kalerkantho


নলডাঙ্গা

স্কুলের জমি সরকারি টাকা উঠছে যুবলীগের অফিস

রেজাউল করিম রেজা, নাটোর   

৬ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



স্কুলের জমি সরকারি টাকা উঠছে যুবলীগের অফিস

নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলায় বারনই নদীর পারে অবৈধভাবে অফিস নির্মাণ করছে যুবলীগ। এ জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচির ৪৫ শ্রমিককে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ জমি কালিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের। ছবিটি গত শনিবার তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

নাটোরের নলডাঙ্গা উপজেলার কালিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের জায়গা দখল করে যুবলীগের অফিস নির্মাণ করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, এ জন্য নিয়োগ করা হয়েছে সরকারের কর্মসৃজন কর্মসূচির ৪৫ জন শ্রমিককে। গত শনিবার সকাল থেকে রড-সিমেন্টের খুঁটি নির্মাণ ও মাটি ভরাট করার মধ্য দিয়ে ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।

বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, স্থানীয় ওয়ার্ড যুবলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী সকালে দলিলমূলে পাওয়া বিদ্যালয়ের হাল ৯৮৪ নম্বর দাগের জমিতে পাকা ভবন নির্মাণকাজ শুরু করে। এ সময় বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে নিষেধ করলেও তাতে তারা কর্ণপাত করেনি। জমিটি বর্ষার সময় পাশের বারনই নদীর সঙ্গে মিশে যায়। তবে শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যালয়ের ভোগদখলে থাকে।

গত শনিবার দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের পূর্বদিকে কালিগঞ্জ সেতুসংলগ্ন প্রায় এক বিঘা জমির মাটি ভরাটের কাজ শুরু করছে ৪৫ জন নারী শ্রমিক। তারা সবাই সরকারের ১০০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচির শ্রমিক। উপজেলার পিপরুল ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) থেকে তাদের এ কাজে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। শ্রমিকদের পাশাপাশি রাজমিস্ত্রিরা রড-সিমেন্টের খুঁটি তৈরির কাজ করছিল। জায়গাটির উত্তর পাশে বারনই নদী, পূর্ব পাশে কালিগঞ্জ সেতু ও দক্ষিণে বাজার।

কর্মরত শ্রমিক রোকেয়া বেগম জানান, তাঁরা সরকারের ১০০ দিনের কর্মসৃজন কর্মসূচির শ্রমিক। তাঁরা পিপরুল ইউপির নিয়োগ করা সর্দার আবদুল হালিমের অধীনে কাজ করছেন। ওয়ার্ড সদস্য ও যুবলীগের নেতারা তাঁদের এখানে কাজে লাগিয়েছেন। তাঁদের বলা হয়েছে, এখানে যুবলীগের অফিস নির্মাণ করা হবে। তাঁরা মাটি ভরাটের কাজ করছেন।

শ্রমিক সর্দার আবদুল হালিম বলেন, ‘৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আখের আলী ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য দেলোয়ার হোসেনের নির্দেশে যুবলীগের ক্লাব ঘর করার কাজ করছি। এ কাজের জন্য আমি সরকারি কর্মসৃজন কর্মসূচির তহবিল থেকে প্রতিদিন ২৫০ টাকা ও ৪৫ জন শ্রমিক ২০০ টাকা করে পাবে।’ দলীয় অফিস করার কাজ তো তাঁরা করতে পারেন না বলা হলে তিনি বলেন, ‘আমরা লেবার। মেম্বার-চেয়ারম্যান আমাদের যেখানে কাজ করতে বলবেন, আমরা সেখানে কাজ করব।’

ঘটনাস্থলে অবস্থানকালে ৮ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুধন্য সরকার সেখানে আসেন। তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারি দল করি। আমাদের বসার একটা ঘর দরকার। তাই নদীর চরে দলীয় অফিস ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। পাঁচ শতাংশের ওপর আরসিসি পিলার দিয়ে ঘর নির্মাণের পাশাপাশি আশপাশ দিয়ে মার্কেট নির্মাণ করা হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, চেয়ারম্যান ও এলাকাবাসী আমাদের এখানে ঘর নির্মাণ করতে বলেছেন।’ সরকারি কোনো অনুমোদন বা অনুদান নিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না নেওয়া হয়নি। আমরা চাঁদা তুলে ঘর করছি।’

দলীয় কার্যালয় নির্মাণের উদ্যোক্তা দাবি করে ৮ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ জানান, তাঁরা আশপাশের বিভিন্ন জমিতে অফিস নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বিদ্যালয়ের বাধার মুখে তা করতে পারেননি। শেষে সংসদ সদস্য নদীর এই জায়গায় ঘর করতে বলেছেন। তা ছাড়া স্থানীয় চেয়ারম্যান ও এলাকাবাসী এখানে ঘর নির্মাণ করার লিখিত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এ সময় তিনি ইউপি চেয়ারম্যানসহ ৩৬ জনের স্বাক্ষর করা একটা সাদা কাগজ দেখান। সেখানে ‘কালিগঞ্জ ক্লাব ঘরের জায়গা’ লিখে উপস্থিত লোকজনের স্বাক্ষর রয়েছে। কোনো সিদ্ধান্ত লেখা নেই। তিনি বলেন, ‘এই জমি নিয়ে বিদ্যালয় ও রাধা গোবিন্দ বিগ্রহ কমিটির মধ্যে মামলা আছে। তবে আমরা মনে করি, এটা নদীর খাস জমি। তাই এখানে ভবন করছি।’ কিন্তু নদী দখল করে দলীয় অফিস ভবন নির্মাণ করা যায় কি না জানতে চাইলে তিনি আরো বলেন, ‘এটা নদীর তীর। এতে সমস্যা হবে না।’ স্থানীয় প্রশাসনের এ ব্যাপারে অনুমোদন আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমরা অনুমোদন নিইনি। তবে দলের নেতাকর্মীদের মত আছে।’ সরকারি শ্রমিক দিয়ে দলের কাজ করানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘আমরাও তো সরকারি দলের লোক। মেম্বাররা তাঁদের দিয়ে কাজ করাচ্ছেন।’

পিপরুল ইউপির চেয়ারম্যান কলিম উদ্দিন বলেন, ‘যুবলীগ নেতাদের অনুরোধে আমি এক বেলার জন্য শ্রমিকদের কাজ করতে পাঠায়েছিলাম। জায়গা নিয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও একটি বিগ্রহ কমিটির মধ্যে বিরোধ রয়েছে। তবে জায়গাটি নদীর খাস জমি বলে আমার ধারণা।’

কালিগঞ্জ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. এনামুল হক বলেন, ‘যুবলীগের অফিস যে জমিতে নির্মাণ করা হচ্ছে, সেটার হাল দাগ নম্বর ৯৮৪। এটা ১৯৭৪ সালে রাধা গোবিন্দ বিগ্রহ কমিটি বিদ্যালয়কে দলিলমূলে দান করে দিয়েছে। পরবর্তী সময়ে কমিটি এর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছে। মামলাটি চলমান। জমিটি বর্ষাকালে বারনই নদীর সঙ্গে মিশে যায়। তবে শুষ্ক মৌসুমে জমিটি আমাদের দখলে থাকে। আমাদের নিষেধ সত্ত্বেও যুবলীগের ছেলেরা শনিবার সকাল থেকে তাদের ক্লাবঘর নির্মাণকাজ শুরু করেছে। এ ব্যাপারে আমরা থানায় অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছি।’

নলডাঙ্গা উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমিন আক্তার জাহান বলেন, ‘ঘটনাটি জানা নেই। যদি যুবলীগের অফিস নির্মাণ করার কাজে কর্মসৃজন কর্মসূচির শ্রমিকদের লাগানো হয়, তাহলে তা বন্ধ করে দেওয়া হবে।’



মন্তব্য