kalerkantho


গণপরিবহন ব্যবস্থাহীন বিভাগীয় শহর

নিয়ামুল কবীর সজল, ময়মনসিংহ   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গণপরিবহন ব্যবস্থাহীন বিভাগীয় শহর

২০০ বছরের বেশি পুরনো শহর ময়মনসিংহ। সম্প্রতি এটি বিভাগীয় শহরের মর্যাদা পেয়েছে।

তাই দিন দিন বাড়ছে শহরবাসীর সংখ্যা। কিন্তু সুযোগ-সুবিধাকে পেছনে ফেলে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ভোগান্তি। রাস্তায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট, না থাকার মতো ফুটপাত—তাতে আবার হাঁটার জো নেই, দুর্ঘটনা, চুরি-ছিনতাই প্রভৃতি নিত্যসঙ্গী করেই বাসা থেকে বের হতে হয় এই শহরবাসীকে।

শহরে চলাচলের দুরবস্থা নিয়ে তাই বেসরকারি চাকরিজীবী মোকসেদুল ইসলাম জুয়েলের ক্ষোভ—‘একটা বিভাগীয় শহর, অথচ এ শহরে শান্তিতে হাঁটাও যায় না। ’

এই ভোগান্তি মেনে নিয়েই জুয়েলের মতো অনেককেই বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে এই শহরে। চলাফেলার বিড়ম্বনাই তাদের কাছে এখন প্রধান নাগরিক দুর্ভোগ। এর অন্যতম কারণ এই শহরে এখন পর্যন্ত কোনো আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা না থাকা। এমনকি শহরের কোনো সড়কেই নেই পথচারী পারাপারের জেব্রা ক্রসিং।

ভুক্তভোগীরা জানায়, ট্রাফিক আইন না মেনে এ শহরে যানবাহন চালকরা ইচ্ছামতো যান চালায়।

যানজট কখনো কখনো অসহনীয় রূপ নেয়। ফুটপাতে যার যেমন ইচ্ছা, সেভাবেই চলছে দখল-বেদখল। ইচ্ছা মতো বসছে দোকানপাট। পথচারীরা হাঁটার জায়গাও পায় না। সব মিলিয়ে ময়মনসিংহ শহরে এখন ঘর থেকে বের হওয়া মানেই বিড়ম্বনা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ময়মনসিংহ শহরবাসীর বিড়ম্বনার জায়গাগুলো হলো ব্রহ্মপুত্র নদের সেতু ছোঁয়া পাটগুদাম বাসস্ট্যান্ড, বাসস্ট্যান্ড ছোঁয়া পাটগুদাম ব্রিজ মোড়, গাঙিনার পাড় মোড়, স্টেশন রোড মোড়, নতুন বাজার মোড়, চরপাড়া মোড়, জিলা স্কুল মোড়, নওমহল গরুর খোঁয়াড় মোড়, সি কে ঘোষ রোড, দুর্গাবাড়ী রোড ও মোড়, ছোট বাজার, বড় বাজার ইত্যাদি। এসব জায়গায় এসে যানবাহনগুলো স্বাভাবিক গতি হারায়। যানজটে আটকে থাকতে হয় দীর্ঘ সময়। অথচ শহরবাসীর বড় অংশকেই এ মোড়গুলো হয়ে যাতায়াত করতে হয়। বিশেষ করে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী, ট্রেনে চড়তে স্টেশনগামী যাত্রী এবং অফিস-আদালত, হাসপাতাল ও ক্লিনিকগামী লোকজনকে দুর্ভোগে পড়তে হয় এসব স্থানের যানজটের কারণে।

ব্রহ্মপুত্র নদের সেতুর যানজট নিয়ে ফুলপুরের স্কুল শিক্ষক এনামুল হক বলেন, ‘ব্রিজের যানজটের কথা মনে হলেই ময়মনসিংহে আসতে মন চায় না। প্রতিদিন এ যন্ত্রণা আর ভালো লাগে না। ’

শহরের স্থায়ী যন্ত্রণার সড়ক হলো গাঙিনার পাড়-স্টেশন রোড। সারাক্ষণ এ সড়কে যানজট থাকে। পাঁচ মিনিটের এ পথটুকু পার হতে সময় লাগে আধঘণ্টা। কখনো কখনো আরো বেশি।

শহরের আরেক গুরুত্বপূর্ণ সি কে ঘোষ রোডেও যানজট নিয়মিত। গাঙিনার পাড় মোড়ের যানজটের কারণে এ মোড় দিয়ে যাতায়াতকারী সবাইকে ১০-১৫ মিনিট সময় বেশি ব্যয় করতে হয়।

সম্প্রতি যানজটের নতুন স্থান হলো জিলা স্কুল রোড মোড়। এ মোড়ের যানজটের কারণে জিলা স্কুলগামী শিক্ষার্থীসহ আশপাশের শিক্ষার্থীরা বিড়ম্বনায় পড়ে।

শহরের পণ্ডিতপাড়া এলাকার বাসিন্দা শরীফুজ্জামান বলেন, ‘ছেলেকে নিয়ে ক্যান্টনমেন্ট কলেজে যাই। জিলা স্কুল মোড়ের যানজটে প্রায়ই দেরি হয়ে যায়। সকাল সাড়ে ৭টা থেকে এ জায়গায় যানজট শুরু হয়। আর এই জট থাকে প্রায় সারা দিন। ’

ময়মনসিংহ শহরে চলাফেরায় অশান্তির আরেক কারণ হলো পথে বের হলেই ছোটখাটো দুর্ঘটনার আশঙ্কা। ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজি বাইকসহ উঠতি বয়সের ছেলেদের বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালানোর কারণে অহরহ দুর্ঘটনা ঘটছে। অনেকে এখন রিকশায় উঠতেও ভয় পায়।

যানজট বা দুর্ঘটনা এড়াতে হাঁটবেন, সেটাও কঠিন। কারণ সব ফুটপাত বেদখল। দোকান মালিকরা তাঁদের মালামাল এনে রেখে দেন ফুটপাতে। একই কাজ করে আবার সড়কে বসা হকাররাও। ছোট শিশু, বয়স্ক মানুষ নিয়ে অথবা ব্যাগ হাতে ফুটপাত দিয়ে চলাই দায়। শহরের প্রিমিয়ার আইডিয়াল হাই স্কুলের সিনিয়র শিক্ষক গোলাম হক বলেন, গাঙিনার পাড় স্টেশন রোড সড়কের দুই পাশের তিন-চার ফুট করে বেদখল। তিনি চেষ্টা করেন এ সড়ক এড়িয়ে অন্য পথ দিয়ে চলাচল করতে। ভুক্তভোগীরা জানায়, প্রশাসন কখনো কখনো ফুটপাত অবৈধ দখল মুক্ত করলেও দু-তিন দিন পর ফুটপাত আবার বেদখল হয়ে আগের অবস্থায় ফিরে যায়।

তা ছাড়া সম্প্রতি সড়কে রিকশা-ভ্যান রেখে ফলমূল বিক্রি করার ঘটনা পথচারী ও যানচালকদের নতুন যন্ত্রণায় ফেলছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ দুর্গাবাড়ী রোডের দুই পাশেই এখন সারি সারি ফলের ভ্যানের দোকান। এ ছাড়া সানকীপাড়া শেষ মোড়, চরপাড়া সড়ক, সি কে ঘোষ রোড, মদনবাবু রোড, ওল্ড পুলিশ ক্লাব রোড, ট্রাংকপট্টিসহ বিভিন্ন সড়কে এ চিত্র দেখা গেছে।  

ময়মনসিংহ শহরবাসীর আরেক যন্ত্রণা হলো সড়ক বা সড়কের মোড়গুলো পার হওয়া। সব কটি মোড়ই মানুষকে বলতে গেলে দৌড়ে পার হতে হয়। বিভাগীয় শহর হলেও এর কোনো সড়কেই পথচারী পারাপারের স্থান জেব্রা ক্রসিং নেই।

ময়মনসিংহের বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক ডা. কে আর ইসলাম বলেন, গাঙিনার পাড় মোড়টি পার হতে গিয়ে যে ভোগান্তি হয় তা বলার মতো নয়। তিনি বহুবার এ বিষয়ে প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। কিন্তু কোনো সমাধান হয়নি।

ময়মনসিংহ পৌর মেয়র ইকরামুল হক টিটু বলেন, শহর বেড়েছে, লোকজন বেড়েছে। সেই হারে সড়ক বাড়েনি। তাই সমস্যা বেড়েই চলেছে। তবে বিদ্যামান সড়ক ও মোড়গুলো সংস্কার ও প্রশস্ত করে এবং যানবাহনগুলোকে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে এনে শহরবাসীকে স্বস্তি দিতে তাঁদের চেষ্টা চলছে।


মন্তব্য