kalerkantho


বিষাক্ত বর্জ্য ফেলে গ্রাম উজাড়, গা করছে না কারখানা কর্তৃপক্ষ

হাহাকার ২০০ পরিবারে!

শাহীন আকন্দ, গাজীপুর   

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



হাহাকার ২০০ পরিবারে!

বিষাক্ত বর্জ্যে মরে যাচ্ছে আশপাশের গাছগাছালিও। ছবি : কালের কণ্ঠ

তিন-চার বছর আগেও গ্রামটিতে হাঁস-মুরগি, গাভি পালন করে প্রতিবছর লাখ টাকা আয় করতেন গৃহস্থরা। গৃহস্থদের গোয়ালে গরু ও পুকুরে ছিল মাছ।

প্রতিবছর লাখ লাখ টাকা মৌসুমি ফল ও ক্ষেতের সবজি বিক্রি করে স্বাচ্ছন্দ্যে চলত তাঁদের সংসার। মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে গ্রামের সেই সবুজ চিত্র আমূল পাল্টে এখন হাহাকার অবস্থা চলছে। স্রেফ একটি কারখানা তাঁদের সব আমোদ কেড়ে নিয়েছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটী ইউনিয়নের টেপিরবাড়ী পশ্চিমপাড়া গ্রামজুড়ে এখন ওই অবস্থা। গ্রামবাসীর অভিযোগ, আজিজ শিল্প গ্রুপের প্রতিষ্ঠান এএসএম কেমিক্যাল কারখানা কর্তৃপক্ষ মাটির নিচে বিশেষ ব্যবস্থায় তরল বর্জ্য নিঃসারণ করায় বাস অযোগ্য হয়ে পড়েছে গ্রামটি। এতে বিষাক্ত হয়ে পড়েছে টিউবওয়েলের পানি। ওই পানি ব্যবহারে কারো শরীরজুড়ে ফোস্কা, কারো বা শ্বাসকষ্ট। গরু ও হাঁস-মুরগির মড়কসহ পুকুরেও মাছ মরে ভেসে উঠছে। একে একে মরে সাবাড় হচ্ছে গাছপালাও।

গ্রামের ওই ভয়ংকর চিত্র তুলে ধরে গত ২৫ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠ ‘এক কারখানায় ২০০ পরিবারের সর্বনাশ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হারুন-অর রশিদ ফরিদের করা একটি রিট পিটিশনের কারণে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কারখানাটির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালত রুল (নির্দেশ) জারি করেন। এ ছাড়া গত প্রায় ১৫ দিন আগে কারখানাটিকে পাঁচ লাখ টাকা জরিমানাও করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

গ্রামবাসী অভিযোগ করেছে, এর পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনো গা করছে না। এবার তারা (কারখানা কর্তৃপক্ষ) রাতের আঁধারে তরল বর্জ্য পাশের পাথারপাড়া ও গড়গড়িয়া মাস্টারবাড়ী খালে নিয়ে ফেলছে। এতে ভুক্তভোগী কয়েক শ মানুষ গতকাল সোমবার দুপুরে কারখানার সামনে মানববন্ধন করেছে। ভুক্তভোগীরা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে, ‘অবিলম্বে কারখানাটি বন্ধ না হলে আমরা আমরণ অনশনসহ টানা কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করতে বাধ্য হব। ’

স্থানীয়রা জানায়, আজিজ শিল্প গ্রুপের চেয়ারম্যান আজিজুল হক চৌধুরী ১৪ একর জমির ওপর এএসএম কেমিক্যাল কারখানাটি স্থাপন করেন ২০০১ সালে। বসতি এলাকায় কারখানা স্থাপনকালে বিদ্যুত্ উত্পাদন করা হবে বলে ব্যাপক প্রচার চালিয়েছিল কারখানা কর্তৃপক্ষ। উত্পাদিত বিদ্যুত্ জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হবে বলেও জানিয়েছিল তারা। কিন্তু বিদ্যুত্ উত্পাদনের কথা বলে ২০০৩ সাল থেকে ক্ষুদ্র পরিসরে কেমিক্যাল তৈরি করা হতো। ২০০৮ সাল থেকে পুরোদমে বিভিন্ন কেমিক্যাল উত্পাদন শুরু করে তারা।

গ্রামবাসী জানায়, আগে কারখানার তরল বর্জ্য গাড়িযোগে দূরে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে ফেলা হতো। প্রায় দুই বছর ধরে কারখানার ভেতর মাটির প্রায় ৫০০ ফুট নিচে বিশেষ ব্যবস্থায় তরল বর্জ্য নিঃসারণ করা হচ্ছে।

গ্রামের অনেকেই জানিয়েছে, কারখানার ভেতর প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির ওপর একটি পুকুর খনন করে তাতে প্রায় ৫০০ ফুট মাটির নিচের কয়েক শ গজজুড়ে তোলা হয় বিপুল পরিমাণ বালু। এরপর পাইপ দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থায় মাটির নিচে তরল বর্জ্য নিঃসারণ করা হচ্ছে।

গ্রামের দরিদ্র কৃষক আফির উদ্দিন জানান, প্রায় দেড় বছর আগে তাঁর টিউবওয়েলের পানিতে হঠাত্ ঝাঁজালো গন্ধ টের পান তিনি। ক্রমে ওই গন্ধ আরো তীব্র হয়। ওই পানির ঝাপটায় চোখ জ্বালা করে। লবণাক্ততায় পানি মুখেও নেওয়া যাচ্ছিল না। পরে তিনি আরেকটি টিউবওয়েল স্থাপন করেন। কিন্তু ওই টিউবওয়েলের পানিও ছিল ঝাঁজালো। পরে আশপাশের সব টিউবওয়েলের পানিই ঝাঁজালো বলে টের পান তিনি।

ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী আবদুর রহিম জানান, প্রায় দুই বছর আগে তাঁর টিউবওয়েলের পানিতে তীব্র লবণাক্ততা ধরা পড়ে। খোঁজ নিয়ে তিনি পাশের প্রায় সবার টিউবওয়েলের পানির বিস্বাদ অবস্থা টের পান। তিনি আরো জানান, পরে প্রায় এক বছরের ব্যবধানে গ্রামের সব টিউবওয়েলের পানিতে ঝাঁজালো গন্ধ ও লবণাক্ততা ধরা পড়ে।

স্থানীয়রা জানায়, টের পেয়ে গ্রামবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। পরে কারখানা থেকে নিয়মিত বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হতো তাদের। কিন্তু বিশুদ্ধ বলে যে পানি সরবরাহ করা হয়, একসময় তাতেও তীব্র গন্ধ টের পেয়ে তারা কারখানার সরবরাহ করা পানিও ব্যবহার করে না।

এরপর গত ২৪ ডিসেম্বর ভুক্তভোগী গ্রামবাসী কারখানা ঘিরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করে। ওই সময় ঘটনাস্থল গিয়ে গ্রামের ওই ভয়ংকর চিত্র দেখে আঁতকে উঠেছিলেন তখনকার শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আবদুল আউয়ালও। তিনি পরদিন কারখানাটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে সুপারিশ করে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হারুন-অর রশিদ জানান, গত ২৫ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠ পত্রিকায় ‘এক কারখানায় ২০০ পরিবারের সর্বনাশ’ শিরোনামে প্রতিবেদনটি পড়ে শিউরে ওঠেন তিনি। এরপর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য বিবেচনা করে তিনি গত ১২ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতে একটি রিট পিটিশন করেন। পরে শুনানি শেষে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি কারখানাটির বিরুদ্ধে রুল (নির্দেশ) জারি করেন উচ্চ আদালত।

ওই সব বিষয়ে জানতে চাইলে এএসএম কেমিক্যাল কারখানার মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) নূরুল মাসুক দাবি করেন, ‘আমাদের জিরো ডিসচার্জ প্লান্ট রয়েছে, যা ইটিপির পরবর্তী ভার্সন। এখানে দূষণের কোনো বিষয় নেই। এর পরও অভিযোগ ওঠায় আমরা বুয়েট থেকে প্রশিক্ষিত দল আনব। তাদের পরামর্শ নিয়ে কাজ করব। ’

তবে মাটির নিচে বিশেষ ব্যবস্থায় তরল বর্জ্য নিঃসারণের অভিযোগ প্রসঙ্গে ব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মোকারম হোসেন বলেন, ‘এই অভিযোগ সত্য নয়। ’ তিনি দাবি করেন, ‘গ্যাসের পাইপ ফেটে একটি সমস্যা দেখা দিয়েছিল। এতে গ্রামবাসীর সাময়িক শ্বাসকষ্টও দেখা দিয়েছিল। ওই সব সমস্যা এখন আর নেই। ’

শ্রীপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল জলিল অভিযোগ করে বলেন, ‘গ্রামটিতে ২০০ পরিবারের বাস। ওই কারখানাটির কারণে প্রত্যেক পরিবারে হাহাকার অবস্থা চলছে। ধুঁকছে নিরীহ মানুষজন। ’ তিনি আরো অভিযোগ করেন, ‘এত কিছুর পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ কোনো গা করছে না। ’


মন্তব্য