kalerkantho


সোনারগাঁ

‘গ্যাস কমিটি’র পোয়াবারো

আসাদুজ্জামান নূর, সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ)   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় ইউনিয়নভিত্তিক ‘গ্যাস কমিটি’ করে অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ দিয়ে প্রায় ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন স্থানীয় যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতারা। অনেক স্থানে আবার মাসিক হারে বিলও তোলা হচ্ছে। সরেজমিনে ঘুরে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা গেছে।

এদিকে উপজেলার সনমান্দী, শম্ভপুরা, নোয়াগাঁও ও বারদী ইউনিয়নে গিয়ে দেখা গেছে, পাকা ও কাঁচা সড়ক কেটে গ্যাসের পাইপ বসানো হয়েছে। নিম্নমানের পাইপ দিয়ে ওই গ্যাস সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে কয়েক স্থানে গ্যাস লাইন বিস্ফোরণে এরই মধ্যে ২৭ জন আহত হয়েছে। কয়েকটি বাড়ি পুড়ে গেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে আওয়ামী লীগ সমর্থক পরিচয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন নিজেকে তিতাস গ্যাসের ঠিকাদার দাবি করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেন। যদিও উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া জানিয়েছেন, জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী লীগের কেউ নন। পরে শম্ভপুরা ইউনিয়নে নারায়ণগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সহসভাপতি সোহাগ রনি, শম্ভপুরা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি আবু সিদ্দিক মোল্লা, পিরোজপুর ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেতা মোশারফ হোসেন ভবনাথপুর, রতনপুর ও ভাটিবন্দর গ্রামে এলজিইডির সড়ক কেটে সংযোগ দিয়েছেন। গত বছরের সেপ্টেম্বরে ওই রাস্তা কাটার পর তাঁর বিরুদ্ধে সোনারগাঁ থানায় ডায়েরি করা হয়।

গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা করে আদায় করছেন তিনি।

সনমান্দী ইউনিয়নের অবৈধ গ্যাস সংযোগে নেতৃত্ব দিচ্ছেন উপজেলা যুবলীগের সাবেক সহসভাপতি আমিনুল ইসলাম আমান, উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ও উপজেলা পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নাছিমা বেগমের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক বাবুল, যুবলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন, নুরু মিয়া ও আক্তার হোসেন, বৈদ্যের বাজার এলাকায় যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রুবায়েত হোসেন শান্ত, বৈদ্যের বাজার ইউপি চেয়ারম্যান ডা. আবদুর রউফের ছেলে মোহাম্মদ উল্লাহ, স্থানীয় যুবলীগকর্মী ফারুক হোসেন, রবি উল্লাহ, সানোয়ার হোসেন, স্বাধীন মিয়া, সুকুমার, মাসুম মিয়া ও জাহাঙ্গীর হোসেন, বারদী এলাকায় যুবলীগকর্মী নাজমুল হোসেন, নাসির মিয়া, মোবারক হোসেন, জাতীয় পার্টির নেতা রফিক মেম্বার, রমজান আলী, অহিদ মিয়াসহ একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী গ্যাস সংযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। তারা সবাই ‘গ্যাস কমিটি’র সদস্য।

সূত্র মতে, গ্যাস কমিটি নামের ওই সিন্ডিকেট ১০টি ইউনিয়ন ও সোনারগাঁ পৌরসভায় প্রায় ২৫ হাজার অবৈধ সংযোগ দিয়ে রাইজারপ্রতি ২৫ হাজার করে প্রায় ৬০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। পুলিশ, প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি ও তিতাস গ্যাসের কয়েকজন কর্মকর্তা এ টাকার ভাগ পেয়েছেন। সাধারণ মানুষ তাদের গৃহপালিত পশু বিক্রি করে, সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে, ধারকর্জ করে ওই টাকা দিয়েছে।

তিতাস গ্যাসের কর্মকর্তারা জানান, নিম্নমানের পাইপ দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে গ্যাস সংযোগ দেওয়ায় এরই মধ্যে কয়েক স্থানে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। তাতে বাড়িঘরও পুড়েছে। এসব পাইপলাইন বিস্ফোরণে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। গত ১০ জুন সোনাখালী ও ১৬ জুন পানাম এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যেই আবার অবৈধ সংযোগ দেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এর আগে সোনাখালী এলাকার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে এলাকাবাসীর ধাওয়া খেয়ে তিতাস গ্যাস কর্মকর্তা ও পুলিশ পালিয়ে আসে। এলাকাবাসী জানায়, তারা টাকা দিয়ে গ্যাসলাইন নিয়েছে। তাই ওই লাইন বিচ্ছিন্ন করার বিষয়টি মেনে নেবে না। নিম্নমানের পাইপ সরিয়ে গ্যাসের বৈধতা পেলে সাধারণ জনগণ উপকৃত হবে। তাতে সরকারও লাভবান হবে।

সনমান্দী ইউনিয়নের ফতেপুর গ্রামের গ্রাহক মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের গ্যাস সংযোগ বৈধ করার কথা বলে নেতারা অতিরিক্ত টাকা নিয়েছে। আমরা সাধারণ মানুষ অনেক কষ্টে তাদের টাকা পরিশোধ করেছি। ’ এ ক্ষেত্রে অবৈধ গ্যাস সংযোগ দ্রুত বৈধ করার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন তিনি।

আলমদী গ্রামের আবু তাহের জানান, কতিপয় নেতা সাধারণ জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন। নিয়ম অনুযায়ী গ্যাস সংযোগ বৈধ করতে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানির কাছে দাবি জানান তিনি।

অবৈধ গ্যাস সংযোগদানকারী আমিনুল ইসলাম আমান, সোহাগ, রনিসহ কয়েকজন দাবি করেন, জনগণের সুবিধার্থেই তাঁরা গ্যাস সংযোগ দিয়েছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, ‘দলের নাম ভাঙিয়ে যারা অবৈধ গ্যাস সংযোগ দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের এ অন্যায়কে আমরা সমর্থন করি না। দল তাদের দায়ভার নেবে না। ’

তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড কাঁচপুর অঞ্চলের ব্যবস্থাপক আবদুল মোমেন তালুকদার দাবি করেন, ‘এর সাথে আমরা জড়িত নই। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য কয়েকবার অভিযান চালানো হয়েছে। শিগগিরই আবারও অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। ’

সোনারগাঁ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম জানান, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে এরই মধ্যে অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।


মন্তব্য