kalerkantho


সুদখোরের টাকা বকেয়া

বাবাকে না পেয়ে ছেলেকে নির্যাতন, অপমানে আত্মহত্যা!

আলম ফরাজী, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)   

৩ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



সুদে নেওয়া টাকা পরিশোধ করতে পারেননি বাবা। সেই দায় ছেলে নিজের কাঁধে নিয়ে নেন।

কিন্তু তিনিও নির্দিষ্ট সময়ে সেই টাকা শোধ করতে পারেননি। এরপর বাড়িতে গিয়ে বাবাকে না পেয়ে বৃদ্ধ মাসহ ওই ছেলেকে বেঁধে নিয়ে যান সুদখোর। নির্যাতনের পর ছেলের সামনে মায়ের কাছ থেকে একমাত্র অবলম্বন ৮০ শতক ফসলি জমি লিখে নেওয়া হয়। এর এক সপ্তাহের মধ্যে গত বুধবার রাতে ঢাকায় রেললাইনে পাওয়া যায় ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার কলেজ ছাত্র মাহবুব আলমের (২০) মরদেহ। অপমানে তিনি ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার।

মাহবুব আলম নান্দাইল উপজেলার রাজগাতি ইউনিয়নের কাশিনগর গ্রামের টেইলার্স মো. ফজলুল হকের ছেলে। তিনি কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল সরকারি কলেজের স্নাতক শ্রেণির প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন।

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে মাহবুব আলমের লাশ বাড়িতে আনা হলে এক হূদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ছেলের লাশ দেখে মা নাসিমা বেগম বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলেন।

মাহবুবের বাবা ফজলুর রহমান স্বীকার করেন, তাঁর জুয়া খেলার নেশা ছিল। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে জুয়া খেলতেন। স্থানীয় কালীগঞ্জ বাজারের প্লাস্টিকের আসবাব ব্যবসায়ী মো. দস্তর আলীর কাছ থেকে চড়া সুদে টাকা নিতেন। তবে ফজলুর রহমান অভিযোগ করেন, দস্তর আলীর লেনদেন স্বচ্ছ ছিল না। তিনি খাতায় অতিরিক্ত টাকা লিখে রাখতেন।

ফজলু জানান, জুয়ার নেশা ও সুদের ব্যবসায়ী দস্তর আলীর কারসাজিতে তিনি আর্থিকভাবে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন। তিনি ৩০০ থেকে ৩২০ শতক ফসলি জমি বিক্রি করেও সুদের ব্যবসায়ীর পাওনা পরিশোধ করতে পারেননি। শেষ পর্যন্ত ৭৩ হাজার টাকা বকেয়া রয়ে যায়। এই টাকার জামিনদার হন তাঁর ছোট ছেলে মাহবুব আলম। জমি বিক্রি করে আগামী এক মাসের মধ্যে সব টাকা দেবেন বলে জানিয়ে দেন। কিন্তু ১৫ দিন যেতে না যেতেই তাঁকে ও তাঁর মাকে ধরে নেন দস্তর আলী। এরপর বাজারে দোকানঘরে নিয়ে মায়ের সামনে ছেলেকে নির্যাতন করেন। পরে সেখান থেকে তাঁর চাচাতো ভাই হিরন মিয়া ফের জামিন নিয়ে ছাড়িয়ে আনেন মাহবুবকে। এর মধ্যে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে নাওয়াখাওয়া এক রকম ছেড়ে দেন। সুদের টাকা পরিশোধ করেই খাবার খাবেন বলে জানান। অন্যথায় আত্মহত্যা করবেন। এর মধ্যেই তিনি ঢাকায় চলে যান। এলাকার ইউপি সদস্য আবদুল কাইয়ুম বলেন, তিনি একটি সালিস করে সুদ ও বকেয়াসহ এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা পরিশোধ করার জন্য সাব্যস্ত করে দেন। এর মধ্যে ফজলু তাঁর সামনে ২০ হাজার টাকা পরিশোধ করে বাকি টাকার জন্য সময় চান।

ফজলু বলেন, তিনি সময়মতো টাকা পরিশোধ করতে না পেরে গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। তাঁকে না পেয়ে দস্তর আলী বাড়ি থেকে তাঁর ছেলে মাহবুবকে ও তাঁর মাকে ধরে নিয়ে আটকে রাখেন। ছেলের ওপর নির্যাতনও চালানো হয় বলে তাঁর অভিযোগ। পরে দস্তর আলী মা ও ছেলের কাছ থেকে নন-জুডিশিয়াল খালি স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর রাখেন। এ ঘটনার পর চলতি রোরো মৌসুম শুরু হওয়ার সময় দস্তর আলী লোকজন নিয়ে এসে তাঁর ৮০ শতক ফসলি জমি জবরদখল করে চাষাবাদ করেন।

ফজলুর স্ত্রী নাসিমা বলেন, গত রবিবার মাহবুব আলম ঢাকায় যান। যাওয়ার সময় বলে যান, চাকরি করে টাকা আয় করে বাবার নেওয়া সুদের টাকা পরিশোধ করে বেদখল হওয়া জমি ছাড়াবেন। অন্যথায় এই মুখ নিয়ে আর ফিরবেন না। ‘সত্যিই তো আমার বাবা অহন লাশ অইয়া ফিইরা আইছে’—এই বলে চিত্কার করে কান্না করতে থাকেন নাসিমা।

ঢাকায় মাহবুব আলমের সঙ্গে থাকা তাঁর বন্ধু মো. হাসিম উদ্দিন জানান, তিনি পাঁচ-ছয় বছর ধরে ঢাকায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করেন। তাঁর সঙ্গে মাহবুবের দেখা হয় বুধবার সন্ধ্যায় ঢাকার খিলক্ষেত বাজারে রেললাইনের কাছে। সেখানে তাঁকে খুবই বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। একসময় চোখের আড়াল হতেই তাঁকে রেললাইনে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ সময়ই তাঁর মৃত্যু হয়।


মন্তব্য