kalerkantho


নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগর

আগ্রাসী মিয়ানমার বাহিনী

জাবেদ ইকবাল চৌধুরী, টেকনাফ (কক্সবাজার)   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



নাফ নদ ও বঙ্গোপসাগরে গত পাঁচ মাসে মাছ ধরতে যাওয়া ৪০ বাংলাদেশিকে অপহরণ করেছে মিয়ানমারের নৌবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি)। কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার এই জেলেদের মধ্যে ২০ জন মুক্তিপণ দিয়ে ফিরেছেন। বাকি পরিবারগুলো দিন পার করছে আতঙ্কে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত ৯ মার্চ দুপুরে সেন্ট মার্টিনসের কাছাকাছি বঙ্গোপসাগরে আট জেলে, ২ নভেম্বর নাফ নদে দুই জেলে, ৯ নভেম্বর বঙ্গোপসাগরে ছয় জেলে ও নাফ নদ থেকে তিন জেলেকে ধরে নিয়ে যায় বিজিপি ও নৌবাহিনী। এঁদের কেউ ফিরে আসতে পারেননি।

অপহৃত জেলেরা হচ্ছেন, উত্তর চৌধুরীপাড়ার কবির আহমদের ছেলে হামিদ হোসেন (৪০), মো. ইসলামের ছেলে মো. ইসমাঈল (৩২), দক্ষিণ জালিয়াপাড়ার সিকান্দরের ছেলে নুর হোসেন (৪৫), উত্তর জালিয়াপাড়ার আবদুল মালেকের ছেলে আব্দুর রহমান (৩২), চৌধুরীপাড়ার সৈয়দ হোসেনের ছেলে মো. ইউনুছ (২৫), আবদুল আমিনের ছেলে মো. খালেক (১৮), সেন্ট মার্টিনস কোনারপাড়ার শাইর আহমদের ছেলে আবদুল হামিদ (৩৫), অছিউর রহমানের ছেলে ফজল আহমদ (৪২), অলি চানের ছেলে হাসিম (৪৫), দক্ষিণপাড়ার লাল মিয়ার ছেলে সাদ্দাম (২৫), মোহাম্মদ ইসমাঈলের ছেলে মো. হোছাইন (২৫) ও নূর মোহাম্মদের ছেলে রশিদ উল্লাহ (৪৩)। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার দুপুরে অপহৃতরা হচ্ছেন টেকনাফ শাহপরীর দ্বীপ বাজারপাড়ার মৃত হাবিবুর রহমানের ছেলে আব্দুর রশিদ (৪০), জালিয়াপাড়ার মৃত হাসানের ছেলে সৈয়দ করিম (৪০), কোনারপাড়ার নূরুল আমিনের ছেলে নূর হাসান (২৮), ক্যাম্পপাড়ার আব্বাসের ছেলে মোহাম্মদ উল্লাহ (৫৫), মাঝারপাড়ার ফজলুলের ছেলে জামাল হোসেন (৩৭), মিস্ত্রিপাড়ার মো. কালুর ছেলে দিল মোহাম্মদ (৩৬), ডাঙ্গরপাড়ার জাফরের ছেলে সাদেক (৩৫) ও ফজল আহাম্মদের ছেলে জাকের (৫৫)।

টেকনাফের ট্রলার মালিক আবুল হোসেন জানান, গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সেন্ট মার্টিনসের অদূরে সাগরে তাঁর ট্রলার নিয়ে মাছ ধরছিলেন জেলেরা। হঠাৎ করে মিয়ানমার নৌবাহিনীর একটি জাহাজ এসে ধাওয়া করে ট্রলারটিকে ধাক্কা দেয়। ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে আট জেলেকে অপহরণ করা হয়। এ খবর পেয়ে স্থানীয় প্রশাসনকে তিনি বিষয়টি জানান।

অন্য একটি ট্রলার নিয়ে লোকজনসহ সাগরে তল্লাশি চালানো হয়। পরে ডুবে যাওয়া ট্রলারটি পাওয়া যায়।

এদিকে একটি সূত্র দাবি করেছে, গত ১২ ডিসেম্বর জালিয়াপাড়াসংলগ্ন নাফ নদ থেকে ছয় বাংলাদেশি জেলেকে ধরে নিয়ে গেছে বিজিপি। বিকেলে দুই নৌকাসহ তাঁদের ধরে নিয়ে যায়। এঁদের মধ্যে দেড় লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়ে চারজনকে ফেরত আনা হয়েছে। মিয়ানমারের মংডুতে আটক রয়েছে আরো দুই জেলে। তাঁরা হচ্ছেন চৌধুরীপাড়ার আক্তার ফারুক (১৬) ও সাদেক হোসেন (১৮)।

টাকা যায় বিকাশে অথবা হাতে

টেকনাফ সদরের বড়ইতলী গ্রামের দিল মোহাম্মদ (২২) ও মতিউর রহমান (২৫) জানান, গত ২৯ নভেম্বর রাতে একটি ডিঙি নৌকা নিয়ে দুজন জাল পাতেন নাফ নদে। বিজিপি একটি স্পিড বোট নিয়ে এসে তাঁদের ধরে নিয়ে যায় এবং মারধর করে। একজনকে হাত-পা বেঁধে সাগরে ফেলে দেয়, আবার তোলে। স্বজনদের ফোন দিয়ে এক লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে। শেষে ৪০ হাজার টাকায় রফা হয়। স্বজনরা টাকা জোগাড় করে বড়ইতলীর সৈয়দ নুরের হাতে দেয়। নুর নৌকাযোগে ওপারে টাকা নিয়ে বিজিপি সদস্যদের হাতে দিয়ে দুই জেলেকে গ্রামে নিয়ে আসে।

টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘দালাল চক্রের সদস্যরা মোবাইল ব্যাংকিং বা সরাসরি নগদ টাকা পৌঁছে দিয়ে মুক্তিপণ আদায়ে সহযোগিতা করছে মিয়ানমার বাহিনীকে। সীমান্তের শতাধিক পয়েন্টে রয়েছে দালাল চক্রের নিজস্ব নেটওয়ার্ক। এ শক্তিশালী নেটওয়ার্ক ভাঙতে হবে। তবেই জেলেদের দুর্ভোগ কমতে পারে। ’

গুলি করে হত্যা

টেকনাফ সদরের মৌলভীপাড়ার হাকিম আলী (৫৫) জানান, তিনিসহ তিন জেলে গত ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৬টায় নাফ নদের মৌলভীপাড়া ও নাজিরপাড়া বরাবর বিহিঙ্গি জাল পাতেন। সকাল সাড়ে ৮টায় বিজিপি স্পিড বোট নিয়ে কাছাকাছি এসে হঠাৎ গুলি চালায়। এতে চৌধুরীপাড়ার কবির আহমদের ছেলে নুরুল আমিন (২৬) ঘটনাস্থলে মারা যান। এ সময় আহত হন আরেক জেলে মোর্তজা (২৪)।

পরিবারে উৎকণ্ঠা

চৌধুরীপাড়ার জেলে ইসমাঈলের স্ত্রী আমেনা জানান, গত ২ নভেম্বর তাঁর স্বামীকে অপহরণ করেছে বিজিপি। ছোট তিনটি সন্তান নিয়ে অসহায় অবস্থার মধ্যে তাঁর দিন কাটছে। মাছ কুড়িয়ে ও পাড়া-প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ধারদেনা করে কোনো রকমে সংসার চালাচ্ছেন।

সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য

টেকনাফ জেলে ও কাঁকড়া সমন্বয় কমিটির সভাপতি সৈয়দ আলম বলেন, ‘সম্প্রতি বাংলাদেশের জলসীমা থেকে আন্তর্জাতিক আইনের তোয়াক্কা না করে জেলেদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে বিজিপি। তাদের ওপর অমানবিক অত্যাচার করা হচ্ছে। এদের মধ্যে যারা মুক্তিপণ দিতে পারে, তাদের পিটিয়ে আহত করে ছেড়ে দেয়। যারা টাকা দিতে পারে না, তারা ছাড়া পায় না। ’

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সফিউল আলম বলেন, ‘নাফ নদে মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীর উৎপাত নিয়ে উপজেলা আইন-শৃঙ্খলাবিষয়ক মাসিক সভায় আলোচনা হয়েছে। বিজিবির মাধ্যমে পতাকা বৈঠক ডেকে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের নজরে আনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ’

বিজিবি ২ টেকনাফ ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল আবু জার আল জাহিদ বলেন, ‘সম্প্রতি সাগর থেকে জেলে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি শোনার পর দোভাষী দিয়ে বিজিপির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তারা আট জেলেকে ধরে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছে। ’


মন্তব্য