kalerkantho

হঠাৎ ঝড়ে তছনছ

প্রিয় দেশ ডেস্ক   

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



হঠাৎ ঝড়ে তছনছ

ভোলা সদরের ধনিয়া ইউনিয়নের দড়িরাম শংকর গ্রামে গত রবিবার বিকেলে আকস্মিক ঘূর্ণিঝড়ে শত শত ঘরবাড়ি উড়ে গেলে এভাবে খোলা আকাশের নিচে ঠাঁই নেয় গ্রামবাসী। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঝড়ের আঘাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রবিবার বিকেলে ও রাতে দেশের কয়েকটি এলাকায় ওই ঝড় আঘাত হানে।

প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

ভোলা : সদরের ধনিয়া ইউনিয়নের দড়িরাম শংকর গ্রামে রবিবার বিকেলে আকস্মিক ঘূর্ণিঝড় শত শত ঘরবাড়ি উড়িয়ে নিয়ে গেছে। অনেক ঘরের চাল গাছে ঝুলছে। ঘরচাপা পড়ে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ে গাছ পড়ে বৈদ্যুতিক তার ছিঁড়ে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে বিদ্যুৎ সংযোগ। ঘটনার শিকার পরিবারগুলো বর্তমানে মানবেতর অবস্থায় রয়েছে।

গতকাল সোমবার ওই গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, পথে পথে বড় বড় গাছ উপড়ে পড়ে রয়েছে। চোখের সামনে একমাত্র মুরগির খামারটি চুরমার দেখে যেন অনেকটা নির্বাক হয়ে পড়েছেন ধনিয়া ইউনিয়নের দড়িরাম শংকর গ্রামের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের দিনমজুর আলমগীর হোসেন। তিনি জানান, খামারে ৩০০ মুরগির বাচ্চা ছিল।

ঝড়ে শতাধিক মুরগির বাচ্চা মারা গেছে। এক মাস আগে ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে মুরগির খামারটি করেছিলেন তিনি। বসতঘরটি অক্ষত থাকলেও মুরগির খামারটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়।

স্থানীয় ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি মেম্বার নিজাম উদ্দিন জানান, ঘূর্ণিঝড়ে আলমগীরের মুরগির খামারসহ তাঁর ওয়ার্ডেরই ৭৫-৮০টি ঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। আলমগীরের ঘরের পাশেই আজিজুল ব্যাপারী ও শহিদ সরকারের ঘর দুমড়েমুচড়ে গেছে। আজিজুল ব্যাপারীর ঘরের চাল পাশের একটি গাছে ঝুলে রয়েছে। ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মিজি বাড়ির ব্যবসায়ী ইউছুফ হোসেনকে মিস্ত্রি দিয়ে ঘর মেরামতের কাজ করাতে দেখা গেছে।

স্থানীয় গিরিঙ্গি বাজারের কয়েকটি দোকানসহ প্রায় ১৫টি বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বিধ্বস্ত ঘরের ভেতরে হাত-পা গুটিয়ে বসে রয়েছেন অটোরিকশাচালক সবুজ ও তাঁর স্ত্রী বিবি মরিয়ম। সবুজ বলেন, তিন মাস আগে ঝড়ে গাছ পড়ে তাঁর ঘরটি ভেঙে যায়। ধারদেনা করে নতুন করে ঘরটি মেরামত করেন। কিন্তু আবারও ঘূর্ণিঝড় এসে ঘরটি ভেঙে দিল। এ ছাড়া তাঁর মা ও ভাই ইউছুফের ঘরও ভেঙে গেছে।

একই গ্রামের নুরু মাঝি ও আব্দুল মন্নানের ঘর দুটি মাটিতে মিশে গেছে। সেই বিধ্বস্ত ঘরে খেলাধুলা করছে ছোট শিশুরা। এর মধ্যে নুরু মাঝির ঘরের চাল প্রায় এক মাইল দূরে বিলে পড়ে রয়েছে। সেখান থেকে পরিবারের সদস্যরা চাল এনে ঘর মেরামতের চেষ্টা করছে। নুরু মাঝির স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, ‘আমার স্বামী নদীতে মাছ ধইর্যাই আমাগো চার পোলা-মাইয়ার সংসার চালায়। নদীতে আবার অহন অভিযান দিছে। মাছ ধরা বন্ধ। সরকার আমাগো কোনো টাকা-পয়সা দেয় নাই। অহন আবার ঝড়ে আমাগো সব শেষ কইর্যা হালাইছে। আমরা অহন খোলা আকাশের নিচে। সরকার আমাগো সহযোগিতা করলে ঘর উডাইতে পারমু, নাইলে ঘর উডাইতে পারমু না। ’ আব্দুল মান্নানের ঘরের চাল পাশের পুকুরে পড়ে রয়েছে। তাঁর মা রানু বিবি ও বোনেরা মিলে সেই পুকুর থেকে চাল উঠিয়ে ঘর মেরামতের চেষ্টা করছে। বিদ্যুৎ বিতরণকেন্দ্র ওজোপাডিকো ওই গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছে। ওজোপাডিকোর উপসহকারী প্রকৌশলী মাজেদ জানান, সোমবারের মধ্যেই ওই গ্রামে বিধ্বস্ত তার মেরামত করে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে। ভোলা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুজাহিদুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যেকের জন্য ৫০০ টাকা ও ২০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা ও পাঁচ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) : রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে রবিবার রাতের ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উপজেলার উজানচর, দেবগ্রাম, ছোটভাকলা ও দৌলতদিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের দুই শতাধিক কাঁচা ঘরবাড়ি, বিভিন্ন হাটবাজারের দোকানপাট, অসংখ্য গাছপালা ও বৈদ্যুতিক খুঁটি বিধ্বস্ত হয়। এ সময় ঘর ও গাছচাপা পড়ে নারী, শিশুসহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়। তাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তির পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে চিকিত্সা দেওয়া হয়েছে। ঝড়ের কবলে পড়ে মারা গেছে বেশ কিছু গবাদি পশু।

এদিকে বিআইডাব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাট অফিস সূত্র জানিয়েছে, হঠাৎ ঝোড়ো হাওয়ায় নদী উত্তাল হয়ে ওঠায় রবিবার রাতে ব্যস্ততম দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌরুটে এক ঘণ্টা সব ধরনের নৌযান চলাচল বন্ধ ছিল।

মুন্সীগঞ্জ : মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কোনো হতাহতের খবর পাওয়া না গেলেও ঘরবাড়ি ও গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রবিবার রাতের ওই ঝড়ে দুটি গ্রামের বেশ কিছু বসতঘর উড়ে গেছে। এ ছাড়া দুটি মসজিদের চাল উড়ে যাওয়াসহ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও ক্ষতি হয়েছে।

খবর নিয়ে জানা যায়, রবিবার রাত ১০টার দিকে সিরাজদিখান উপজেলা ওপর দিয়ে ওই ঝড় বয়ে যায়। এতে অসংখ্য গাছপালা উপড়ে পড়ে। দুই গ্রামের অন্তত ১৫টি ঘর উড়ে গেছে। রামকৃষ্ণাদি বাজারের মসজিদ ও নতুন ভাষানচর মসজিদের চালা উড়ে যায়। এ ছাড়া মিয়ার হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের পানির ট্যাংক উড়ে গেছে।

সিরাজদিখান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তানবীর মোহাম্মদ আজিম জানান, ঝড়ে এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় চেয়ারম্যান, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে সাহায্যের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে ঝড়ের তাণ্ডবে লৌহজং উপজেলা কলেজ মাঠে আয়োজিত সাত দিনব্যাপী নাট্যমেলার মঞ্চটিও উড়িয়ে নিয়ে গেছে। লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মনির হোসেন জানিয়েছেন, রবিবার রাতে ঝড়ে তেমন কোনো ক্ষতি না হলেও বিদ্যুত্ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে।


মন্তব্য