kalerkantho


গড়াই চরের মাটি বালুতে কত ‘মধু’

নিজস্ব প্রতিবেদক, কুষ্টিয়া   

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



গড়াই চরের মাটি বালুতে কত ‘মধু’

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গড়াই নদের জিলাপিতলা চর থেকে অবৈধভাবে বালু ও মাটি কেটে বিক্রি করে দিচ্ছে একটি প্রভাবশালী মহল। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর গড়াই নদের জিলাপিতলা চর থেকে অবৈধভাবে বালু ও মাটি কেটে বিক্রি করছে একটি প্রভাবশালী মহল। মহলটি প্রতিদিন এখান থেকে লাখ লাখ টাকা আয় করলেও কোনো রাজস্ব পাচ্ছে না সরকার। অন্যদিকে বালু-মাটি তোলাতে বড় বড় ট্রাক ও এক্সকাভেটর ব্যবহারের কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এলাকার সাধারণ মানুষ ও কৃষক। তারা মাটি-বালু তোলা বন্ধে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দুটি লিখিত আবেদন করেছে।

এদিকে স্থানীয় লোকজন জানায়, গত শুক্রবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিলাপিতলা চরে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে ছয়জনকে আটক করেন। পরে দুজনকে বালু তোলার অভিযোগে জরিমানা করাসহ ছয়জনকেই ছেড়ে দেন।

এলাকাবাসী জানায়, ছয় মাসের বেশি সময় ধরে এলাকার আব্বত আলী, খলিলুর রহমান, মাসুদ ও ফরহাদ এই বালু উত্তোলন করলেও উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা রহস্যজনক কারণে নিশ্চুপ। এখান থেকে প্রতিদিন শতাধিক ট্রাক বালু তুলে ট্রাকপ্রতি দুই হাজার টাকায় বিক্রি করা হলেও সরকার এক টাকাও রাজস্ব পাচ্ছে না। কিন্তু সরকারের স্থানীয় কিছু কর্মকর্তা ঠিকই কমিশন নিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করছেন।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, কুমারখালীর ইউএনও ও সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) ম্যানেজ করেই অবৈধভাবে বালু তুলছে প্রভাবশালীরা। গ্রামের সাধারণ মানুষের দাবির মুখে দুই-এক দিন উপজেলা প্রশাসন লোক দেখানো অভিযান চালায়।

কিন্তু কাউকে আটক বা বালু উত্তোলনের এক্সকাভেটর মেশিন, ট্রাক—কোনো কিছুই জব্দ না করে ফিরে আসে। তারা চলে যাওয়ার পরক্ষণেই আবার শুরু হয় বালু তোলা। অভিযোগকারীরা বলেন, নদীতে যত্রতত্র মাটি ও বালু উত্তোলনের কারণে চরের শত শত একর কৃষিজমিতে ধস নেমে ব্যাপক ফসলহানি হচ্ছে।

জিলাপিতলা এলাকার বাসিন্দা লিয়াকত আলী জানান, অবৈধভাবে মাটি ও বালু তোলার কারণে চরের জমি ও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে, সাধারণ মানুষের চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, রাস্তাঘাট ভেঙে যাচ্ছে। তবু উপজেলা প্রশাসন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

এলাকার কৃষক আলমগীর হোসেন বলেন, ‘গড়াই নদের পাশে আমার কৃষিজমি ছিল, যা আজ নদীগর্ভে চলে গেছে। এভাবে নদী থেকে বালু ও মাটি উত্তোলন করায় আমার মতো অনেক কৃষক জমি হারিয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছে। সরকারদলীয় কয়েকজন ব্যক্তি স্থানীয় সদকি ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ ও উপজেলা প্রশাসনকে ম্যানেজ করে সাধারণ মানুষের জমি দখল করে বালু বহনের রাস্তা বানিয়েছেন। কিন্তু আমরা প্রশাসনের কাছে কোনো প্রতিকার পাচ্ছি না। ’

খোকসা পৌরসভার মেয়র তারিকুল ইসলাম জানান, জিলাপিতলা খোকসা উপজেলার শেষ প্রান্তে। ফলে নদ থেকে যে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে তাতে খোকসার অনেক আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ওই বালু পরিবহনে খোকসার সড়ক ব্যবহার করায় অনেক রাস্তাঘাটের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। অবৈধভাবে এ বালু তোলায় লাখ লাখ টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। অথচ প্রশাসন নিশ্চুপ।

যোগাযোগ করলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আব্দুল মজিদ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি জড়িত নই। বরং প্রশাসনকে বালুখাদকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেছি। ’

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আবু হেনা মো. মুস্তাফা কামাল বলেন, ‘বালু তোলা বন্ধে আমরা চিঠি দিয়ে কুমারখালীর ইউএনওকে নির্দেশ দিয়েছি। যা ব্যবস্থা নেওয়ার উনি নেবেন। ’

কুমারখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সাকিব আল রাব্বী বালু উত্তোলনকারীদের সঙ্গে তাঁর বা উপজেলা প্রশাসনের কারো যোগসাজশের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমরা অভিযান চালালে সবাই (অভিযুক্তরা) পালিয়ে যায়। ’ অভিযোগ ও বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে কথা বলতে কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাহেলা আক্তারের সরকারি ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। তাঁর ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করলেও তিনি ফোন ধরেননি।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক জহির রায়হান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জিলাপিতলার অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আমি উপজেলা প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছি। ’


মন্তব্য