kalerkantho

রাঙ্গাবালী

‘সিলবাজি’

এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী   

৭ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘সিলবাজি’

পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী উপজেলার নেতা ছালেহা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে আওয়ামী লীগের কর্মীরা এভাবেই প্রকাশ্যে সিল মারে। ছবি : কালের কণ্ঠ

ঘড়ির কাঁটায় ঠিক সকাল ৯টা ২৩ মিনিট। রাঙ্গাবালী উপজেলার নেতা ছালেহা মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, ভোটার নেই। তবে বাইরে নৌকা প্রতীকের ব্যাচ বুকে ধারণ করে ঘুরছে লোকজন। তিন মিনিট ব্যবধানে সাতটি মোটরসাইকেল বোঝাই ১৫-২০ জন যুবক এসে হুড়মুড় করে কেন্দ্রের বুথে সরাসরি প্রবেশ করে। দায়িত্বে থাকা কোনো পুলিশ তাদের আটকানোর চেষ্টা করেনি। প্রত্যেক বুথে চার থেকে পাঁচজন করে প্রবেশ করে ব্যালটে সিল মারা শুরু করে। এ সময় অসহায়ের মতো ওই দৃশ্য দেখছিলেন প্রিসাইডিং এবং সহকারী প্রিসাইডিং অফিসাররা।

সিল মারাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছিল, ‘কোনো আওয়াজ হবে না। নিরিবিলি কাজ হবে। রাস্তায় যারা পুরুষ-মহিলা আছে, সবাইরে লাইনে দাঁড় করা। ’ এরপর ছয়টি বুথের প্রত্যেকটিতে একযোগে চলে ব্যালটে সিল মারার কাজ।

এর আগে সকাল ৯টায় খবর আসে ওই কেন্দ্র থেকে বিএনপি প্রার্থীর এজেন্ট বের করে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রটিতে প্রায় ১৫ মিনিট অবস্থানের পর দলীয় কর্মীরা বাইরের পরিস্থিতি হঠাৎ উত্তপ্ত করে তোলে। কেন্দ্রের সামনের রাস্তায় বেরিয়ে কয়েকজন সাধারণ ভোটারের সঙ্গে কথা হয়।

ভোটার মো. আলমগীর হোসেন (৫০) বলেন, ‘আমি ভোট দিতে গেছিলাম। আমারে কয়, টিবিলের ওপর ব্যালোট রাইক্কা সিল দেতে। আমি ব্যালোট থুইয়া আইয়া পড়ছি। ’

হাসেম মৃধা বলেন, ‘আমি ব্যালোট লইয়া বুতে (গোপন কক্ষ) ডোকা ধরছি, আমার তোন ব্যালোটটা রাইক্কা দেছে একটা পোলায়। ’ ওই কেন্দ্রে ভোট দিতে এসে হতাশার কথা জানালেন সাইদুল নামের যুবক বয়সের এক কৃষক। তিনি বলেন, ‘আমনেরাই তো দেখলেন, হ্যারা ক্যামনে ভোড দেতে আছে। এই ভোডের দরকারডা আছেলে কি। অ্যাহন বাড়ি যাইয়া কাম কাইজ করি। ’ এ কেন্দ্রের ভোটার রুবেল মোল্লা, ইসমাইল খাঁও একই কথা বলে কেন্দ্র ত্যাগ করেন।

ভোট দিল কিশোররা সকাল ৮টা ৩০ মিনিটে খবর আসে কাছিবুনিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র থেকে বিএনপির প্রার্থীর এজেন্টকে বের করে দেওয়া হয়েছে। সকাল ১০টা ২০ মিনিটে ওই কেন্দ্রে গিয়ে দেখা গেছে, লাইনে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন কিশোর। পর্যায়ক্রমে এ কিশোরেরা ভোট দিল। তাদের কাছে নাম, বয়স, বাবার নাম জিজ্ঞেস করতে তারা সব কিছু জড়িয়ে ফেলছিল। একপর্যায়ে রনি পরিচয়ে এক কিশোর বলে, ‘দ্যাহেন না। আতে স্লিপ আছে। ভোটার না অইলে এই স্লিপ পাইতাম?’ ওই কেন্দ্রে প্রায় ১৫ মিনিট অবস্থানের পর আবার কতিপয় যুবক মোটরসাইকেলযোগে এসে একইভাবে বুথে প্রবেশ করে ব্যালটে সিল মারতে শুরু করে।

রাঙ্গাবালী মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে সকাল থেকে ভোটারদের উপস্থিতি ছিল কম। সকাল ১১টা পর্যন্ত তিন হাজার ৫১৫ ভোটারের মধ্যে ৩১৭ জন ভোট দেন। এর ২০ মিনিট ব্যবধানে ওই কেন্দ্র থেকে বিএনপি এজেন্টদের বের করে দিয়ে ব্যালটে সিল মারা শুরু হয়।

সকাল ৮টা ৩০ মিনিটের পর থেকে পর্যায়ক্রমে ওই উপজেলা চেয়ারম্যান পদের উপনির্বাচনের ৩০টি ভোটকেন্দ্রের প্রায় সবগুলো কেন্দ্রের বিএনপি এজেন্টদের বের করে দখলের খবর আসতে থাকে। এদিকে নির্বাচন পণ্ড করার অভিযোগে চরমোন্তাজ সিদ্দিকিয়া দাখিল মাদরাসা কেন্দ্র থেকে চরমোন্তাজ ইউপির ৫ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপি সভাপতি মাইনুল ইসলামকে সকাল ১১টা ১০ মিনিটের সময় গ্রেপ্তার করা হয়।

বিএনপি প্রার্থীর সংবাদ সম্মেলন বিএনপি প্রার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন আকন দুপুর ১২টায় তাঁর বাহেরচর বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলন করে ৩০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে একটি কেন্দ্র ছাড়া বাকি সব কেন্দ্রে এজেন্ট বের করে দেওয়া, কেন্দ্র দখল এবং ব্যালট ছিনতাই করে সিল মারার অভিযোগ করেন। তিনি পুনরায় ভোটের দাবি জানান।

পটুয়াখালী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা খান আবি শাহনুর খান বলেন, ‘বিএনপি প্রার্থীর অভিযোগ পেয়ে তিনটি কেন্দ্র ঘুরে সত্যতা পাওয়া যায়নি। ’


মন্তব্য