kalerkantho

বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

বাকসু নেই ১৮ বছর

আবুল বাশার মিরাজ, বাকৃবি   

২৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



১৯৬১ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ নির্বাচন মোটামুটি নিয়মিতই হতো। পরবর্তী সময়ে ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্রসংসদ (বাকসু) নির্বাচন বন্ধ রয়েছে।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো অনুষ্ঠানেই শিক্ষক ও ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলে থাকেন, তাঁরা বাকসুর নির্বাচন চান। কারণ এর ভেতর দিয়ে একদিকে যেমন নেতৃত্বের বিকাশ ঘটে, তেমনি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও উপকৃত হয়।

বাকসুর সর্বশেষ নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আরিফ জাহাঙ্গীর বলেন, দীর্ঘদিন ধরে ছাত্রসংসদ নির্বাচন না হওয়ায় ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে কাউকে কথা বলতে শোনা যায় না। ফলে শিক্ষার্থীরা তাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আবার দীর্ঘ ২৭ বছরে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা হয়েছে মাত্র একবার। বাকৃবির সাধারণ শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক-সামাজিক প্রতিটি সংগঠনের প্রাণের দাবি ছাত্রসংসদ নির্বাচন। বিভিন্ন সময় বাকসু নির্বাচনের দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ হওয়ার পরও তা না হওয়াটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য লজ্জার।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক বিভাগের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মো. নাজমুল হক স্বপন বলেন, ‘আমাদের সময়ে সাংস্কৃতিক দল খুবই সংগঠিত ছিল। বাকসুর বার্ষিকী প্রকাশনাও ছিল অনেক উঁচুমানের।

আজ সেসব স্মৃতির অংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রিয়াশীল যেকোনো ছাত্রসংগঠনেরই ছাত্র ও শিক্ষা অধিকার নিয়ে ভূমিকা থাকবে—এটা সবাই আশা করে। অথচ ছাত্রদের বসবাস ও শিক্ষার দুর্বল অবকাঠামো উন্নয়ন, ভুল শিক্ষানীতি, এসবের বিরুদ্ধে ছাত্রদের সংগঠিত অবস্থান চোখে পড়ে খুবই কম। ’

আবার এখনকার অনেক শিক্ষার্থী জানেই না বাকসু কী। ছাত্রসংসদই বা কী। আবার অনেকেই বলেন, তাঁরা শুনেছেন ছাত্রসংসদের নির্বাচন মানে একটি উৎসব। ক্যাম্পাসের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের বাকসু অফিসে কী হয়, কার স্বার্থে অফিসটি?

ক্যাম্পাসের ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, বছরের পর বছর ধরে এ ছাত্রসংসদের নির্বাচন না হওয়ায় ক্ষোভ রয়েছে তাঁদের। আন্দোলনের মাধ্যমে এ নির্বাচন আদায়ের কথা ভাবছেন তাঁরা। বাকসুর নির্বাচনের জন্য অপেক্ষায় রয়েছেন ছাত্রলীগ, ছাত্রদলসহ বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতারা। বিভিন্ন সময় বললেও প্রশাসন এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

সূত্র মতে, ২০১০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি বাকসু নির্বাচনসংক্রান্ত একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাকসু নির্বাচনের পরিবেশ তদারক ও সব ছাত্রসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করতে বলা হয়। ওই কমিটির প্রধান বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ড. এ কে এম জাকির হোসেন বলেন, ‘তখন আমরা নির্বাচনসংক্রান্ত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরীণ একটি সমস্যার কারণে পরে সেটি আর আলোর মুখ দেখেনি। ’ তবে তিনি মনে করেন, রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে মাত্র দুই মাসেই এ নির্বাচন করা সম্ভব।

বাকৃবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মিয়া মোহাম্মদ রুবেল বলেন, গণতান্ত্রিক উপায়ে ছাত্রসংসদ নির্বাচনের কোনো বিকল্প নেই। দেশের জাতীয় রাজনীতিতে যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই ছাত্রসংসদের নেতা ছিলেন। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া চর্চা মৌলিক চাহিদার মধ্যে পড়ে। কিন্তু বাকসু না থাকায় শিক্ষার্থীরা এসব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ক্যাম্পাসের রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে নিয়ে অবিলম্বে বাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ইয়ার মাহমুদ বলেন, ‘আমরা বাকসু নির্বাচনের জন্য প্রস্তুত আছি। শুধু বাকসুর মাধ্যমে নির্বাচিত নেতারাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের কথা বলতে পারেন। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে বাকসু অবশ্যই প্রয়োজন। ক্যাম্পাসে সব ছাত্রসংগঠনের সহাবস্থান নিশ্চিত করে বাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করার জোর দাবি জানাচ্ছি। ’

ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি তানভীর আহমেদ রিয়াদ বলেন, ‘বাকসু নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। বাকসু নির্বাচনের দাবিতে আমরা আন্দোলনের কথা চিন্তা করছি। শিগগিরই আন্দোলনের ঘোষণা আসতে পারে। ’

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সভাপতি রাফিকুজ্জামান ফরিদ বলেন, ‘বাকসু নির্বাচনের জন্য আমরা সব সময়ই সোচ্চার ছিলাম। আমাদের চলমান ছয় দফা দাবির অন্যতম একটি বাকসু নির্বাচন। অবিলম্বে ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিশ্চিত করে বাকসু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক। ’

দীর্ঘদিন বাকসু নির্বাচন না হওয়ার পরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বিভিন্ন খাত দেখিয়ে টাকা নেওয়া হচ্ছে প্রতি সেমিস্টারেই। শিক্ষার্থীরা বলছে নির্বাচিত ভিপি-জিএসের স্বাক্ষর ছাড়া এ টাকা উত্তোলনের এখতিয়ার নেই। কত টাকা রিজার্ভ রয়েছে, এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের কাছে জানতে চাইলে তিনি পরিমাণ জানেন না বলে স্বীকার করেন। এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্য কোনো খাতে খরচ না হলে তিন কোটি টাকার বেশি রিজার্ভ থাকার কথা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সচ্চিদানন্দ দাস চৌধুরী বলেন, ‘বাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে আমরা আন্তরিক। সবাই চাইলে উপাচার্যের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ’

বাকৃবির উপাচার্য ড. মো. আলী আকবর বলেন, ‘বাকসু নির্বাচনের বিষয়ে ব্যক্তিগতভাবে আমি আন্তরিক। বাকসু না থাকায় প্রশাসন চালাতে অনেক সমস্যা হচ্ছে। তবে বাকসু গঠনের ক্ষেত্র তৈরি করতে ছাত্রদেরই এগিয়ে আসতে হবে। ’


মন্তব্য