kalerkantho


দোহার উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের কর্মকর্তা

চেয়ার ফাঁকা, মাস ফুরালেই টাকা

দোহার-নবাবগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চেয়ার ফাঁকা, মাস ফুরালেই টাকা

ঢাকার দোহার উপজেলা প্রশাসন ও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের অধিকাংশ কর্মকর্তা মাসের পর মাস অফিস ফাঁকি দিচ্ছেন। উপজেলা প্রশাসনের কয়েকটি দপ্তরের কর্মকর্তাকে অফিসে নিয়মিত পাওয়া গেলেও ইউনিয়ন পরিষদের বিভিন্ন দপ্তরের সরকারি কর্মকর্তাদের একেবারেই পাওয়া যায় না। প্রায় সব সময় তালাবদ্ধ থাকে তাঁদের কক্ষগুলো। উপজেলা প্রশাসনের কোনো কোনো দপ্তরের কর্মকর্তা সপ্তাহে দু-এক দিন অফিস করেন। কিন্তু মাস শেষে জনগণের টাকায় দেওয়া সরকারি বেতন ঠিকই তোলেন এই ফাঁকিবাজ কর্মকর্তারা। এমন তথ্য পাওয়া গেছে সরেজমিন অনুসন্ধানে।

অভিযোগ রয়েছে, ঢাকায় মিটিং, জেলা অফিসে মিটিং, অসুস্থতা, বৃষ্টি এমন বিভিন্ন অজুহাতে অফিস ফাঁকি দেন সরকারি ওই কর্মকর্তারা। সবচেয়ে বেশি ফাঁকিবাজি চলছে ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে। সরকারিভাবে নির্মিত পাকা ভবন সম্পন্ন ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে উপজেলা প্রশাসনের আওতাধীন বিভিন্ন দপ্তরের উপসহকারী কর্মকর্তাদের নিজস্ব অফিসকক্ষ রয়েছে। কিন্তু মাসে এক দিনও সেখানে যান না তাঁরা। কক্ষগুলো প্রায় সব সময় থাকে তালাবদ্ধ।

ফলে জনগণ জানেই না কী সেবা তারা পাবে সেখান থেকে। একাধিক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান জানান, তাঁরাও খোঁজখবর পান না ওই কর্মকর্তাদের। এমনকি তাঁদের নামও জানেন না চেয়ারম্যানরা। বিলাসপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মোল্লা বলেন, ‘ওই কর্মকর্তাদের নামের তালিকা আমাদের কাছে নেই। আর জানব কী করে, মাসে এক দিনও অফিসে আসেন না তাঁরা। দু-একজন এলেও কখন আসেন বা যান কেউ তাঁদের দেখেন না। ’ এভাবেই চলছে প্রতিটি ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি কর্তাদের কার্যক্রম।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কৃষি, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, মত্স্য, পরিবার-পরিকল্পনাসহ কয়েকটি দপ্তরের একজন করে কর্মকর্তা ইউনিয়নভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া আছে। কিন্তু মাস শেষে সরকারি বেতন তোলা ছাড়া তাঁরা তেমন কোনো কাজ করেন না। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অফিস করার বিষয়ে ফোন দিলে তাঁদের মুখে থাকে মিথ্যার ফুলঝুরি। গ্রামে মিটিং করার কথা বলে ঢাকার বাসায় অবস্থান করেন প্রতিনিয়ত। আবার ঢাকায় মিটিংয়ের কথা বলে চট্টগ্রামে বেড়াতে গেছেন এমন এক কর্মকর্তারও খোঁজ মিলেছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি সকাল সোয়া ১১টায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি দপ্তরে অফিস সহকারী ছাড়া আর কোনো কর্মকর্তা নেই। আট-৯টি অফিসের প্রধান কর্মকর্তার চেয়ার খালি পড়ে আছে। ১১টা ২৫ মিনিটে মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লিয়াকত আলীর অফিসে গেলে এক কর্মচারী বলেন, ‘স্যার ঢাকা গেছেন। কাল আসবেন। ’ এ কথা শুনে একজন সেবাগ্রহীতা বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীরা তো এমনই। সপ্তাহের বেশির ভাগ সময়ই তাঁদের পাওয়া দুষ্কর। ’

পরে পরিসংখ্যান ও মত্স্য কর্মকর্তার কক্ষ দুটি তালাবদ্ধ পাওয়া যায়। জানা গেল, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা নেই এক-দেড় বছর ধরে। মাঝে একজনকে নিয়োগ করা হলেও অদৃশ্য কারণে তাও আটকে আছে। আর মত্স্য কর্মকর্তা এ বি এম জাকারিয়া প্রকল্প পরিদর্শনে বাইরে গেছেন। দুপুর সাড়ে ১২টার পর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে বসে আছেন বিলাসপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন মোল্লা ও কয়েকজন ব্যক্তি। জানা যায়, তখনো অফিসে আসেননি প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ মিয়া।

দুপুর পৌনে ১টার পর পাওয়া যায়নি উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা সামছুন্নাহার খান, সমাজসেবা কর্মকর্তা মিয়া মঞ্জুর-এ-এলাহী, উপসহকারী প্রকৌশলী আবু ছাঈদ মল্লিক, সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শামীম, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, উপসহকারী প্রকৌশলী (জনস্বাস্থ্য) মো. ইলিয়াস আনসারী, পল্লী উন্নয়ন কর্মকর্তা মনসুর রহমান ও উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আকবর হোসেন মিয়াকে।

১ মার্চ সকাল সাড়ে ১১টায় উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন অধিদপ্তরে গিয়ে অধিকাংশ প্রধান কর্মকর্তাকে অনুপস্থিত পাওয়া যায়। অনুপস্থিত ছিলেন মিয়া মঞ্জুর-এ-এলাহী, মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন, সামছুন্নাহার খান, আবু ছাঈদ মল্লিক, মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, মো. ইলিয়াস আনসারী, মনসুর রহমান, আকবর হোসেন মিয়া, উপজেলা মত্স্য কর্মকর্তা এ বি এম জাকারিয়া, সমবায় কর্মকর্তা রওশন আরা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা হাবিবুল্লাহ মিয়া ও নির্বাচন কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন। সূত্র জানায়, এঁদের মধ্যে এ দিন এসএসসি পরীক্ষা কেন্দ্রের দায়িত্বে ছিলেন মিয়া মঞ্জুর-এ-এলাহী ও সাদিয়া আফরিন। এক কর্মচারী জানান, সপ্তাহে মাত্র এক দিন অফিস করেন উপজেলা উপসহকারী প্রকৌশলী। একই কাণ্ড করেন সামছুন্নাহার খান। অনিয়মিত অফিস করেন মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন, লিয়াকত আলী, মনসুর রহমান, আকবর হোসেন মিয়া, হাবিবুল্লাহ মিয়া ও উপজেলা বিআরডিবির প্রকল্প কর্মকর্তা ইকবাল হোসেন।

একই অবস্থা দোহার উপজেলা পরিষদের। উপজেলা চেয়ারম্যান মো. আলমগীর হোসেনকে পাওয়া গেলেও দুই ভাইস চেয়ারম্যান মাসুদ পারভেজ ও শামিমা রাহিমা অফিসে একেবারেই অনিয়মিত। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল-আমীন ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোজাম্মেল হক রাসেল নিয়মিত অফিস করেন। উপজেলা প্রশাসনে সেবা নিতে আসা কয়েকজন বলেন, মানুষ সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা পাবে কী, উল্টো ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। এ চিত্র প্রায় প্রতিটি দপ্তরে। অধিকাংশ কর্মকর্তা আসেন সকাল ১১টায়, চলে যান দুপুর ২টায়। তাঁরা সপ্তাহে দু-তিন দিন অফিস করেন। জনগণকে সেবা না দিয়ে জনগণের কষ্টের টাকায় তাঁরা বেতন নেন।

উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আমি আজ (বুধবার) ছুটিতে আছি। মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হয় বলে মাঝেমধ্যে আমাকে অফিসের বাইরে থাকতে হয়। ’

নির্বাচন কর্মকর্তা জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাকে জেলা নির্বাচন অফিসে সপ্তাহে দু-এক দিন কাজ করতে হয়। এ ছাড়া আমি দোহারে অন্যান্য দিন নির্দিষ্ট সময়ে অফিস করি। জেলা নির্বাচন অফিসের নির্দেশে আমি আজ (বুধবার) ঢাকায় স্মার্ট কার্ড বিতরণের কাজ করছি। ’

উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আকবর হোসেন মিয়া জানান, তাঁকে একত্রে দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার দায়িত্ব পালন করতে হয় বলে তিনি দু-তিন দিন দোহারে অফিস করতে পারেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম আল-আমিন বলেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা অফিস করেন না, বিষয়টি আমারও নজরে এসেছে। নিজ নিজ দপ্তরের কর্মকর্তাদের ডেকে জিজ্ঞেস করা হবে। জনগণকে সেবা দেওয়ার জন্য সরকার আমাদের নিয়োগ দিয়েছে, বেতন দিচ্ছে। কাজেই সেবার মনোভাব নিয়েই আমাদের সবার কাজ করা উচিত। ’


মন্তব্য