kalerkantho


বাবুলের প্রেমে শঙ্খচিল

জসীম পারভেজ, কলাপাড়া (পটুয়াখালী)   

১১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



বাবুলের প্রেমে শঙ্খচিল

আহত শঙ্খচিলকে উদ্ধার করে পটুয়াখালীর কলাপাড়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রে নিয়ে আসেন বাবুল ফকির (বাঁয়ে)। চিকিৎসা শেষে সুস্থ হওয়ার পর শঙ্খচিলটি উড়ে গেছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ম্যানগ্রোভ বনের উঁচু গাছ থেকে মাটিতে আছড়ে পড়েছিল একটি শঙ্খচিল। তাকে উদ্ধার করে পশু হাসপাতালে নিয়ে আসেন এক জেলে।

চিকিৎসা শেষে পাখিটি পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার আনিপাড়ার গুচ্ছগ্রামের বাড়িতে নিয়ে যান। তাঁর স্ত্রী-কন্যাদের যত্নে চিলটি সুস্থ হয়ে ওঠে। দুই সপ্তাহ পর চিলটি উড়ে যায়।

ঘটনা এখানে শেষ হয়ে যেতে পারত; কিন্তু হয়নি। মো. বাবুল ফকিরের (৪৫) মমতা ভোলেনি শঙ্খচিলটি। প্রতিদিন পাখিটি তাঁর বাড়ির গাছগাছালিতে উড়ে এসে বসে। কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করে। বাবুল বাড়ি থাকলে সেই ডাক শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন। এরপর চলে যায়।

পাখিটি অসুস্থ হয়ে পড়েছিল গত ১৫ ফেব্রুয়ারি। ১ মার্চ দিন বা রাতের কোনো একসময় উড়ে যায়। এর পর থেকে প্রতিদিন দুপুর বা সন্ধ্যায় বাবুলের বাড়ির গাছে বসে অথবা বাড়ির ওপর বরাবর আকাশে চক্কর দিয়ে চলে যায়।

গত শনিবার এ প্রতিবেদক যখন আনিপাড়া গুচ্ছগ্রামে পৌঁছান, তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে। সড়ক থেকে বাবুলের বাড়ি কিছুটা দূরে। শঙ্খচিলটি তখন বিলের দিকে যাচ্ছিল। গৃহকর্তা হাতের ইশারায় পাখিটি দেখালেন।

গুচ্ছগ্রামে বাবুলের বাড়িতে বিশাল আকৃতির একটি খোপ। বাড়ির চারপাশে দারিদ্র্যের চিহ্ন। তিনি জানান, আন্ধারমানিক নদে মাছ শিকার করেন। মাঝেমধ্যে গোলগাছের রস সংগ্রহ করে গুড় বিক্রি করেন। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি বাড়ির সামনে নদের তীরে কেওড়াবাগানে গোলগাছের রস সংগ্রহ করতে গিয়ে দেখেন, মৃতপ্রায় শঙ্খচিল কাদামাটিতে পড়ে আছে। পাখিটি এনে মাছের কলিজা ও পানি খাওয়ান। এরপর পাখিটির চিকিৎসার জন্য কলাপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রে নিয়ে যান। চিকিৎসক শঙ্খচিলকে ওষুধ খাওয়ানোর পর একটু সুস্থ হয়। পাখিটি চোখ মেলেই উড়তে চেয়ে মৃদু পাখা ঝাপটাতে শুরু করে। চিকিৎসা শেষে চিলটি বাড়ি নিয়ে আসেন। স্ত্রী-কন্যা সবার সার্বিক পরিচর্যায় পাখিটি দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠে। সুস্থ হয়ে উঠলেও দু-তিন দিন পর্যন্ত তাঁদের সঙ্গে ছিল। খোপের ভেতর রেখে দিয়েছিলেন। ছোট গাছে রেখে দিয়েছেন, তবু উড়ে যায়নি। দুই সপ্তাহ পর পাখিটি উড়ে যায় তার সঙ্গীর সন্ধানে। এরপর শুনতে পান, আরেকটি বড় আকারের শঙ্খচিল তাঁর বাড়ির পশ্চিম দিকের বিলে মরে পড়ে আছে। গিয়ে দেখেনও। তিনি বলেন, ‘মৃত শঙ্খচিলটিই বেঁচে যাওয়া চিলের সঙ্গী। সঙ্গীহারা চিলটি এখনো প্রতিদিন বাড়ির কাছাকাছি এসে ডাকতে থাকে আর আকাশে উড়তে থাকে। ’

বাবুলের বাবা মুনসুর আলী ফকির। স্ত্রী ফিরোজা বেগম, মেজ মেয়ে আয়শা আক্তার ও ছেলে জাকারিয়াকে নিয়ে তাঁর সংসার। গুচ্ছগ্রামের ভিটাই তাঁর আশ্রয়স্থল। অভাব-অনটন পিছু ছাড়ে না। অভাবের কারণে লেখাপাড়া করতে পারেননি। শিশুকালে অন্যের ট্রলারে জেলে শ্রমিকের কাজ করতেন। টাকা জমিয়ে ছোট্ট একটি ট্রলার ও জাল কিনে আন্ধারমানিক নদে মাছ শিকার শুরু করেন। মেয়েটি এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছেলেও মাছ ধরে।

বাবুল আরো জানান, কিশোর বয়স থেকে পাখির প্রতি তাঁর মমতা ছিল। দোয়েল পাখি আন্ধারমানিক নদ পাড়ি দিয়ে ওপার থেকে এপারে আসতে গেলে অসুস্থ হয়ে চরে বা পানিতে পড়ত। সেই পাখিকে সুস্থ-স্বাভাবিক করে উড়ে যেতে সহায়তা করতেন। ২০১৪ সালে কলাপাড়া শহরের আনোয়ার ফকিরের ট্রলারে গভীর সমুদ্রে মাছ শিকার করতে গিয়ে একটি পাখি উড়তে উড়তে দুর্বল হয়ে ট্রলারে পড়েছিল। সেই পাখিকে ভাত খাইয়ে মোটামুটি সুস্থ করেন। পাখিটি কবুতরের মতো। তবে ঠোঁট টিয়া পাখির চেয়ে বড়, লাল। পা দুটিও লাল। সোনালি রঙের পাখিটি জীবনে দ্বিতীয়বার অন্য কোথাও দেখেননি তিনি। সেই পাখি সুস্থ হওয়ার পর কুয়াকাটার গঙ্গামতিচরের জঙ্গলে ছেড়ে দিয়েছিলেন।

গত রবিবার বাবুল মোবাইল ফোনে জানান, একটি সোনালি রঙের অপরিচিত পাখিকে কাকে ঠুকরে আহত করেছিল। তিনি পাখিটিকে খাইয়ে সুস্থ করে খোপের ভেতর রেখেছেন। সবল হলে ছেড়ে দেবেন। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার তাঁর বাড়ির পাশে খেজুরগাছে ঘুঘু ডিম দিয়েছিল। বাসা থেকে গুচ্ছগ্রামের ছেলেরা ঘুঘু তাড়িয়ে দিয়ে ডিমগুলো আনতে যায়। এরপর ঘুঘু আর বাসায় আসেনি। তিনি ডিম দুটি এনে দেখেন ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধেছে। তাই ডিম দুটি তাঁর কবুতরের ডিমের সঙ্গে তা দিতে রেখে দিয়েছেন। বাচ্ছা ফুটলে নিজ হাতে বড় করে ছেড়ে দেবেন।

কলাপাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন কেন্দ্রের চিকিৎসক মো. বাবুল খান বলেন, ‘শঙ্খচিলটির রানিক্ষেত রোগ হয়েছিল। এ কারণে চিলটি চুন চুন পায়খানা করত এবং খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। চিলটি দুর্বল হয়ে মৃত্যুর মুখে পড়েছিল। হাসপাতালে আনার পর চিলটিকে নেমাইডভেট সালফানিলামাইড পাউডার পানির সঙ্গে গুলে খাইয়ে দিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর চিলটি কিছুটা সুস্থ হয়। একই সঙ্গে বাড়িতে বসে দুইবার সকাল-বিকেল খাওয়াতে বাবুল ফকিরকে নির্দশনা দিয়েছিলাম। এ অনুযায়ী সেবাযত্ন করায় চিলটি বেঁচে আছে, শুনে ভালো লাগছে। ’

বাবুলের প্রতিবেশী খলিল খান বলেন, ‘বাবুল ছোট বেলা থেকেই পাখির জীবন রক্ষায় কাজ করছেন। আমরাও এ কাজের জন্য তাঁকে সম্মান করি। ’

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. সাদিকুর রহমান বলেন, ‘বাবুল ফকির বিলুপ্ত প্রজাতির একটি শঙ্খচিলের জীবন রক্ষা করে মহৎ কাজ করেছেন। এ কাজের জন্য তাঁকে পুরস্কার দেওয়া উচিত। এর ফলে তাঁর মতো অন্যরা ভালো কাজের জন্য উৎসাহিত হবে। এমনকি এ ধরনের মানুষের সংখ্যা সমাজে বাড়তে থাকলে রক্ষা পাবে পশু-পাখি, পরিবেশ-প্রতিবেশ। ’


মন্তব্য