kalerkantho


আসল ডাকাতের কারসাজি জেলে ধুঁকছে নির্দোষ চাষি!

কুদ্দুস বিশ্বাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)   

১৫ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



আসল ডাকাতের কারসাজি জেলে ধুঁকছে নির্দোষ চাষি!

চাষি আব্দুল লতিফ

টাঙ্গাইলের বাসাইল উপজেলায় বাড়ি ডাকাতি মামলার আসল ডাকাত শাহীন মিয়া (৩৫) দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে ওই মামলায় জেলে বসে বন্দি জীবনের বিস্বাদ নিচ্ছেন নির্দোষ চাষি আব্দুল লতিফ (৩২)। পুলিশের হাতে ধরা পড়ার পর আসল ডাকাত শত্রুতা করে তারই সৎ ভগ্নিপতি (বোনজামাই) ওই নিরপরাধ চাষির নাম-ঠিকানা ব্যবহার করে। প্রকৃত আসামি শাহীন মিয়া ওই মামলায় প্রায় ১০ মাস জেল খাটার পর জামিনে বের হয়ে আদালতে হাজিরা দেওয়া বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় আদালত ওই আসামির নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করলে পুলিশ ওই ভুয়া নাম-ঠিকানার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠায়। কুড়িগ্রামের রাজীবপুরে ঘটেছে এ ঘটনা।

রাজীবপুরের জালচিরা পাড়া গ্রামের বাহার উদ্দিনের ছেলে চাষি আব্দুল লতিফ। ক্ষেতে হালচাষসহ মহিষের গাড়ি চালান তিনি। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে হঠাৎ পুলিশ তাঁর বাড়িতে এসে ধরে নিয়ে যায় লতিফকে। পরে তাঁকে কুড়িগ্রাম জেলহাজতে পাঠানো হয়। নিরপরাধ আব্দুল লতিফ মিথ্যা আসামি হয়ে ১৭ দিন ধরে কুড়িগ্রাম জেলে বন্দি।

তাঁর স্বজনরা জানায়, জেলে বসে শুধু কাঁদছেন তিনি। খাওয়াদাওয়াও ঠিকমতো করেছেন না।

অভিযোগ পাওয়া গেছে, রৌমারীর ইজলামারী গ্রামের বাসিন্দা চিহ্নিত ডাকাত মফেল উদ্দিনের দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান শাহীন মিয়াও ডাকাতির সঙ্গে জড়িত। বাবা-ছেলের নামে রৌমারী থানাসহ বিভিন্ন থানায় ডজনখানেক চুরি ডাকাতির মামলা রয়েছে। রৌমারীর সবাই মফেল ডাকাতকে এক নামে চেনে। একাধিকবার পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারসহ জেলও খেটেছেন তিনি। এই মফেল ডাকাতের প্রথম স্ত্রীর ঘরের কন্যা মাকসুদা খাতুনকে বিয়ে দেওয়া হয় রাজীবপুরের জালচিরা পাড়া গ্রামের আব্দুল লতিফের সঙ্গে।

জানা গেছে, মফেল উদ্দিনের দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান শাহীন মিয়া টাঙ্গাইলের বাসাইলে ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। এর পর থেকে প্রায় ১০ মাস টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে জেলও খাটেন তিনি। এ সময় তিনি পুলিশের কাছে নিজের মিথ্যা পরিচয় দিয়ে শত্রুতা করে তার ভগ্নিপতি আব্দুল লতিফের পরিচয় দেন। আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে তিনি আর হাজিরা দেননি। ফলে তার নামে আদালত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। ওই গ্রেপ্তারি পরোয়ানাভুক্ত আসামি হিসেবে নির্দোষ চাষি আব্দুল লতিফকে গ্রেপ্তার করে জেলহাজতে পাঠায় রাজীবপুর থানা পুলিশ।

নির্দোষ আব্দুল লতিফের বাবা বাহার উদ্দিন বলেন, ‘আমার ছেলে ক্ষেতে-খামারে কাজ করে। মহিষের গাড়ি চালায়। সে কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত নয়। চক্রান্ত করে মিথ্যা নাম-ঠিকানা ব্যবহার করা হয়েছে। তার ঘরে অবুঝ দুই শিশুসন্তান রয়েছে। যারা বাবার জন্য কান্নাকাটি করছে। ’ আব্দুল লতিফের স্ত্রী মাকসুদা খাতুন বলেন, ‘আমি শুনেছি আমার ভাই (আরেক মায়ের) শাহীন মিয়া টাঙ্গাইলে ডাকাতি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে জেল খেটেছে। এর বাইরে কিছু জানি না। তবে এটুকু বলব, আমার স্বামী কোনো অপকর্মের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে না। সে নিরপরাধ। তাকে অন্যায়ভাবে ফাঁসানো হয়েছে। ’

রাজীবপুরের জালচিরা পাড়া গ্রামের বাসিন্দা সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আকবর হোসেন হিরো বলেন, ‘যাকে পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে তার মতো নিরীহ মানুষ আমার এলাকায় নাই। আমি জানতে পেরেছি তাদের আত্মীয় কারসাজি করে এ ঘটনা ঘটিয়েছে। ডাকাতি করবে একজন আর জেল খাটবে অন্যজন তা তো হতে পারে না। ’

রাজীবপুর থানার ওসি পৃথীশ কুমার সরকার জানান, ‘আমরা তো আদালতের আদেশ পালন করেছি। আদালত থেকে যে ঠিকানার আসামির নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে আমরা সেই নাম-ঠিকানার ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছি। আর যে মামলার আসামি সেটা টাঙ্গাইলের বাসাইল থানার। আমরা আর বেশি কিছু বলতে পারছি না। ’

রৌমারী থানার ওসি এ বি এম সাজেদুল ইসলাম বলেন, ‘ইজলামারী গ্রামের মফেল উদ্দিন ওরফে মফেল ডাকাতের নামে চুরি ডাকাতির একাধিক মামলা রয়েছে। তার ছেলে শাহীন মিয়া কয়েক বছর আগে আমার এক এএসআইকে কুপিয়েছিল। এ মামলার প্রধান আসামি সে। ’


মন্তব্য