেকিয়ে বেহেশতে যেতে কথিত মামা হুজুরের নির্দেশে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার কবিরাজ ফরিদ মিয়াকে হত্যা করে জহির মিয়া নামের এক ব্যক্তি। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আদালতে দেওয়া ১৬৪ ধারার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ঘাতক জহির মিয়া এ কথা উল্লেখ করেন। জবানবন্দি মতে, হত্যাকাণ্ডে ব্যবপিত ছুরিটি উদ্ধার করে পুলিশ।   

জবানবন্দির বরাত দিয়ে কসবা থানার পুলিশ সূত্র জানায়, উপজেলার শাহপুর গ্রামের জহির মিয়ার সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর বনিবনা হতো না ও তাঁকে ‘বোবা’ ধরত। এই অবস্থায় জহির মিয়া প্রায় আট মাস আগে কবিরাজ হিসেবে পরিচিত ফরিদ মিয়ার শরণাপন্ন হন। তখন ফরিদ মিয়া জানান, তিনি যা বলেন তা শুনলে জহিরের সব ঠিক হয়ে যাবে। জহির নিয়মিত যাওয়া-আসা করতে গিয়ে দেখতে পান কবিরাজের এখানে কৌশলে ধর্ষণ করা হয়। এখানে অনেকে প্রতারণার শিকার হচ্ছে। এরই মধ্যে ফরিদ ও জহিরের মধ্যেও সমকামিতার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। জহির তখন এ নিয়ে শাহপুর গ্রামে অবস্থানরত মামা হুজুর নামে এক ব্যক্তির শরণাপন্ন হন। ওই মামা হুজুর তখন জহির মিয়াকে জানান, ফরিদ মিয়ার মতো প্রতারককে মেরে ফেলা হলে বেহেশতে যাওয়া যাবে। এর পর থেকেই ফরিদ মিয়াকে হত্যার ছক করা হয়। মামা হুজুর জানান এ কাজে তিনিও জহিরকে সহায়তা করবেন।

জবানবন্দিতে জহির উল্লেখ করেন, ১৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মামা হুজুরসহ তিনি কুটি এলাকা থেকে একটি ছুরি, চানাচুর, বিস্কুট, সরিষার তেল ইত্যাদি কিনে জগন্নাথপুর গ্রামে ফরিদ মিয়ার বাড়িতে আসেন। ফরিদ মিয়া বাড়িতে না থাকায় তাঁকে মোবাইল ফোনে কল করে ডেকে আনা হয়। রাতে সমকামিতার একপর্যায়ে ফরিদ মিয়া অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। ফরিদ মিয়া এ সময় জহির মিয়াকে মাথা টিপে দিতে বলে। এরই মধ্যে ফরিদ মিয়া ঘুমিয়ে পড়লে গলায় ছুরি চালান জহির মিয়া। এ সময় মামা হুজুর পাশেই ছিলেন এবং দোয়া পড়েন।


মন্তব্য