kalerkantho


গোলপাতা ‘গোলমেলে’

বিষ্ণু প্রসাদ চক্রবর্ত্তী, বাগেরহাট   

১ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



গোলপাতা ‘গোলমেলে’

সুন্দরবনে গোলপাতার বাহার। ছবি : সংগৃহীত

সুন্দরবন থেকে বনজ দ্রব্য আহরণ সংকুচিত এবং চাহিদা কমে যাওয়ায় গোলপাতা সংগ্রহে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে বাওয়ালিরা। গোলপাতা আহরণের ভরা মৌসুমে এবার বাওয়ালিদের বিএলসি (অনুমতি) দেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর ছিল বন বিভাগ। ফলে আহরণ মৌসুমের এক মাস পেরিয়ে গেলেও সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের ৩ নম্বর কুপ (জোন) থেকে ব্যবসায়ীরা এখনো কোনো বিএলসি নেয়নি। বনের ওপর থেকে চাপ কমাতে বনজ দ্রব্য আহরণ সংকুচিত করার সিদ্ধান্ত আগেই নিয়েছে বন বিভাগ। গোলপাতা আহরণে বাওয়ালিদের ধীরে চলা নীতির প্রেক্ষাপটে অনুসন্ধান চালাতে গিয়ে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

জানা গেছে, সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বিভাগের আওতাধীন ছয়টি কুপ থেকে যুগ যুগ ধরে বাওয়ালিরা গোলপাতা সংগ্রহ করে আসছে। ব্যবসায়ীরা বন বিভাগ থেকে বিএলসি নিয়ে বাওয়ালিদের দিয়ে গোলপাতা কাটার পর নৌকায় বোঝাই করে লোকালয়ে নিয়ে আসে। বছরজুড়ে এসব গোলপাতা বিক্রি চলে। দক্ষিণাঞ্চলে ঘরের ছাউনি হিসেবে গোলপাতার ব্যবহার বহু পুরনো। বাগেরহাট, খুলনা, পিরোজপুর, বরগুনা, বরিশালসহ এ অঞ্চলের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ একসময় ঘরের ছাউনি হিসেবে গোলপাতা ব্যবহার করত। কিন্তু বর্তমান সময়ে গোলাপাতার ব্যবহার কমে গেছে।

এ কারণে ব্যবসায়ীদেরও গোলপাতায় আগ্রহ কম।

সুন্দরবন বিভাগ জানায়, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জে একটি, চাঁদপাই রেঞ্জে দুটি, পশ্চিম বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জে একটি এবং খুলনা রেঞ্জে দুটি গোলপাতা কুপ রয়েছে। গত বছর ওই সব কুপ থেকে গোলপাতা সংগ্রহ করার জন্য ৪৩৭টি বিএলসি দেওয়া হয়। বাওয়ালিরা গত মৌসুমে ওই সব কুপ থেকে ৯৬ হাজার ৯৪০ কুইন্টাল গোলপাতা সংগ্রহ করেছে। গোলপাতা থেকে সরকারের প্রায় ২৯ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। আহরণে লাগাম টানায় এ বছর সুন্দরবন পূর্ব বিভাগ থেকে ৬৭ হাজার এবং পশ্চিম বিভাগ থেকে এক লাখ কুইন্টাল গোলপাতা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি কুইন্টাল গোলপাতার সরকারি রাজস্ব মাত্র ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৮ জানুয়ারি থেকে বিএলসি দেওয়া শুরু হয়েছে এবং ৩০ মার্চ পর্যন্ত গোলপাতা আহরণ চলবে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের আগ্রহ না থাকায় গোলপাতা আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না-ও হতে পারে।

বন বিভাগের তথ্য মতে, গোলপাতা আহরণের ক্ষেত্রে বেশ কিছু শর্ত দেওয়া হয়েছে। শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে ৫০০ মণের বেশি ধারণক্ষমতার নৌকাকে বিএলসি দেওয়া যাবে না, গোলপাতা আহরণের জন্য নির্ধারিত সময়ের অতিরিক্ত সময় বনে অবস্থান করা যাবে না, নির্দেশনা সঠিকভাবে পালন করতে হবে, গোলপাতাঝাড়ের মাইজপাতা ও ঠেকপাতা কোনোভাবেই কাটা যাবে না এবং গোলপাতার আড়ালে যাতে কোনো ধরনের বনজ দ্রব্য পাচার না হয় সে বিষয়টি নিবিড় তদারকির মাধ্যমে নিশ্চিত করতে হবে।

বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও গোলপাতা ব্যবসায়ী সাইফুল ইসলাম খোকন জানান, ২০ বছর ধরে তিনি সুন্দনরবন থেকে গোলপাতা সংগ্রহ করে আসছেন। একসময় শুধু শরণখোলা থেকে ২০০টি নৌকা নিয়ে কয়েক হাজার বাওয়ালি সুন্দরবনে গোলপাতা কাটতে গেলেও এখন মাত্র ৩০টি নৌকা যায়। বিএলসি নিয়ে তাঁর নিজের দুটি নৌকা নিয়ে ১৮ থেকে ২০ জন বাওয়ালি গোলপাতা কাটতে সুন্দরবনে গেছে। সুন্দরবন থেকে গোলপাতা কেটে আনার পর ব্যবসায়ীদের কাছে পাইকারি হিসেবে বিক্রি করা হয়।

সাইফুল ইসলাম আরো জানান, গোলপাতার ব্যবহার কমে যাওয়া, বনদস্যুদের তৎপরতা, বনের ভেতরে নদী-খাল ভরাট এবং বনে আগের মতো বৈধ-অবৈধ সুযোগ না থাকায় গোলপাতা সংগ্রহে এখন আর তাঁদের আগ্রহ নেই। পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার মাছুয়া বাজারের খুচরা গোলপাতা ব্যবসায়ী মো. ফজলুল হক জানান, এখন আগের মতো আর গোলপাতার চাহিদা নেই। বিক্রি কম হওয়ায় অনেক খুচরা বিক্রেতার গত বছরের গোলপাতা এখনো রয়ে গেছে।

ফজলুল হক আরো জানান, গোলপাতায় যে পরিমাণ টাকা লগ্নি করা হয়, সেই তুলনায় ব্যবসা নেই। সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদুল ইসলাম জানান, সুন্দরবনের ওপর থেকে চাপ কমানোর জন্য বনজ দ্রব্য আহরণ সীমিত করা হয়েছে। বনে মানুষের প্রবেশ কমানো গেলে সব ধরনের বনজ সম্পদ বাড়বে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মো. মেহেদীজ্জামান জানান, তাঁর রেঞ্জের দুটি কুপের মধ্যে এ বছর ২ নম্বর কুপে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৩টি নৌকার বিএলসি দেওয়া হয়েছে। আর ৩ নম্বর কুপে এখনো বিএলসি নিতে কেউ আসেনি।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) মোহাম্মদ হোসেন জানান, তাঁর রেঞ্জে একটি গোলপাতার কুপ আছে। ওই কুপ থেকে এ বছর ৭১টি নৌকার বিএলসি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম মাসে গোলপাতা কেটে বাওয়ালিরা নৌকা বোঝাই করে লোকালয়ে ফিরতে শুরু করেছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. সাইদ আলী জানান, পশ্চিম বিভাগের অধীনে খুলনা রেঞ্জে দুটি এবং সাতক্ষীরা রেঞ্জে একটি গোলপাতা কুপ রয়েছে। এ বছর তিনটি কুপের জন্য এ পর্যন্ত ২৩৯টি নৌকার বিএলসি দেওয়া হয়েছে। গোলপাতা কাটার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ কুইন্টাল।

ডিএফও মো. সাইদ আলী আরো জানান, গত বছর তিনটি কুপে গোলপাতা কাটার জন্য ৪০৩টি নৌকাকে বিএলসি দেওয়া হয় এবং ওই কুপগুলো থেকে ৬৮ হাজার ২৪৮ কুইন্টাল গোলপাতা কাটা হয়েছে। গত বছর গোলপাতা থেকে পশ্চিম বিভাগে রাজস্ব আদায় হয়েছে ১৮ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৫ টাকা।


মন্তব্য