kalerkantho


পঞ্চগড়ে মা-ছেলের রহস্যজনক মৃত্যু

সড়ক দুর্ঘটনা নয় ছক কষে হত্যা

পঞ্চগড় প্রতিনিধি   

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্ত্রী জয়ন্তী রানীকে (৩২) শ্বাসরোধে ও শিশুপুত্র নারায়ণ চন্দ্রকে (১) মাইক্রোবাসের ধাক্কায় হত্যা করা হয়। এ ঘটনা এমনভাবে সাজানো হয় যাতে লোকজন মনে করে সড়ক দুর্ঘটনায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।

এ জন্য শীতেন্দ্রনাথ (৩৫) আহত হওয়ার ভান করে মহাসড়কে অচেতন হয়ে পড়ে ছিলেন। কিন্তু সেই নাটক মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। শীতেন্দ্রনাথ পুলিশের কাছে স্বীকার করেছেন, পরিকল্পিতভাবে তাদের হত্যা করা হয়েছে।

এ ঘটনায় দায়ের করা মামলায় আজ রবিবার গ্রেপ্তার হন শীতেন্দ্রনাথ এবং অভিযুক্ত দুই ভাড়াটে খুনিকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ আদালতে আবেদন জানাবে। একই সঙ্গে গ্রেপ্তার তিনজনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী পুলিশ ঘটনায় জড়িত সন্দেহভাজন একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি কালো মাইক্রোবাস জব্দের তৎপরতা চালাচ্ছে।

গত ২৩ জানুয়ারি রাতে সদর উপজেলার সাড়ে নয় মাইল এলাকায় পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা মহাসড়কের পাশে জয়ন্তী ও নারায়ণের লাশ পড়ে ছিল। এ সময় শীতেন্দ্র অচেতন অবস্থায় মহাসড়কে পড়ে ছিলেন। পুলিশ মা-ছেলের লাশসহ অচেতন শীতেন্দ্রকে উদ্ধার করে পঞ্চগড় সদর আধুনিক হাসপাতালে ভর্তি করে। তাৎক্ষণিকভাবে পুলিশ ঘটনাটিকে সড়ক দুর্ঘটনা বলে ধারণা করে।

রাতেই স্বজনদের অনুরোধে দুজনের লাশ ময়নাতদন্ত ছাড়া হস্তান্তর করে। পরদিন শীতেন্দ্রকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তির ছাড়পত্র দেওয়া হয়। এ নিয়ে কালের কণ্ঠ ২৫ জানুয়ারি ‘পঞ্চগড়ে মা-ছেলের রহস্যজনক মৃত্যু’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে।

জয়ন্তীর বাবার বাড়ি সদর উপজেলার তেলিপাড়া গ্রামে ও শীতেন্দ্রর বাড়ি বোদা উপজেলার পুটিমারী গ্রামে। ২০১৫ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি তাঁদের বিয়ে হয়।

পরিবার ও পুলিশ সূত্র জানায়, স্ত্রী-সন্তানের মৃত্যুর পর শীতেন্দ্রনাথ ও তাঁর পরিবারের লোকজনের আচরণ ছিল রহস্যজনক। দুর্ঘটনাস্থলে একটি কালো মাইক্রোবাস নিয়ে আশপাশের লোকজন সন্দেহ প্রকাশ করে। মাইক্রোবাসটি কিছুদিন আগে আরো একবার পিছু নেওয়ার কথা জয়ন্তী তাঁর পরিবারকে জানিয়েছিলেন। এসব বিবেচনায় নিয়ে জয়ন্তীর ছোট ভাই পরিমল রায় বোনজামাই ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী পলি রানীসহ চারজনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ১৯ ফেব্রুয়ারি পঞ্চগড় সদর থানার ওসিকে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। থানায় মামলাটি নথিভুক্ত হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) রুহুল ইসলাম ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে তৎপর হন। তিনি নানাভাবে নিশ্চিত হন ‘সড়ক দুর্ঘটনাটি সাজানো। ’ এরপর গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় শীতেন্দ্রনাথকে তাঁর কর্মস্থল তেঁতুলিয়া উপজেলার পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্প অফিসের বাইরে থেকে আটক করা হয়। তিনি এ অফিসের মাঠ তত্ত্বাবধায়ক। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাতে একই উপজেলার ভজনপুর থেকে পুলিশ সেই কালো মাইক্রোবাসের চালক রয়েল রানা (৩০) ও পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন প্রকল্পের ঋণগ্রহীতা আব্দুর রাজ্জাককে (৩৫) গ্রেপ্তার করে।

পুলিশ তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের বরাত দিয়ে জানায়, দুর্ঘটনাস্থল সাড়ে নয় মাইল এলাকায় পৌঁছলে কালো মাইক্রোবাসটি শীতেন্দ্রনাথের মোটরসাইকেলের সামনে আসে। এরপর শীতেন্দ্রনাথ ও অন্যরা মোটরসাইকেল থেকে জয়ন্তীকে জোর করে মাইক্রোবাসে উঠিয়ে নেয়। কোল থেকে ঘুমন্ত শিশুকে কেড়ে নেওয়া হয়। মোটরসাইকেলে পিছু নেন শীতেন্দ্র। রাজ্জাক জয়ন্তীর গলা চেপে ধরে চলন্ত মাইক্রোবাসে বেশ কিছুদূর পর্যন্ত আসে। মৃত্যু নিশ্চিত হওয়ার পর আবার সাড়ে নয় মাইল এলাকায় যায়। এরপর ঘুমন্ত শিশুকে মহাসড়কে শুইয়ে রেখে চলন্ত মাইক্রোবাস দিয়ে সজোরে ধাক্কা দিয়ে হত্যা করা হয়। পরে সবাই মিলে মহাসড়কে স্ত্রী ও সন্তানের লাশ বেশ খানিকটা দূরে এবং মোটরসাইকেল একপাশে অক্ষত অবস্থায় ফেলে রাখে। শীতেন্দ্র অচেতন হওয়ার অভিনয় করে পড়ে থাকেন।

পুলিশ জানায়, চাহিদামতো যৌতুক না পাওয়া, সংসারে ঝগড়া বাধা ও প্রায়ই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র আনতে বলায় শীতেন্দ্র প্রথম স্ত্রীর ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন। এ জন্য তিনি স্ত্রী-সন্তানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। মাত্র এক লাখ টাকার চুক্তিতে তাঁদের হত্যা করান। এ জন্য রয়েল রানা ও রাজ্জাকসহ অন্যদের আগে ১০ হাজার, হত্যাকাণ্ডের দিন ২০ হাজার ও পরে আরো ১০ হাজার টাকা দেন।

পঞ্চগড় সদর থানার ওসি রবিউল হাসান সরকার বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ’ আদালত পরিদর্শক আবু সাইদ সরকার বলেন, ‘গ্রেপ্তারকৃতরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেননি। আদালতের নির্দেশে তারা জেলহাজতে রয়েছেন। ’


মন্তব্য