kalerkantho


চাঁদার গ্যাঁড়াকলে আম এবারও ভুগবে চাষিরা

আহসান হাবিব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ (আঞ্চলিক)   

১৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



চাঁদার গ্যাঁড়াকলে আম এবারও ভুগবে চাষিরা

গাছে আমের মুকুল হাসলেও এবারও চাষিদের হাসি কেড়ে নিতে পারে সুবিধাভোগী স্থানীয় আড়তদাররা। ছবিটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জের একটি আমবাগান থেকে তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রতি আম মৌসুমে চাষিদের ‘চাঁদা’ দিতে হয় উৎপাদিত আমের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। যার আর্থিক মূল্য প্রায় তিন শ কোটি টাকা।

এর সুবিধাভোগী মূলত স্থানীয় আড়তদাররা। দিনের পর দিন চলা আরো নানা অনিয়ম বন্ধে আম চাষিরা এবার প্রশাসনের সহায়তা কামনা করেছে।

শিবগঞ্জের দৌলতপুর এলাকার আম চাষি ইব্রাহিম বলেন, জেলায় দেড় হাজার আড়তদার ও ব্যাপারীর কাছে লক্ষাধিক আম চাষি, ব্যবসায়ী ও বাগান মালিক জিম্মি হয়ে পড়েছে। আম বাজারে আনার পর থেকেই পদে পদে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রথমেই এক ডালি আম ওজন করতে গিয়ে আড়তদারকে এক কেজি দিতে হয়। এরপর প্রতি মণে ছয়-সাত কেজি বেশি দিতে হয়। আর অনেক আড়তদারের কাঠের কাঁটার পাল্লায় এক ধরনের ভেল্কি রয়েছে। প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আম তোলা হলেও আমের পাল্লা নিচে নামে না। এভাবে কৌশলে মণে অন্তত পাঁচ কেজি আম বেশি নেওয়া হয়।

এরপর ওজন দেওয়ার সময় বাছাই করতে গিয়ে বাদ পড়ে অন্তত ১৫ ভাগ আম। যা সামান্য দামে ওই আড়তদারকে দিতে বাধ্য করা হয়।

আড়তদারদের এমন কর্মকাণ্ড নির্বিবাদে চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে রয়েছে তাদের সমিতি। জেলায় এমন সমিতির সংখ্যা কানসাটে পাঁচ-ছয়টি, আম ফাউন্ডেশন ভোলাহাটসহ অন্তত ২০টি সমিতি রয়েছে। এসব সমিতির মূল লক্ষ্য আম বিক্রেতাদের কাছ থেকে ৪০ কেজির স্থলে ৪৬ থেকে ৫১ কেজি (অনেক আড়তদারের চুরির পাঁচ কেজি বাদে) আদায় করে দেওয়া।

আড়তে আম ওজন পর্ব শেষ হলে একটি মেমো স্লিপ চাষির হাতে ধরিয়ে দেন আড়তদার। কিন্তু আড়তদারদের কাছ থেকে সেই টাকা পেতে চাষিদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। এমনকি অনেক সময় পাওনার বড় একটি অংশ অনাদায়ীই থেকে যায়। আমের আড়তদারি করে পথে বসার রেকর্ড না থাকলেও অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন অনেকেই। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে বেশির ভাগ এলাকায়ই ৪৬ কেজিতে এক মণ ধরা হলেও কোনো কোনো এলাকায় ৫০-৫১ কেজিতে মণ ধরা হয়। আড়তদার শফিকুল ইসলাম এটিকে প্রথা বলে দাবি করেন। তবে হাত পাল্লায় আম বিক্রি করতে গিয়ে শিবগঞ্জে সাড়ে ৪২ কেজিতে এক মণ ধরা হয় বলে আম চাষিরা জানান। গতবার শিবগঞ্জ থেকে বিদেশে পাঠানোর জন্য ৬৭ মেট্রিক টন আম দেওয়া হয় ৪০ কেজিতে এক মণ হিসেবে। এমন তথ্য জানান আম রপ্তানিকারক আক্তার হোসেন ও আবদুল কাউয়ুম।

বিকল্প না থাকায় আড়তে আম দিতে গিয়ে এক আম মৌসুমেই কৃষককে চাঁদা দিতে হয় মোট উৎপাদিত আমের এক-পঞ্চমাংশ। তাতে এক মৌসুমেই চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় আড়াই থেকে তিন শ কোটি টাকা। তবে এমন অলিখিত নিয়ম বছরের পর বছর চালু থাকলেও স্থানীয় প্রশাসন এসব বন্ধে কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না। আম চাষিদের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে দাবি, এবার অন্তত যেন এসব অনিয়ম থেকে বেরিয়ে আসা যায়। তা ছাড়া প্রশাসনের প্রতি আম চাষিদের আরো কিছু দাবি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, কারচুপি ঠেকাতে ডিজিটাল মেশিনে ওজন চালু করা, আড়তে ওজন দেওয়ার পরপরই মূল্য পরিশোধ নিশ্চিত করা, খাজনার পরিমাণ কমানো, উন্নত বাজার নির্মাণের পাশাপাশি যাতায়াত ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার উন্নয়ন।

শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম আমিনুজ্জামান জানান, শিবগঞ্জে প্রায় ১৪ হাজার হেক্টর জমিতে ১০ লক্ষাধিক আমগাছ রয়েছে। এ ছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরে তিন হাজার ৭০০ হেক্টর, ভোলাহাটে দুই হাজার হেক্টর, নাচোলে এক হাজার ৬৫০ হেক্টর ও গোমস্তাপুরে দুই হাজার ৮৫৫ হেক্টরসহ জেলায় ২৬ হাজার ১৫০ হেক্টর জমিতে আম বাগানে ২২ লাখ আমগাছে প্রায় আড়াই শ জাতের আড়াই লাখ মেট্রিক টন আম উৎপাদন হয়, যা বিক্রির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে আড়াই হাজার কোটি টাকা। আম বাগান মালিক ও ব্যবসায়ীরা জানান, আম মৌসুমে শিবগঞ্জসহ জেলায় পাঁচ লক্ষাধিক মানুষ আমসংক্রান্ত যজ্ঞে জড়িয়ে পড়ে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হুদা বলেন, এত দিন ধরে চলে এলেও সামনের দিনে এ অনিয়মের পরিবর্তন হওয়া দরকার। নইলে কৃষক তার পণ্য উৎপাদনে নিরুৎসাহী হয়ে পড়বে। এ ব্যাপারে আম মৌসুমে প্রশাসনের সহায়তায় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মনিটর করা হবে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান জানান, এক মাস থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসম্মত ও রপ্তানিযোগ্য বিষমুক্ত আম উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, সংরক্ষণ ও সংগ্রহ এসব নিয়ে চাষি, ব্যবসায়ী, আড়তদার ও বাগান মালিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হচ্ছে। ১৮ মার্চ শিবগঞ্জে এ বিষয়ে সভা হবে। আম কার্বাইড ও ফরমালিনমুক্ত রাখার পাশাপাশি কৃষক যাতে তার উৎপাদিত আম সঠিক মাপে বিক্রি করতে পারে, তা নিশ্চিত করা হবে। এর ব্যত্যয় হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


মন্তব্য