kalerkantho


স্রেফ সাইনবোর্ডের দামই সাত লাখ!

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

১৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



স্রেফ সাইনবোর্ডের দামই সাত লাখ!

খাল খননের জন্য বরাদ্দের টাকা কাজ না করেই লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। খাল খননের এ রকম অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে পটুয়াখালীর গলাচিপার বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের লামনা গুচ্ছগ্রামে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে সাত লাখ টাকা বরাদ্দ থাকলেও কোনো কাজই হয়নি। শুধু প্রকল্পের নামে একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। আর সাইনবোর্ড দেখিয়ে তুলে নেওয়া হয়েছে বরাদ্দের সব টাকা।

জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্প এলাকা এবং অন্যান্য জলাশয়ে মাছ চাষ উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ওই উপজেলার বকুলবাড়িয়া ইউনিয়নের লামনা গুচ্ছগ্রামের দক্ষিণ পাশের খালটি পুনঃখননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রকল্পের নাম দেওয়া হয় ‘লামনা গুচ্ছগ্রামের দক্ষিণ পার্শ্বে খাস খাল পুনঃখনন। ’ প্রকল্পের মোট আয়তন ০.৬১৪ হেক্টর, জলায়তন ০.৪৯১ হেক্টর। মোট মাটির কাজের পরিমাণ ৪৯১০.০০ ঘনমিটার, কাজের দর হার ১৪২.৫৭ টাকা প্রতি ঘনমিটার। প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট খরচ ধরা হয় সাত লাখ টাকা। ১৯ জন পুরুষ, ১০ জন নারীসহ ২৯ জন শ্রমিক এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করার কথা।

প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চুক্তিবদ্ধ ভূমিহীন নেতার নাম মো. ইব্রাহিম বিশ্বাস।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, খাল খননের কোনো কাজ হয়নি। শুধু প্রকল্প এলাকায় একটি সাইনবোর্ড টাঙানো হয়েছে। ওই বোর্ডটি লাগিয়ে আবার কয়েক দিন পর প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চুক্তিবদ্ধ ভূমিহীন নেতার লোকজন সেটিকে জঙ্গলে ফেলে দেয়।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, খালটি খননের জন্য মো. ইব্রাহিম বিশ্বাসের নাম শুধু কাগজেকলমে ব্যবহার করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে ওই নাম ব্যবহার করে তাঁর (ইব্রাহিম বিশ্বাস) শ্যালক নাসির উদ্দিন সবুজ প্রকল্পের পুরো টাকা কাজ না করেই নিয়ে গেছে। সবুজ বকুলবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক। তিনি স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাবশালী। স্থানীয়দের আরো অভিযোগ, সরকার লাখ লাখ টাকা দিয়ে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করে, আর তা তদারকির জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লোকজন রয়েছে। এর পরও কাজ না করে টাকা মেরে দেওয়ার ঘটনায় হতাশ তারা।

লামনা গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল অলি বলেন, ‘খালডা মোডেও (আদৌ না) কাডে নাই। ক্যামনে খাল না কাইট্টা সরকারের লাখ লাখ টাহা লইয়া গ্যালে। আমাগো মোত গরিবরা না খাইয়া থাহে আর য্যাগো আছে হ্যারা সরকারের টাহা ফাও খাইয়া হালায়। সবুজ কয় (বলে) এই সাইনবোর্ডের দামই সাত লাখ। ’ গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা নাসিমা বেগম বলেন, ‘খালডা কাডা অইলে আমরা সরকারের তোন খালডা লিজ লইয়া মাছ চাষ করতে পারতাম। অ্যাহন না কাডার কারণে খালের পানিও ঠিক মতো ব্যবহার করতে পারি না। ’ মো. দুলাল মিয়া বলেন, ‘যখন সরকারের লোকজন খাল কাডা দেখতে আইছে সবুজ মিয়া সাইনবোর্ড দেহাইয়া হ্যাগোরে বিদায় করছে। ’ হেলেনা বেগম, সাহা ভানু, ছাবেদ আলীসহ ওই এলাকার প্রায় শতাধিক লোক একই ধরনের অভিযোগ করেন।

বকুলবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু জাফর খান বলেন, ‘ইব্রাহিম বিশ্বাস প্রকল্পের কাগজেকলমে থাকলেও সব করেছেন তাঁর শ্যালক নাসির উদ্দিন সবুজ। মূলত খাল কাটা হয়নি। শুনেছি, সবুজ ১০ থেকে ১৫ জন লোক নিয়ে একদিন খাল কাটতে গিয়েছিল, ওই পর্যন্তই। পরে একটি সাইনবোর্ড লাগিয়ে এসেছে। ’

এ ব্যাপারে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য চুক্তিবদ্ধ ভূমিহীন নেতা মো. ইব্রাহিম বিশ্বাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর শ্যালক বকুলবাড়িয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক নাসির উদ্দিন সবুজ বলেন, ‘ওই প্রকল্পের আমি কিছু না। তা ছাড়া ভিজিট করে কর্তৃপক্ষ বিল দিয়েছে। স্থানীয় কর্মকর্তাদের পাশাপাশি ঢাকা থেকেও লোক এসে পরিদর্শন করেছেন। এগুলো স্থানীয় কিছু লোকজনের মিথ্যা অভিযোগ ও আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এসব নিয়ে পত্রিকায় লিখলে কি হবে। আসেন একসঙ্গে চা খাই। ’

গলাচিপা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস বলেন, ‘যতটুকু মাটি ওখানে কাটার কথা ছিল ততটুকু মাটি কাটা হয়নি বৃষ্টির কারণে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে অনেক সমস্যা হয়, এ কারণে এ বছর আমি একটা প্রকল্পের প্রস্তাবও পাঠায়নি। ’ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. আবুল হাসনাত বলেন, ‘ওই সময় এ কর্মস্থলে আমি ছিলাম না, এ কারণে এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না। ’


মন্তব্য