kalerkantho


সুনামগঞ্জ

হাঁটুজল ভেঙে ফুলেল শ্রদ্ধা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে মঙ্গলবার সকালে এসে দেখি হাঁটুজল। ফুল হাতে প্রভাতফেরিতে আসা সোনামণিরা জল দেখে ভড়কে যায়।

দ্রুত শাবল এনে দেয়াল ফুটো করে পানি বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি আমরা। এভাবেই একুশের প্রভাতফেরি শেষে সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানায় সাধারণ মানুষ। বলছিলেন সংস্কৃতিকর্মী রাজীব।

সুনামগঞ্জ ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি রইসুজ্জামান বলেন, সকালে ফুল দিতে এসে দেখি শহীদ মিনার বেদির চারদিকে  থইথই পানি। দ্রুত আমরা পানি অপসারণে নামি। ধীরে ধীরে পানি সরে যাওয়ায় জনতা শহীদ বেদিতে তাদের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করেন। তিনি বলেন, এখান থেকেই আমরা প্রতিবাদের ভাষা রপ্ত করেছি। মানবতার কথা শিখেছি। অশুভ শক্তিকে প্রতিরোধের ডাক দিই এখান থেকেই।

কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে আমাদের চেতনার বাতিঘর শহীদ মিনারকে অবহেলায় রেখে সংশ্লিষ্টরা অন্যত্র সরানোর ষড়যন্ত্র করছে।

মঙ্গলবার সকালে এভাবেই শ্রদ্ধা-ভালোবাসা আর আবেগে প্রায় দুই শতাধিক সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক দলের নেতাসহ সাধারণ জনতা সুনামগঞ্জে অবহেলার শিকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শহীদদের শ্রদ্ধা জানান। অবহেলার শহীদ মিনার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসার ফুলে ফুলে ভরিয়ে দেন জনতা।

ভাষাশহীদদের স্মরণ করতে এসে সুনামগঞ্জ জেলা সিপিবির সভাপতি শিক্ষাবিদ চিত্তরঞ্জন তালুকদার বলেন, চারদিকে সরকারি জায়গা থাকলেও সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সম্প্রসারণ না করে একটি মহল অন্যত্র সরানোর ষড়যন্ত্র করছে। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ৪৬ বছরের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারকে অস্বীকার করে নিজেদের মধ্যে ভূমি দখলের লড়াইয়ে নেমেছে। তাই কৌশলে শহীদ মিনারকে অবহেলায় রেখে সংস্কার না করে পরিত্যক্ত দেখিয়ে দখলের ষড়যন্ত্র চলছে। এই ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদে আজ হাজারো জনতা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শহীদ মিনারকে ফুলে ফুলে ভরিয়ে দিয়েছেন। তিনি জানান, প্রায় দুই শতাধিক সংগঠন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে এসে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। শহীদ মিনার নিয়ে ষড়যন্ত্রের প্রতিবাদেই শ্রদ্ধায় মানুষের ঢল নেমেছে বলে জানান তিনি।

সকালে শ্রদ্ধা জানাতে আসা মুক্তিযোদ্ধা বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রতি এমন অবহেলাই প্রমাণ করে এটাকে নিয়ে কেমন ষড়যন্ত্র চলছে। তিনি সবাইকে আবেগ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এই শহীদ মিনার সংস্কার ও সম্প্রসারণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, মঙ্গলবার ভোরেই বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা থেকে সাধারণ মানুষ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিকর্মীসহ বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের নেতারা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। রাতে বৃষ্টি হওয়ায় শহীদ মিনার চত্বরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। তবে রাতে একুশের প্রথম প্রহরে জেলা প্রশাসনসহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান শ্রদ্ধা জানায়।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী, খেলাঘর আসর, কমিউনিস্ট পার্টি, ছাত্র ইউনিয়ন, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিপরিষদসহ বিভিন্ন সংগঠন প্রথম প্রহরে এবং অনেকে প্রভাতফেরি করে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছে। তারা সকালে জলাবদ্ধ শহীদ মিনার দেখে ক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিশেষ করে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা জানাতে এসে বিপাকে পড়ে।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধা জনতা নিজ হাতে ডিএস রোডে সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। এরপর থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হিসেবে সর্বস্তরের জনতা এটিকে অধিকার আদায়ের কেন্দ্রে পরিণত করেছেন। তাঁরা অশুভ শক্তি প্রতিরোধে এই শহীদ মিনারকেই অধিকার আদায়ের কেন্দ্র হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করার পাশাপাশি মানবিক ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ প্রতিষ্ঠার কথাও বলছেন।


মন্তব্য