kalerkantho


সিংপুর কার্গোঘাট

ঘাট আছে, রাজস্ব নেই

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

৪ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



ঘাট আছে, রাজস্ব নেই

কয়লা, সিমেন্ট, বালু, রড, পাথর, ইটসহ নানা ধরনের পণ্যবোঝাই নৌযান এ ঘাটে নোঙর করে। প্রতিবছর ঘাটটির ডাক ওঠে। কিন্তু কোনো রাজস্ব দেওয়া হয় না সরকারকে। ছবিটি কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার সিংপুর কার্গোঘাট থেকে সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কিশোরগঞ্জের হাওর অধ্যুষিত নিকলী উপজেলার সিংপুর কার্গোঘাটের গত বছর ডাক উঠেছিল পৌনে পাঁচ লাখ টাকা। প্রতিটি নৌযান থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা করে টোল আদায় করা হয়।

কিন্তু এ টাকা সরকারি কোষাগারে জমা হয় না। কারণ, এ ঘাটের সরকারি নিয়ন্ত্রণ নেই।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সিংপুর বাজারের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ধনু নদী। এটি ব্যস্ততম একটি নৌপথ। এ নৌপথ দিয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় মালামাল পরিবহন করা হয়। ফলে প্রতিদিন অসংখ্য কার্গো ও বাল্কহেড চলাচল করে। কয়লা, সিমেন্ট, বালু, রড, পাথর, ইটসহ নানা ধরনের পণ্য পরিবহন হয়। সিলেট থেকে ঢাকা কিংবা ঢাকা থেকে ছাতক বা দূরের কোনো গন্তব্যে যেতে নৌযানগুলোর বেশ কয়েক দিন লেগে যায়। ফলে এখানে তারা বিশ্রাম নেয়।

স্বাধীনতার পর থেকে এই ঘাট চালু আছে। বাজারের পাশে একটি ফেরিঘাট আছে। সেটি ইজারা দেয় স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ। গত বছর এটির ইজারা দেওয়া হয়েছে পাঁচ লাখ ছয় হাজার টাকায়। অথচ এ ঘাট থেকে প্রায় ২৫০ গজ দূরের কার্গোঘাটে সরকারের কোনো হাত নেই। ১০ বছর ধরে স্থানীয় মসজিদ কমিটির লোকজন এটি অবৈধভাবে ইজারা দিচ্ছে।

সম্প্রতি ঘাটে গেলে কথা হয় সুনামগঞ্জের মিয়ারচর থেকে বালু নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরগামী আলমগীর-১ নামের একটি বাল্কহেড শ্রমিক শাহ পরানের (৩০) সঙ্গে। তিনি জানান, নৌযানগুলো রাতে চলাচল করে না। তাই তিন-চার দিনের কোনো গন্তব্যে যেতে হলে তাঁদের এ স্থানে রাত যাপন করতে হয়। এই অবস্থানের বিনিময়ে তাঁদের রাতপিছু নৌযানভেদে ৬০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়। সন্ধ্যার পর ঘাটের লোকজন টাকা আদায় করে। প্রতিদিন রাতে এ ঘাটে শতাধিক নৌযান অবস্থান করে।

গত শুক্রবার বিকেলে সিংপুর কার্গোঘাটে গিয়ে দেখা যায়, কয়েকটি কার্গো ও বাল্কহেড রাত যাপনের জন্য ঘাটে নোঙর করার চেষ্টা করছে। আরো কয়েকটি কার্গো নোঙর ফেলার কাজ শেষ করেছে। এ সময় নৌযানের লোকজন জানায়, রাত ৮টা থেকে ৯টা পর্যন্ত কার্গো আসে এখানে।

অবৈধ ব্যবসার কেন্দ্র কার্গোঘাটের সামনে দেখা গেল ছোট ছোট টংঘর। সব ঘরে ডিজেল রাখার বড় বড় পাত্র। কোনো কোনো টংঘরের সামনে পাথর ও বালু স্তূপ করে রাখা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এলাকার এক ব্যক্তি জানান, কার্গোঘাটের আড়ালে সবচেয়ে বড় যে বাণিজ্য, সেটা অবৈধ ব্যবসা। কার্গোর লোকজন রাতে তেল, পাথর, বালু, সিমেন্ট স্থানীয়দের কাছে বেচে দেয়। অভিযোগ রয়েছে, এক আওয়ামী লীগ নেতার তত্ত্বাবধানে চলছে এ রমরমা ব্যবসা। এ অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য নির্বিঘ্ন করতেই মূলত ঘাটটি চালু রাখা হয়েছে।

ঘাট ঘুরে দেখা গেছে, কেবল নদীর পাড়ে ১৭টি টিনের চালা বসানো হয়েছে। এ রকম একটি ঘরে বসে ছিলেন সাইফুল ইসলাম। তাঁর ঘরে বড় বড় ট্যাংক সাজানো। প্রতিটি ট্যাংকে আবার নাম লেখা। এখানে কিসের ব্যবসা হয়? উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা ডিজেল বেচি। ’ কার কাছে বেচেন? তিনি বলেন, ‘কার্গোওয়ালাদের কাছে। ’ তবে আড়ালে এক লোক জানান, তাঁরা রাতে কার্গো বা নৌযানের লোকজনের চুরি করা ডিজেল বা ইঞ্জিন অয়েল কম দামে কিনে রাখেন।

এলাকার আরেকজন বলেন, ‘শুধু তেল কিংবা পাথর-বালু-কয়লা নয়, মাদকের বড় চালানসহ অবৈধ মালামালও হাতবদল হয়। ’

যুবক আলমাস মিয়া জানান, তিনি কার্গো থেকে টাকা তোলেন। তা ছাড়া চুরি ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত। সিংপুরের সলিমুল হক বলেন, ‘এটা কার্গোঘাট নয়, চুরির হাট। ’

শিমুল নৌপরিবহনের মিস্ত্রি খোকন মিয়া জানান, তিনি কোনো দিন বাল্কহেডের তেল বা মালামাল বিক্রি করেননি। তবে এখানে এসব ব্যবসা হয়ে থাকে বলে শুনেছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কার্গো শ্রমিক ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘সব কার্গোই কমবেশি চুরি করা তেল বা মালামাল বিক্রি করে এ ঘাটে। ’

এলাকার লোকজন জানায়, এখানে বাজারের চেয়ে অনেক কম দামে পাথর, কয়লা, বালু ও সিমেন্ট কেনা যায়।

সিংপুর বাজার জামে মসজিদের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা এমদাদুল ইসলামের কাছে প্রশ্ন ছিল, তাঁরা ঘাট ইজারা দিতে পারেন কি না? জবাবে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে এ প্রথা চলে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় মসজিদের উন্নয়নের স্বার্থে প্রকাশ্য ডাকে এটি ইজারা দেওয়া হয়। ’ ঘাট ঘিরে যে অবৈধ ব্যবসা, চুরির মাল বেচাকেনা হয় তার সঙ্গে একমত নন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এগুলো উচ্ছেদ হওয়া প্রয়োজন। এতে মসজিদের বদনাম হচ্ছে। ’

সিংপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘আমি স্থানীয় মসজিদ থেকে কার্গোঘাটটি এ বছর পৌনে পাঁচ লাখ টাকায় ডেকে এনেছি। প্রতি নৌযান থেকে প্রতিদিন ৫০ টাকা হারে টোল আদায় করা হয়। ’ তবে ঘাটে যে চুরি করা মালামাল বিক্রি হয় তার সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তিনি বলেন, ‘লোড-আনলোড করে কার্গো বা বাল্কহেডে যে অতিরিক্ত মালামাল থাকে তা-ই পথে বিক্রি করে দেয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এসব কেনাবেচা করে এলাকার অন্তত ৪০-৫০টি পরিবার চলে। ’

সিংপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল হক বলেন, ‘কার্গোঘাট যদি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ইজারা হতো, তাহলে ইউনিয়নের রাজস্ব বৃদ্ধির পাশাপাশি অনেক উন্নয়নমূলক কাজ করা যেত। আর অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য ও চুরির মালামাল বেচাকেনাও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হতো। ’

নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাসির উদ্দিন মাহমুদ বলেন, ‘সিংপুরে মসজিদের নামে কার্গোঘাট ইজারা দেওয়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। তা ছাড়া ওখানে যে অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য হয় সেটাও জানি না। তবে বিষয়গুলো সত্য হলে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। ’


মন্তব্য