kalerkantho


ভালুকার ৫০ শয্যা হাসপাতাল

স্যাকমোরা ডাক্তারিতে ‘পাকা’, দালালে ভরা!

মোখলেছুর রহমান মনির, ভালুকা (ময়মনসিংহ)   

২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



স্যাকমোরা ডাক্তারিতে ‘পাকা’, দালালে ভরা!

রোগীতে ঠাসা ভালুকার ৫০ শয্যা হাসপাতালের মহিলা ওয়ার্ড। ছবিটি গতকাল তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

১৬ ফেব্রুয়ারি, সকাল ১১টা ৫। ময়মনসিংহের ভালুকা ৫০ শয্যার হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেল, হাসপাতাল চত্বর, ট্রমা সেন্টার, ইওসি ও বহির্বিভাগে রোগীদের পাশাপাশি ঘোরাফেরা করছে ভালুকার বিভিন্ন ক্লিনিকের নিয়োজিত অসংখ্য দালাল আর মেডিক্যাল রিপ্রেজেনটেটিভ।

সুদূর গ্রাম থেকে আসা সহজ-সরল কোনো রোগী হাসপাতাল চত্বরে ঢোকামাত্রই তাঁকে ‘ছোঁ-মেরে’ ধরছেন কোনো না কোনো দালাল। তাঁরা রোগীকে সহযোগিতার নামে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে বিভিন্ন পরীক্ষার লম্বা লিস্ট করিয়ে পৌঁছে দিচ্ছেন নির্ধারিত ক্লিনিকে। সূত্র মতে, ভালুকা হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য তো আছেই, সঙ্গে আছে চিকিৎসকের সংকট ও অনুপস্থিতি। গত সোমবার উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সদস্যরা পরিদর্শনে এলে হাসপাতালে ভর্তি রোগীরা জানান, দুপুর ১টা পর্যন্ত কোনো চিকিৎসক ভিজিটে আসেননি। জরুরি বিভাগের একজন চিকিৎসক বলেন, আগে তাঁরা আট ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতেন। এখন চিকিৎসক সংকটের কারণে রাতের শিফটে ১৩ ঘণ্টা ও দিনের শিফটে ১১ ঘণ্টা দায়িত্ব পালন করতে হয় তাঁদের।

বৃহস্পতিবার হাসপাতালের বহির্বিভাগে একজন ইউনানি চিকিৎসক, একজন মেডিক্যাল অফিসার, জরুরি প্রসূতি সেবা কেন্দ্র (ইওসি) ও জরুরি বিভাগে একজন করে মেডিক্যাল অফিসার এবং ট্রমা সেন্টারে একজন কনসালট্যান্ট দায়িত্ব পালন করেন। আর বহির্বিভাগের ইনটিগ্রেটেড ম্যানেজমেন্ট অব চাইল্ড ইলনেস কর্নারে (আইএমসিআই) রোগী দেখছিলেন দুজন স্যাকমো (উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসার)।

হাসপাতালের অফিস সূত্র জানায়, ইউনানি চিকিৎসক বাদে ভালুকা ৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসকের পদ ২২টি।

এর মধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা একজন, কনসালট্যান্ট ১০ জন, আরএমও একজন ও মেডিক্যাল অফিসার ১০ জন। ১০ কনসালট্যান্ট পদের সাতটিই খালি এবং বৃহস্পতিবার ছুটিতে ছিলেন দুজন কনসালট্যান্ট। মেডিক্যাল অফিসারদের মধ্যে প্রেষণে আছেন তিনজন, ছুটিতে একজন, বুধবার রাতে জরুরি বিভাগের দায়িত্ব পালন করে বিশ্রামে আছেন একজন এবং বৃহস্পতিবার বিকেল ও রাতের শিফটে জরুরি বিভাগে দায়িত্ব পালনের অপেক্ষায় আছেন দুজন। অচিরেই প্রশিক্ষণে যাবেন তিন মেডিক্যাল অফিসার। আরএমও পদটি খালি তিন বছর ধরে।

স্থানীয়রা জানান, হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনুপস্থিতির কারণে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে রোগীরা। গাইনি কনসালট্যান্ট নিয়মিত অফিসে না আসায় ইওসিতে আসা কোনো কোনো প্রসূতিকে এখনই অস্ত্রোপচার না করলে সমস্যা হবে—এমন ভয় দেখিয়ে ক্লিনিকে পাঠিয়ে দেন কর্তব্যরতরা। একাধিক স্টাফ জানান, হাসপাতালে চিকিৎসকদের সীমাহীন অনুপস্থিতির কারণে স্যাকমোদের কদর বেড়েছে। অবস্থা এমন যে স্যাকমোরা বহির্বিভাগে চিকিৎসা না দিলে রোগীরা বঞ্চিত হবেন চিকিৎসা থেকে। অথচ স্যাকমোদের কাজ হলো আইএমসিআইয়ে আসা শিশুদের নাম, ঠিকানা, উচ্চতা, ওজনসহ নানা তথ্য রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করে তাদের কনসালট্যান্টের কাছে পাঠানো ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসককে সহযোগিতা করা। তবে তাঁরা রোগীদের সীমিত আকারে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারেন। কিন্তু ভালুকা হাসপাতালের বহির্বিভাগে নিয়মিত রোগীদের চিকিৎসা দেন অধিকাংশ স্যাকমো। লিখেন উচ্চ মাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক। উপদেশ দেন আলট্রাসনোগ্রাম, ইসিজি, এক্স-রে ও রক্তের জটিল পরীক্ষা করানোরও। স্টাফদের অভিমত, দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসকরা সঠিক দায়িত্ব পালন করলে এ অবস্থা হতো না। এ ছাড়া ট্রমা সেন্টারে নার্স ছাড়া কোনো লোকবল নেই। ফলে ধুলোবালি পড়ে নষ্ট হচ্ছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি।

ভালুকা হাসপাতালের বাইরের একাধিক চিকিৎসক জানান, ভালুকা হাসপাতালে কর্তব্যরত বেশির ভাগ স্যাকমো ইসিজি, এক্স-রে, আল্ট্রাসনোগ্রামসহ রক্তের বিভিন্ন জটিল পরীক্ষার জন্য রোগীদের পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এটি তাঁদের এখতিয়ারের বাইরে। একটি ক্লিনিকের মালিক জানান, প্রতিদিন ভালুকা হাসপাতালের গড়ে ১০০ রোগী রোগ নির্ণয়ের জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা করেন বাইরের ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিকে। এর অর্ধেকই স্যাকমোদের পাঠানো। একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিক কালের কণ্ঠকে জানান, বৃহস্পতিবার চিকিৎসক ও দুজন স্যাকমোর পরামর্শে দুজন রোগী তাঁর ক্লিনিকে এসেছেন আলট্রাসনোগ্রাম করাতে। রক্ত বা অন্য পরীক্ষা তো আছেই।

ভালুকা ৫০ শয্যা হাসপাতাল থেকে বদলি হওয়া একজন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা জানান, ভালুকা হাসপাতালের বহির্বিভাগে দায়িত্ব পালন করে কোনো কোনো চিকিৎসক প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা (ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ক্লিনিক থেকে কমিশন) আয় করেন। ফলে হাসপাতালে এসে চিকিৎসা করিয়েই রোগীর টাকা শেষ হয়ে যায়। পরে ওষুধ কেনার টাকা থাকে না। তিনি দায়িত্ব পালনকালে চেষ্টা করেও রোগীদের অপ্রয়োজনের পরীক্ষা দেওয়া থেকে বিরত রাখতে পারেননি অনেক চিকিৎসককেই। পারেননি হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে। বৃহস্পতিবার একাধিক রোগী জানান, তাঁদের বিভিন্ন পরীক্ষার মূল্য দিতে গিয়েই টাকা প্রায় শেষ। এখন ওষুধ কিনতে টাকা কম পড়বে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. একরাম উল্যাহ জানান, হাসপাতালে চিকিৎসকদের অনেকেই ছুটিতে আছেন। তাঁদের অনুপস্থিতি রোগীদের সেবায় কোনো সমস্যা হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘স্যাকমোদের ইনভেস্টিগেশন (টেস্টের পরামর্শ) লেখার বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছি। হাসপাতালে দালালদের দৌরাত্ম্য আগের চেয়ে কমেছে। ’

সদ্য পিআরএলএ যাওয়া ময়মনসিংহের সিভিল সার্জন মোস্তফা কামাল জানান, স্যাকমোদের কাজ হচ্ছে চিকিৎসকদের সহযোগিতা করা। তবে তাঁরা সীমিত আকারে প্রাথমিক চিকিৎসা দিতে পারেন।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল আহসান তালুকদার জানান, ভালুকা হাসপাতালকে দালালমুক্ত করতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে কয়েকজন দালালকে জেল-জরিমানা করা হয়েছে। এখন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চাইলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হবে।

নতুন সিভিল সার্জন খলিলুর রহমান বলেন, ‘ইতিমধ্যে বিভিন্ন হাসপাতালে সারপ্রাইজড ভিজিট দিয়ে এসব বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছি। ’ অভিযোগের বিষয়ে কোনো স্যাকমোর সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।


মন্তব্য