kalerkantho


পুকুরে ডুবছে পরিবেশ

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



পুকুরে ডুবছে পরিবেশ

ময়মনসিংহ শহরের কালীবাড়ি রোডের (এস কে হাসপাতালের পেছনে) পাশে এক সময় পুকুর ছিল—তা এই শহরে নতুন আসা কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব না। যেটি ছিল মাছের আধার, বাসিন্দাদের গোসল, কাপড় ধোয়া, থালা-বাসন মাজার অন্যতম উৎসস্থল; এখন সেটি বালি-মাটির সমতল ভূমি।

শুধু এই পুকুরই না, শহরের অনেক পাড়া-মহল্লার পুকুরগুলো দিন দিন ভরাট হয়ে কোথাও মাটি, কোথাও ময়লার ‘পাহাড়’ হয়েছে। ভরাটের পর অনেক পুকুরের জায়গায় গড়ে উঠেছে পাকা ভবন, দোকানপাট। এক সময়ের ‘পুকুরের শহর’ বলে খ্যাত ময়মনসিংহে এখন হাতে গোনা পাঁচ-ছয়টি বড় পুকুর আছে। এভাবে একের পর এক পুকুর ভরাট হওয়ায় ময়মনসিংহ শহরের পরিবেশ, প্রতিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা।

ময়মনসিংহ শহরের পুরনো বাসিন্দাদের কাছ থেকে জানা গেছে, দেশের অন্যতম পুরনো শহর ময়মনসিংহের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অফিস-আদালত প্রাঙ্গণের প্রায় সবটাতেই এক সময় পুকুর ছিল। সে হিসাবে শহরজুড়েই পুকুর ছিল। যেমন-আমলাপাড়া পুকুর, গোলপুকুর পাড়, হাজিবাড়ি পুকুর, বিদ্যাময়ী স্কুলের পেছনের পুকুর, নওমহল প্রাইমারি স্কুলের পুকুর, বাসাবাড়ি পুকুর, পচাপুকুর, পণ্ডিতবাড়ি পুকুর, কাচারি পুকুর, সি কে ঘোষ রোড প্রেস ক্লাবসংলগ্ন পুকুর, সেহড়া পুকুর, সুতিয়াখালী লজ পুকুর প্রভৃতি। কিন্তু দিন দিন অনেক পুকুরই বৈধ মালিক কিংবা অবৈধ দখলদাররা ভরাট করে ফেলেছে।

পরিবেশবিদরা অভিযোগ করেন, কোনো কোনো পুকুরের মালিকানা সরকারের হলেও সেগুলো রক্ষা করতে স্থানীয় প্রশাসনের বিশেষ করে ভূমি অফিসের ভূমিকা নির্বিকার।

এ ক্ষেত্রে অন্যতম উদাহরণ শহরের আমলাপাড়া পুকুর। সরকারি এ পুকুরটি ভরাট হতে হতে এখন এর বুকে ছোট আকারের ‘পাহাড়’। লিজের নাম করে এটি নিয়ে চলছে বহুরূপী নাটক।

আবার এলাকাবাসীর বাদ-প্রতিবাদও রক্ষা করতে পারেনি শহরের কালীবাড়ি রোডের (এস কে হাসপাতালের পেছনে) পুকুরটি। এ ছাড়া পুকুর পাড়ে চায়ের দোকান বসানোয় দিন দিন আকারে ছোট হচ্ছে আদালত পাড়াসংলগ্ন পুকুরটিও। বিদ্যাময়ী স্কুলের পেছনের পুকুরটি এখন পুরোপুরি আবাসিক এলাকা। কারো বোঝারও উপায় নেই ২৫ বছর আগে এখানে একটি পুকুর ছিল। কয়েক বছরে প্রশাসনের নাকের ডগায় শহরের বেসরকারি ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের সামনের কাচারি পুকুরটির প্রায় অর্ধেক ভরাট হয়েছে। নওমহল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের পুকুরটিও দিন দিন মাটি ও ময়লা ফেলে ভরাট করা হচ্ছে। প্রেস ক্লাবসংলগ্ন গলির ভেতরেও ছিল এক সময় বড় পুকুর। একটি চক্রের কারসাজিতে এখন সেটিও ভরাট।

শহরের একাধিক বাসিন্দা বলেন, পুকুরগুলোর মালিকানা নিয়ে অস্পষ্টতার সুযোগে অনেক প্রভাবশালী মহল ধাপে ধাপে পুকুরগুলো ভরাট করে চলেছে। অনেক পুকুর নিয়ে মামলা চালানো বিষয়েও ভূমি অফিসের ভূমিকা রহস্যময়। সব মিলিয়ে দিন দিন উধাও হচ্ছে শহরের পাড়া-মহল্লার পুকুরগুলো। পুকুর ভরাট বন্ধে সম্প্রতি আন্দোলন শুরু করেছে ‘পরিবেশ রক্ষা ও উন্নয়ন আন্দোলন’ নামের একটি সংগঠন। সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ শাহাব উদ্দিন বলেন, শহরের পুকুরগুলো দিন দিন ভরাট হচ্ছে। এটা পরিবেশের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এ জন্যই তাঁরা আন্দোলনে নেমেছেন।

পুকুরের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আসলাম আলী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুকুরের সংখ্যা কমে গেলে সেখানে বায়ুদূষণ হয়। শীতল বাতাস কমে যায়। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া প্রতিটি পুকুরের নিজস্ব ইকো সিস্টেম রয়েছে; যেখানে থাকে বিভিন্ন প্রজাতির আগাছা, মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণী; যা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ’ 

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (রাজস্ব) এ কে এম গালিভ খান বলেন, সরকারি পুকুরগুলোর তালিকা তিনি সংগ্রহ করছেন। পুকুরগুলো রক্ষায় যথাযথ উদ্যোগও তাঁরা নেবেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ময়মনসিংহের উপপরিচালক নুর আলম বলেন, পরিবেশ আইনে পুকুর, জলাধার বা খাল-বিল, নদীনালা ভরাট করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা ১০ বছরের কারাদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান আছে। তিনি বলেন, শহরের পুকুরগুলো সম্পর্কে তাঁরা তথ্য সংগ্রহ করছেন। এ ছাড়া কাচারি পুকুরটি ভরাটের বিষয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। স্কুল কর্তৃপক্ষ পুকুরটি আর ভরাট করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

ময়মনসিংহের পরিবেশবাদী সংগঠন প্রেরণার সভাপতি ফরহাদ হাসান খান বলেন, ‘শহরের পুকুরগুলো নিয়ে এখনই আমাদের ভাবতে হবে। নইলে কয়েক বছর পর আর কোনো পুকুরই এ শহরে দেখা যাবে না। ’


মন্তব্য