kalerkantho


সিআরপির উন্মুক্ত মেলায় মিরসরাইয়ের সেই মুন্নি

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাভার (ঢাকা)   

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সিআরপির উন্মুক্ত মেলায় মিরসরাইয়ের সেই মুন্নি

বখাটের চায়নিজ কুড়ালের আঘাতে পঙ্গুত্ববরণকারী যে কিশোরীর সারা জীবন কাটবে হুইল চেয়ারে, সেই মুন্নির মুখেও শুক্রবার ছিল একরাশ হাসি। বিষণ্নতা ঝেড়ে ফেলে সাভারে পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুনর্বাসন কেন্দ্র (সিআরপি) আয়োজিত উন্মুক্ত দিবসের মেলায় একটি হুইল চেয়ারে ঘুরে বেড়াতে দেখা গেল সিআরপিতে চিকিৎসাধীন মুন্নিকে। অন্য প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের সঙ্গে মুন্নি দিনটি প্রাণভরে উপভোগ করেছে।

শুক্রবার সিআরপির উন্মুক্ত মেলায় এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয় মুন্নির। মুন্নি জানায়, সে চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার উত্তর গড়িয়াইশের দিনমজুর জাফর আহম্মদ ও রিজিয়া বেগম দম্পতির মেয়ে। বছর দুয়েক আগে পড়তেন মিঠাইছড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে সপ্তম শ্রেণিতে। কিন্তু লেখাপড়া করার তেমন সুযোগ পায়নি মুন্নি। কারণ স্কুলে যাওয়া-আসার পথে মোজাম্মেল নামের এক বখাটে তাকে বিরক্ত করত। উপায়ান্তর না পেয়ে বাবা তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেন। মুন্নি জানায়, একপর্যায়ে নিকটাত্মীয় জয়নালের সঙ্গে মুন্নির বিয়ে ঠিক হওয়ার পর মোজাম্মেল গত বছরের ২৯ জুন তাকে চাইনিজ কুড়াল দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে। তাত্ক্ষণিক মুন্নিকে মিরসরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়।

এরপর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কিছুদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর তাকে পাঠানো হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে তাকে সাভারের সিআরপিতে ভর্তির পরামর্শ দেওয়া হয়। গত বছরের ৪ নভেম্বর মুন্নি সিআরপিতে ভর্তি হয়।

মুন্নি বলে, ‘যা হয়েছে মেনে নিয়েছি। এখন হুইলচেয়ারই আমার সারা জীবনের সঙ্গী। ’ মোবাইল ফোনে গেম খেলে ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে সময় কাটায় সে। মুন্নি জানায়, বখাটে ও মাদকাসক্ত মোজাম্মেলকে পুলিশ গত ডিসেম্বরে গ্রেপ্তার করেছে।

পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রের (সিআরপি) হেড অব মেডিক্যাল সার্ভিস অ্যান্ড কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন ডা. সাঈদ উদ্দিন হেলাল বলেন, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে মুন্নির মেরুদণ্ড দুই ভাগ হয়ে গেছে। বর্তমানে তার শরীরের ঘা শুকিয়েছে। সে এখন একাই হুইলচেয়ার নিয়ে ঘোরাফেরা করতে পারছে। শিগগিরই তাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

সিআরপির মেডিক্যাল সার্ভিসেস উইংয়ের রেজিস্ট্রার ডা. ইসরাত জাহান ঊর্মি বলেন, চিরদিনের জন্য পঙ্গুত্বের অভিশপ্ত জীবন বহন করতে হবে মুন্নিকে। আর কোনোদিন সে হাঁটতে পারবে না। তার শরীরের ঘা শুকানোর পর প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে তাকে হুইলচেয়ারে বসার উপযুক্ত করা হয়েছে। বাকি জীবন তাকে হুইল চেয়ারেই কাটাতে হবে। মুন্নির মা রিজিয়া বেগম সারাক্ষণ তার সঙ্গে থাকেন। মেয়ের চিকিৎসার জন্য তিনি ভিটেবাড়ির সামান্য জমিও বিক্রি করে দিয়েছেন। নিজের সঞ্চয় আর স্বজনদের সাহায্য নিয়ে প্রায় ছয় লাখ টাকা মেয়ের চিকিৎসায় ব্যয় করেছেন। এখন তাঁরা মুন্নির ছোট চাচার বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

‘উন্মুক্ত দিবস’ পালিত : নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে সাভারে পক্ষাঘাতগ্রস্ত পুনর্বাসন কেন্দ্রে (সিআরপি) গতকাল দিনব্যাপী ‘উন্মুক্ত দিবস’ পালিত হলো। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমসুযোগ, সম-অংশগ্রহণ, সম-অধিকার ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের লক্ষ্যে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক এবং এশিয়াটিক সোসাইটির সাবেক সভাপতি ড. হারুনুর রশিদ। এ ছাড়া সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়কারী, নির্বাহী পরিচালকসহ সিআরপির রোগী, ছাত্র-শিক্ষক, ভলান্টিয়ার, কর্মকর্তা-কর্মচারী, সরকারি-বেসরকারি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বার্ষিক এ উন্মুক্ত দিবসে সূচনা বক্তব্যে সিআরপির প্রতিষ্ঠাতা ও সমন্বয়কারী ভ্যালেরি এ টেইলর বলেন, সিআরপির সেবা সম্পর্কে জানতে আগ্রহী সমাজের সর্বস্তরের মানুষের জন্য এ বিশেষ দিনে সিআরপি সারা দিন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। যেকোনো অসুস্থ ব্যক্তি তার প্রয়োজন অনুযায়ী সিআরপি থেকে যথাযথ সেবা নিতে পারবে কি না সে সম্পর্কে পরিপূর্ণ ধারণা পায়।

সিআরপির নির্বাহী পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা স্বপ্ন দেখি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে সমাজের মূল স্রোতধারায় একীভূত করার। সে লক্ষ্যে বছরের একটি নির্দিষ্ট দিন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে এ আয়োজন করা হয়। ’


মন্তব্য