kalerkantho


বিবর্ণ জীববৈচিত্র্য

পলাশ ও ঘোড়াশাল সার কারখানার বর্জ্য

সুমন বর্মণ, নরসিংদী   

১৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বিবর্ণ জীববৈচিত্র্য

নরসিংদীর পলাশে সার কারখানার দূষিত অ্যামোনিয়া গ্যাসে খানেপুর গ্রামের অনেক পুকুরের মাছ এভাবে মরে ভেসে ওঠে। ছবি : কালের কণ্ঠ

নরসিংদীর পলাশের রাবাণ গ্রামটি অনেক আগেই থেকেই ফলভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। ছোট ছোট টিলাঘেরা প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্যের গ্রামটিতে বারো মাসই উৎপাদিত হয় বাহারি ফল।

পাশাপাশি রয়েছে বিপুলসংখ্যক মাছের বাণিজ্যিক খামার, যা জেলার মানুষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রাজধানীতে সরবরাহ করা হয়।

পাশেরই আরেকটি গ্রাম খানেপুর। গ্রামের অধিকাংশ গাছের পাতাই ধূসর। নেই তেমন ফলদ গাছ। পুকুরগুলো অনেকটাই মাছশূন্য। এমনকি হাঁস-মুরগিরও দেখা মেলে নাা। অনেকে বাপ-দাদার ভিটা বিক্রি করে অন্যত্র পাড়ি জমিয়েছেন।

খানেপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. সুরুজ মিয়া বলেন, ‘বাড়ির পাশে দুটি সার কারখানা হওয়ার পরই আনগর সুখ হারাইয়্যা গেছে। সার কারখানার গ্যাসের কারণে দম নেওয়া যায় না।

ফসল করা যায় না। পুকুরের মাছ মরে যায়। ’

গ্রামের পাশেই অবস্থিত ঘোড়াশাল ও পলাশ সার কারখানা দুটি থেকে সরাসরি দূষিত অ্যামোনিয়া গ্যাস ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা হচ্ছে খোলা স্থানে। এতে আক্রান্ত হচ্ছে আশপাশের মানুষ। বাড়ছে শ্বাসকষ্ট, বুক ব্যথা, পেটের পীড়াসহ নানা রোগ।   ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শাকসবজি, আম, কাঁঠাল, লিচুর মতো ফলদ গাছ। ঝলসে যাচ্ছে গাছের পাতা। মরে যাচ্ছে মাছসহ জলজ প্রাণী। সার কারখানার পাশের খানেপুর গ্রাম ঘুরে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। চার লাখ ৭০ হাজার টন উৎপাদন ক্ষমতার ঘোড়াশাল ইউরিয়া সার কারখানা ও ৯৫ হাজার টন উৎপাদন ক্ষমতার পলাশ ইউরিয়া সার কারখানা। কিন্তু সার কারখানা দুটির বর্জ্য পরিশোধন ও দূষণ নিয়ন্ত্রণে কোনো ব্যবস্থা নেই। কারখানা দুটি থেকে সরাসরি দূষিত অ্যামোনিয়া গ্যাস ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলা হচ্ছে কারখানার উত্তর পাশে একটি লেগুনে (পুকুরে)। এ লেগুনের পূর্ব ও উত্তর পাশেই খানেপুর গ্রাম। সার কারখানার পাশ দিয়ে খানেপুর গ্রামের সড়কে ঢুকলেই নাকে লাগে অ্যামোনিয়া গ্যাসের গন্ধ। কিছুক্ষণ দাঁড়াতেই শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়। চোখ জ্বালাপোড়া করে, ঝরে পানি। অথচ খানেপুর গ্রামের হাজারো মানুষ বছরের পর বছর অ্যামোনিয়ার বিষাক্ত ছোবলের মধ্যেই বাস করে নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।   গ্রামের কোথাও নেই সবজির আবাদ। বাড়ির আঙিনায় লাগানো লাউ, কুমড়াসহ বিভিন্ন সবজির গাছের পাতা পুড়ে ঝলসে গেছে। কলাসহ বিভিন্ন গাছের পাতাও পুড়ে কুঁকড়ে আছে।

গ্রামের মাছচাষি সুরুজ মিয়া বলেন, ‘সার কারখানার গ্যাসের কারণে বাড়িতে কোনো ফলদ গাছ হয় না, জমিতে কোনো ফসল হয় না। তাই কারখানা বন্ধ থাকার ফাঁকে পুকুর খনন করে মাছ চাষ করি। অন্যান্য বছর গ্যাসে মাছ মরলেও তা কম ছিল, কিন্তু এ বছর এক দিনেই সব মাছ মরে যাওয়ায় আমার মতো আরো অনেকে নিঃস্ব হয়েছে।

 লেগুনের উত্তর পাশে দেখা যায়, বিশাল পতিত জমির মধ্যিখানে একটি পরিত্যক্ত টিউবওয়েল। আগে এখানে বসতি ছিল তা স্পষ্ট অনুমান করা যায়। পাশ দিয়েই হেঁটে যাচ্ছিলেন গ্রামের বাসিন্দা কবির হোসেন। তিনি জানান, এখানে ওমর আলী ভূঞা, আউয়াল ভূঞা ও মুরসালিন ভূঞা, লুত্ফর, সাদত আলী ও নুরুল ইসলামের বাড়ি ছিল। অ্যামোনিয়া গ্যাসের ঝাঁজাল গন্ধ সহ্য করতে না পেরে তারা অন্যত্র চলে গেছে। সম্প্রতি একই এলাকার নুরুল ইসলাম, দ্বীন ইসলাম, তাজু ইসলাম ও নজরুল ইসলাম ঘরবাড়ি সরিয়ে নেওয়ার বন্দোবস্ত করেছেন।

অ্যামোনিয়া গ্যাসের সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধদের। তাই বাধ্য হয়ে শিশুদের জন্মের পরই অন্যত্র পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে। গ্রামের বাসিন্দা সূর্যবান বলেন, ‘পোলার ঘরে নাতি হয়েছে আড়াই মাস হলো। কিন্তু গ্যাসের কারণে নাতির শ্বাসকষ্ট হয়, কান্না করে। চোখ মেলে তাকাতে পারে না। তাই বাধ্য হয়ে পোলার শ্বশুরবাড়ি জামালপুরে নাতিকে পাঠিয়ে দিয়েছি। ’

পলাশ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ভারপ্রাপ্ত প্রধান আবাসিক চিকিৎসক (আরএমও) ডা. মাজহারুল হক বলেন, ‘অ্যামোনিয়া গ্যাস শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢুকে। পরে তা ভেঙে একধরনের এসিড তৈরি করে, যা ফুসফুসের টিস্যু নষ্ট হয়ে শ্বাসকষ্টের সৃষ্টি করে। পাশাপাশি বুক ব্যথা, পেটের পীড়া ও চর্মরোগ দেখা দেয়। আমাদের হাসপাতালে প্রতিদিন আট থেকে ১০ জন শ্বাসকষ্টের রোগী চিকিৎসা নেয়। এদের অধিকাংশই শিশু। সর্বশেষ গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ক্ষতিকর অ্যামোনিয়া গ্যাস নির্গত হয়ে খানেপুর এলাকার ১২টি পুকুরের মাছ মরে ভেসে উঠেছে। এ ছাড়া অ্যামোনিয়া গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে আশপাশের গাছপালা ও ফসলি জমির ক্ষতি হয়। ১৯৯৯ সালেও এ ধরনের গ্যাসে এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়। তখন কারখানা কর্তৃপক্ষ খানেপুর গ্রামের প্রায় ১০০ পরিবারের মধ্যে সাত লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়। কিন্তু স্থায়ী সমাধান করার কথা বললেও আজ পর্যন্ত তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। ফলে গ্রামবাসীর সমস্যা সমাধান হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে পলাশ ইউরিয়া সার কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ এন এম আবদুর রহিম বলেন, ‘আমাদের প্রকৌশলীরা অ্যামোনিয়া বর্জ্য (ক্ষার) ও সালফিউরিক এসিড বর্জ্য (ক্ষার) সংমিশ্রণ করে অ্যামোনিয়া সালফেট তৈরি করেছে, যা অ্যামোনিয়ার দূষণ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। দুটি সার কারখানার জায়গায় নতুন সার কারখানা নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তখন বর্জ্য ইটিপির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করায় এ সমস্যা পুরোপুরি কেটে যাবে।


মন্তব্য