kalerkantho


বাংলাভাষীদের তিন সীমান্তে মিলনমেলা

প্রিয় দেশ ডেস্ক   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বাংলাভাষীদের তিন সীমান্তে মিলনমেলা

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে গতকাল মঙ্গলবার দিনাজপুরের হাকিমপুরের হিলি, যশোরের বেনাপোল ও ফেনীর ছাগলনাইয়ার মোকামিয়া সীমান্তে বসেছিল বাংলাদেশ-ভারতের বাংলাভাষীদের মিলনমেলা। মেলায় মানুষের ঢল নামে।

শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা, কবিতা আবৃত্তি, গান, আলোচনাসহ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালিত হয় দিবসটি। দুই দেশের মানুষ একে অপরকে কাছে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। কালের কণ্ঠ’র প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর :

দিনাজপুর ও রংপুর (আঞ্চলিক) : হিলি সীমান্তের শূন্যরেখায় (নো ম্যান্স ল্যান্ড) দুই বাংলার (বাংলাদেশ-পশ্চিমবঙ্গ) মানুষ এক হয়ে শ্রদ্ধা জানায় শহীদ মিনারে। ভাষাপ্রেমীরা একই মঞ্চে উপস্থিত হন। একুশের মঞ্চ ঘিরে বসে মিলনমেলা। সকাল ১১টার দিকে অনুষ্ঠানে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, দিনাজপুর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শিবলী সাদিক, হাকিমপুর পৌরসভার মেয়র জামিল হোসেন চলন্ত, মুক্তিযোদ্ধার সন্তান কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি জাহিদুল ইসলাম, হিলি আমদানি-রপ্তানিকারক গ্রুপের সভাপতি হারুন-উর-রশিদ, ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার সমাজসেবক নবকুমার দাস, একই জেলার উজ্জীবিত সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক সুরজ কুমার দাস, দীপক ঘোষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তাঁরা শূন্যরেখার পাশে নির্মিত শহীদ মিনারে ফুল দেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয়ের সামনে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে মন্ত্রী মোস্তাফিজ জাতীয় পতাকা ও শিবলী সাদিক কালো পতাকা উত্তোলন করেন। এ ছাড়া দিনব্যাপী নৃত্য, কবিতা আবৃত্তি ও দেশের গান পরিবেশিত হয় অনুষ্ঠানে।

মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লিয়াকত আলীর সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘বায়ান্নতেই বাঙালি বুঝিয়ে দিয়েছেন তাঁরা মাথা নত করার জাতি নন। বায়ান্নর প্রেরণায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। ফলশ্রুতিতে বাংলা মাতৃভাষা দিবস আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে বিস্ময় সৃষ্টিকারী দেশ। ’ হাকিমপুরের ইউএনও মোসা. শুকরিয়া পারভীন বলেন, ভাষার জন্য বাংলাদেশিরাই জীবন দিয়ে প্রমাণ করেছে, তারা সব রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে পারে। পরাধীনতার কাছে হার মানার জাতি বাংলাদেশিরা নন। হাকিমপুর পৌরসভার মেয়র জামিল হোসেন বলেন, দুই বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বাংলা ভাষা যে সেতুবন্ধ রচনা করেছে তাকে কাজে লাগিয়ে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে হবে। জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ভাষার জন্য আজকের এ মিলনমেলা প্রমাণ করেছে দুই বাংলার সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধনে কত আন্তরিক। ’ এ ছাড়া অনুষ্ঠানে ভারত থেকে আমন্ত্রিত অতিথিরা একুশের মঞ্চে কবিতা আবৃত্তিসহ বক্তব্য দেন। নবকুমার দাস জানান, আগামী বছর থেকে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমতি নিয়ে একই স্থানে বড় পরিসরে যৌথভাবে ভাষা দিবসের কর্মসূচি পালনের আশা করছেন তাঁরা।

এদিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের কর্মসূচি উদ্‌যাপনের সুবিধার্থে হিলি স্থলবন্দরে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বন্ধ ছিল গতকাল। আজ বুধবার থেকে বন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি আবারও শুরু হবে।

ফেনী : ছাগলনাইয়া উপজেলার মোকামিয়া ও ভারতের শ্রীনগর সীমান্ত হাটে দুপুরে বসে দুই বাংলার মিলনমেলা। উভয় দেশের শিল্পীদের সাংস্কৃতিক পরিবেশনা উপভোগ করে কয়েক হাজার দর্শক। উভয় পারের স্বজনরা মেতে ওঠে গল্প আর আনন্দ-আড্ডায়। সভা শুরুর আগে অতিথিরা হাটে নির্মিত অস্থায়ী শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা আন্দোলনে  শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। যৌথ বাজার ব্যবস্থাপনা কমিটির আয়োজনে আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ছাগলনাইয়া উপজেলা চেয়ারম্যান মেজবাউল হায়দার চৌধুরী সোহেল। বক্তব্য দেন লোকসভার এমএলএ (সাব্রুম) রীতাকর মজুমদার, ফেনী-১ আসনের সংসদ সদস্য শিরীন আখতার, ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য নিজাম উদ্দিন হাজারী, এমএলএ (ত্রিপুরা) জিতেন চৌধুরী ও প্রভাত চৌধুরী, ফেনী জেলা প্রশাসক মো. আমিন উল আহসান। উপস্থিত ছিলেন শ্রীনগর জেলা শাসক সি কে জামাতিয়া, ফেনীর পুলিশ সুপার রেজাউল হক, ফেনী সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান বিকম, কোয়াংবাড়ি পঞ্চায়েত কমিটির চেয়ারম্যান বাবুল সেন।

অনুষ্ঠানে রীতাকর মজুমদার বলেন, এ সীমান্ত হাটে যে মিলনমেলা শুরু হয়েছে তা দুই দেশের বন্ধনকে আরো দৃঢ় করবে। জেলা প্রশাসক আমিন উল আহসান বলেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে। পরে তিন ঘণ্টাব্যাপী সাংস্কৃতিক পর্বে বাংলাদেশের পক্ষে ফেনী শিল্পকলা একাডেমীর শিল্পীরা গান, আবৃত্তি, নৃত্য পরিবেশন করে। মঞ্চনাটক ‘সূর্যসন্তানদের বাবা’ পরিবেশন করে ফেনী থিয়েটার। ভারতের পক্ষে গান পরিবেশন করেন ত্রিপুরার প্রখ্যাত শিল্পী অমর ঘোষ, সুবর্ণা দেবনাথসহ স্থানীয় শিল্পীরা। নৃত্য পরিবেশন করেন বিলোনীয়া সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, ত্রিপুরা শিল্পী গোষ্ঠী ও সাব্রুমের শিল্পীরা। অনুষ্ঠানটি ফেনী ও ত্রিপুরার সাংস্কৃতিক কর্মীদেরও মিলনমেলায় পরিণত হয়।

বেনাপোল (যশোর) : ভাষার টানে দুই বাংলার হাজার হাজার মানুষ গতকাল মিলেছিল যশোরের বেনাপোল চেকপোস্টের শূন্যরেখা এলাকায়। ভৌগোলিক সীমারেখা ভুলে সকালে দলে দলে আসে তারা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মিলনমেলায়। ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি আমি কি ভুলিতে পারি’—এই স্লোগানে ভাষাশহীদদের স্মরণে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা মিলিত হয়। অস্থায়ী শহীদ বেদিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সাধারণ মানুষসহ রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যবসায়িক ও সাংস্কৃতিক দল ও সরকারি কর্মকর্তারা। বেনাপোল ও ভারতের বনগাঁও পৌরসভা যৌথভাবে এ মিলনমেলার আয়োজন করে। প্রথমবারের মতো ভাষাপ্রেমীরা পূর্ব বাংলার মানুষের রক্ত পশ্চিম বাংলার মানুষের জন্য এবং পশ্চিম বাংলার মানুষের রক্ত পূর্ব বাংলার জন্য দান করেন।

অস্থায়ী শহীদ বেদিতে সকালে প্রথম ফুল দিয়ে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের খাদ্যমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক, তথ্য ও প্রযুক্তি দপ্তরের মন্ত্রী ব্রাত্য বসু, লোকসভা সদস্য মমতা ঠাকুর, বিধায়ক বিশ্বজিত দাস, বিধায়ক সুরজিত কুমার বিশ্বাস, বনগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান শংকর আঢ্য, সাহিত্যিক শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য পীযূষ কান্তি ভট্টাচার্য্য, যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহিন চাকলাদার, বিজিবির অধিনায়ক কর্নেল জাহাঙ্গীর হোসেন ও পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বেনাপোল পৌরসভার মেয়র আশরাফুল আলম লিটন। কণ্ঠশিল্পী খুরশিদ আলম, রথীন্দ্রনাথ রায়, কবি আসাদ চৌধুরী এবং উভয় দেশের বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনগুলো এতে অংশ নেয়। দুই দেশের শিল্পীরা ভাষাশহীদদের স্মরণে গান বাংলার জয়গান। পশ্চিমবঙ্গের অতিথিরা বলেন, ‘আমরাও বাংলা ভাষায় কথা বলি। তাই বাংলাদেশের মানুষের জন্য আমাদের প্রাণ কাঁদে। তাই বারবার ছুটে আসি বাঙালি বাংলাভাষী মানুষের কাছে। ’ মিলনমেলা উপলক্ষে সীমান্ত এলাকা নানা রঙের ফেস্টুন, ব্যানার, প্ল্যাকার্ড আর ফুল দিয়ে সাজানো হয়। দুই দেশের মানুষ একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়ে। ফুলের পাপড়ি ছিটিয়ে মিষ্টি দিয়ে বরণ করে নেওয়া হয় তাদের। ফুলের মালা ও জাতীয় পতাকা বিনিময় করা হয়। বিজিবি বিএসএফকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানায়। এরপর দুই দেশের জাতীয় পতাকা উড়িয়ে হাজার হাজার ভাষাপ্রেমী উদ্‌যাপন করে দিবসটি।

অনুষ্ঠানে নেওয়া হয় নজিরবিহীন নিরাপত্তা। বেনাপোল ও ভারতের পেট্রাপোল চেকপোস্টে ডগ স্কোয়াডসহ দুই সীমান্তে বিজিবি ও বিএসএফ অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে।


মন্তব্য