kalerkantho


গাঙিনারপাড় যৌনপল্লী ঘিরে সক্রিয় নারী পাচারচক্র

নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গাঙিনারপাড় যৌনপল্লী ঘিরে সক্রিয় নারী পাচারচক্র

নারীপাচারকারী ভয়ংকর চক্রের সন্ধান মিলেছে ময়মনসিংহে। সম্প্রতি জেলা সদরের পাশের এক উপজেলার দরিদ্র পরিবারের এক তরুণী শহরের গাঙিনারপাড়ের যৌনপল্লী থেকে উদ্ধারের পর চক্রটির তত্পরতা ফাঁস হয়েছে।

সূত্র জানায়, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে সম্প্রতি শহরের গাঙিনারপাড় এলাকার যৌনপল্লী থেকে পুলিশ এক তরুণীকে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়। ওই তরুণীর কাছ থেকেই জানা যায় নারীপাচার ও পতিতালয়ে বিক্রির অপতত্পরতা সম্পর্কে ভয়ংকর তথ্য। মেয়েটি জানায়, প্রায় দুই মাস আগে সে ঢাকা থেকে একা ট্রেনে ময়মনসিংহে আসে। ঢাকায় সে এক বাড়িতে কাজ করত। মেয়েটি ময়মনসিংহ রেলস্টেশনে নেমে রিকশায় বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার পথে দুই-তিনটি মোটরসাইকেলে এক দল যুবক এসে তাকে অপহরণ করে। এরপর মেয়েটিকে বিক্রি করে দেওয়া হয় শহরের প্রাণকেন্দ্রের যৌনপল্লীতে। সেখানে মেয়েটির ওপর বেশ কয়েক দিন ধরে নির্মম নির্যাতন চালানো হয়। মেয়েটি প্রয়োজনে বাইরে গেলেও তার সঙ্গে পাহারাদার থাকত। এই বাইরে থাকা অবস্থায়ই এলাকার এক যুবক মেয়েটিকে অনুসরণ করে জানতে পারে তার অবস্থান।

পরে পুলিশের সহায়তায় মেয়েটিকে উদ্ধার করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, হতদরিদ্র পরিবারের মেয়েটিকে উদ্ধারের পর যে চক্রের তত্পরতা জানা গেছে তা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দূর অতীতে অনেক মেয়েকেই অপরণ কিংবা ফুসলিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রের এই যৌনপল্লীতে আনা হতো। এসব নিয়ে লোমবর্ষক কাহিনির মতো অনেক ঘটনা এখানে ঘটেছে। সর্বশেষ এই মেয়েটি উদ্ধারের ঘটনায় প্রমাণ হয় যে এই অন্ধাকার গলির আগের চিত্র মোটেও বদলায়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র জানায়, শহর ও আন্ত জেলা নারীপাচারকারী দলের সদস্যরা এখনো গাঙিনারপাড়ের যৌনপল্লীকে ঘিরে তত্পর। এদের তত্পরতা সবচেয়ে বেশি থাকে রেলস্টেশনে। বাড়ি থেকে রাগ করে চলে আসা অথবা একা বাড়িতে যাওয়া বা বাড়ি থেকে শহরে আসা মেয়েরা থাকে এদের টার্গেট। এরা প্রথমে মেয়েদের নিয়ে আসে শহরের গাঙিনারপাড়সংলগ্ন মালগুদাম এলাকার রেল কোয়ার্টারগুলোতে। দুর্বৃত্তরা দিনের বেলায় মেয়েদের এখানে রেখে রাতে যৌনপল্লীতে নিয়ে যায়। এরপর সেখানে চলে নির্যাতন।

সূত্রগুলো জানায়, যৌনপল্লীর ভেতরে পুলিশ পাহারা ও বিভিন্ন এনজিওর তত্পরতা থাকলেও অসহায় মেয়েরা কারোরই সাহায্য পায় না। নিয়তিকে মেনে নিয়ে একসময় ওরা এই অন্ধকার জগতেরই স্থায়ী বাসিন্দা হয়ে পড়ে। এই পল্লীতে কতজন মেয়ে আছে এর কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য কারো কাছে নেই। তবে পল্লীর ভেতরের বাসিন্দাদের সংগঠন ‘শুকতারা’র দেওয়া তথ্য মতে, তাদের মোট সংখ্যা প্রায় ৩০০। উদ্ধার হওয়া মেয়েটি জানায়, সেখানে আরো অনেক মেয়ে আছে, যাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এখানে নিয়ে আসা হয়েছে। সেই মেয়েগুলোও মুক্ত জগতে বের হয়ে আসতে চায়। কিন্তু সুযোগ পাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, অতীতে মাঝেমধ্যে এই যৌনপল্লীতে পুলিশি অভিযান পরিচালনা করা হতো। এখন আর সেসব কিছুই হয় না। এই অন্ধকার গলির সার্বিক বিষয় নিয়ে পুলিশ বা জেলা প্রশাসনের কোনো তত্পরতা গত দশ বছরে চোখে পড়েনি। গুঞ্জন আছে, এই নিষিদ্ধ পল্লী থেকে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা প্রভাবশালীদের কাছে পাঠানো হয়।

প্রশাসনের একটি সূত্র জানায়, প্রায় ১০-১৫ বছর আগে একজন মহিলা ম্যাজিস্ট্রেট মাইক নিয়ে এই যৌনপল্লীর ভেতর প্রবেশ করেন। তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলেন, যারা বাইরে চলে যেতে আগ্রহী তিনি তাদের বাইরে বের করে নিয়ে যাবেন। তখন ১৫ জন মেয়ে দৌড়ে মহিলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে চলে আসে। পরে প্রশাসন পুরো নিরাপত্তা দিয়ে সেই মেয়েদের বাইরে নিয়ে এসেছিল। এর পর থেকে এই পল্লীতে আর কোনো অভিযান নেই।

ময়মনসিংহের এই যৌনপল্লীতে নারীপাচার বিষয়ে জেলা মহিলা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মনিরা বেগম অনু বলেন, একটি শহরের প্রাণকেন্দ্রে কিভাবে নারীদের পাচার করে এনে দেবব্যবসা করানো সম্ভব হয় তা ভাবলেও আশ্চর্য হতে হয়। এখানে পুলিশের ভূমিকাটা কী? ঘটনাস্থলের কাছে একটি পুলিশ ফাঁড়ি থাকলেও তারা কি কোনো খবর রাখে না, নাকি সব জেনেও না জানার ভান করে?


মন্তব্য