kalerkantho

দিলখোলা দিলরুবা

আয়শা সিদ্দিকা, মাদারীপুর   

৮ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



দিলখোলা দিলরুবা

একে তো গরিব, এর ওপর যদি অসুখ হয়; তবে তার আর উপায় থাকে না। এ অসহায় রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দেন ডা. দিলরুবা ফেরদৌস।

এটা তিনি করছেন ১৮ বছর ধরে। মাদারীপুর জেলা সদরসহ প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সপ্তাহে দুই দিন বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার গরিব রোগীরা জেলা শহরের শকুনী লেকপাড়ে চৌধুরী ক্লিনিকে ভিড় করে। এই নারী চিকিৎসকের ব্যবহার ও আন্তরিকতা তাদের মুগ্ধ করে। হাসিমুখে রোগীদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় নিয়ে শোনেন তাদের সমস্যার কথা। গরিব রোগীদের বিনা মূল্যে দেন চিকিৎসাপত্র। ওষুধ কেনার সামর্থ্য না থাকলে আর্থিক সহযোগিতা করেন। বিভিন্ন সময় দুস্থ মানুষদের নানাভাবে সহযোগিতা করেন।

মাদারীপুর সদর উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের হেলেনা বেগম বলেন, ‘আমার ১৮ বছর বয়সের ছেলে মাসুদ বেপারী শারীরিক প্রতিবন্ধী। সে হাঁটতে পারে না।

তাকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় আনা-নেওয়া খুব কষ্টকর ছিল। অনেকের কাছে গিয়েছি। কেউ একটা হুইল চেয়ার দেয়নি। কিন্তু ডাক্তার (দিলরুবা) আপা এই অসহায়ত্বের কথা শোনামাত্র আমার ছেলেকে একটি হুইল চেয়ার ও নগদ টাকা দিয়েছিলেন। এখনো তিনি আমাদের খোঁজখবর নেন। ’ ক্লিনিক সূত্রে জানা গেছে, দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ইংরেজি শিক্ষক মৃত কফিল উদ্দিন আহম্মেদের মেয়ে দিলরুবা। পাঁচ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। শ্বশুরবাড়ি যশোর শহরে। স্বামীও ছিলেন একজন চিকিৎসক। ২০১৪ সালে স্বামী ডা. এস এম আলীমুর রেজা  মারা যান। এক মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে সপ্তাহের দুই দিন থাকেন মাদারীপুর। বাকি পাঁচ দিন থাকেন ঢাকার গ্রিন রোডে। এমবিবিএস, এফসিপিএস, ডিজিও পাসসহ বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এমএস কোর্সের (অবশ অ্যান্ড গাইনি) থিসিস করছেন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ ও সার্জন দিলরুবা। ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৬ পর্যন্ত মাদারীপুরের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে স্বামী-স্ত্রী একসঙ্গে কাজ করেছেন। তাঁদের দুজনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ওই সময় মাদারীপুর জেলা ছাড়াও আশপাশের জেলাগুলো থেকে রোগী আসত। ২০০৫ সালে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র ঢাকার আয়োজনে জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে পুরস্কার পান দিলরুবা। এ ছাড়া ২০০৬ সালে ওজিএসবির গাইনি অব সোসাইটিতে শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসেবে সম্মাননা পান। ডা. দিলরুবা বলেন, ‘আমার বাড়ি মাদারীপুর না হলেও এ জেলার মানুষদের প্রতি আমার অনেক মায়া, অনেক ভালোবাসা। সেই ৯৯ সাল থেকে সাত বছর আমি ও আমার স্বামী একসঙ্গে কাজ করার সুবাদে এটা তৈরি হয়। সেই ভালোবাসার টান এখনো আছে। বর্তমানে নিজের কাজ ও পড়াশোনাসহ ছেলে-মেয়েদের জন্য ঢাকা থাকতে হয়। তবে প্রতি সপ্তাহে দুই দিন এখানে থাকি। অনেক সময় ভাবি, মাদারীপুরে আর যাব না। কিন্তু অসহায় গরিব রোগীদের দীর্ঘ লাইনের মুখগুলো আমাকে বারবার এখানে টেনে আনে। ’

তিনি আরো বলেন, ‘স্বামীর কাছ থেকে মানুষকে ভালোবাসতে শিখেছি। তিনি বলতেন, একজন চিকিৎসকের উচিত গরিব-দুঃখী মানুষের পাশে থাকা। তাঁর সেই কথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে আজও গরিব-দুঃখীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা, ওষুধ দেই। ’ মাদারীপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমির নাট্য বিভাগের শিক্ষক আ জ ম কামাল বলেন, ‘ডা. দিলরুবাকে কখনো রাগ করতে দেখিনি। কোনো রোগীর কাছ থেকে টাকা চেয়ে নিতে দেখিনি। বরং গরিব-অসহায়দের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ দেওয়া এমনকি বিনা খরচে মেয়েলি সমস্যায় অপারেশন করেন। ’ মাদারীপুর জেলা মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তা মাহমুদা আক্তার কণা বলেন, ‘আমার দেখা গরিবের ডাক্তার দিলরুবা। ’


মন্তব্য