kalerkantho


প্রাণঘাতী মহাসড়ক

এনায়েত হোসেন মিঠু, মিরসরাই (চট্টগ্রাম)   

২২ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



প্রাণঘাতী মহাসড়ক

ঢাকা-টেকনাফ মহাসড়কে কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৪৪০ কিলোমিটারে গত সাত বছরে (২০১০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০১৭ সালের ১ জানুয়ারি পর্যন্ত) ৬১৬টি দুর্ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ৬০০ জনের মৃত্যু ও আহত হয়েছে আরো ৭৮৮ জন।

হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের আওতায় থাকা বিভিন্ন ফাঁড়ি ও থানার দেওয়া তথ্য এটি। অবশ্য বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী এ হিসাব দ্বিগুণ। হাসপাতাল, খবরের কাগজে প্রকাশিত সংবাদ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে সাত শর বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় অন্তত এক হাজারেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আহতের সংখ্যা দুই হাজারের কম না। আহতদের মধ্যে অনেকে পঙ্গু হয়েছেন। কেউ কেউ অক্ষম হয়ে বর্তমানে অসহায় জীবন যাপন করছেন। এসব হতাহতের বেশির ভাগ রাস্তা পারাপারের সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়। কিছু কিছু দুর্ঘটনা সংঘটিত হয় লেন না মেনে উল্টো পথে যান চলাচল করার কারণে। পুলিশের তথ্যের সঙ্গে বাস্তব চিত্রের গরমিল থাকার বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনায় নিহতদের পরিবার যানবাহন মালিকদের সঙ্গে অর্থের বিনিময়ে সমঝোতা করেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আত্মীয়স্বজন ও স্থানীয়রা হতাহতকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর মারা গেলেও পুলিশকে এ তথ্য জানায় না। এ কারণে থানা বা ফাঁড়িতে মামলা হয় না। এ মহাসড়কে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ হাইওয়ে ফাঁড়ির দেওয়া তথ্য অনুয়ায়ী, বিগত দিনের তুলনায় চলতি বছর জানুয়ারি থেকে দুর্ঘটনা কমেছে। ফাঁড়ির আওতাধীন এলাকায় এ মাসে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা মাত্র দুটি। এসব দুর্ঘটনায় মাত্র একজন পথচারী নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে আরো এক পথচারী। এ ছাড়া গত ১২ ও ১৩ ফেব্রুয়ারি পৃথক তিনটি দুর্ঘটনায় দুই পুরুষ ও এক নারী নিহত হয়েছে।

ওই ফাঁড়ির ইনচার্জ ফরিদ উদ্দিন বলেন, ‘ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক চার লেনে সম্প্রসারণ করার পর থেকে হাইওয়ে পুলিশ দুর্ঘটনা এড়াতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। যানবাহনের গতিরোধ, কমিউনিটি পুলিশিং, চালক, সহকারী, যাত্রী ও পথচারীদের সচেতন করা হচ্ছে। এ কারণে গত কয়েক মাসে দুর্ঘটনা অনেকটা কমে এসেছে। ’ সীতাকুণ্ডের বারআউলিয়া হাইওয়ে থানা এলাকায় চলতি বছর জানুয়ারিতে সড়ক দুর্ঘটনার সংখ্যা পাঁচটি। এসব দুর্ঘটনায় পাঁচজন নিহত হয়েছে। পাশের কুমিরা হাইওয়ে থানা এলাকায় দুর্ঘটনার সংখ্যা দুটি। এতে দুজন নিহত হয়েছে। এদের সবাই পথচারী। চলতি মাসে এখানে দুর্ঘটনা ঘটেনি।

বারআউলিয়া হাইওয়ে থানার ওসি ছালেহ আহম্মদ পাঠান বলেন, ‘মহাসড়কে দুর্ঘটনার বেশ কিছু কারণ রয়েছে। এর মধ্যে যানবাহনের বেপরোয়া গতি, চালক সহকারী ও পথচারীদের অসচেতনতা উল্লেখযোগ্য। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে মহাসড়কে দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে একটি নকশা তৈরি করা হয়েছে। ’

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের দুর্ঘটনা অনুসন্ধান ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক এ কে এম ওবায়দুর রহমান বলেন, ‘মহাসড়কে দুর্ঘটনার প্রধান কারণ চালক ও পথচারীদের অসাবধানতা ও বেপরোয়া গতিতে যান চলাচল। এ দুটি প্রবণতা বন্ধ করতে প্রথমত দরকার সচেতনতা। ’

হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, মহাসড়কে দুর্ঘটনা এড়ানোর লক্ষ্যে ২০০৭ সাল থেকে একটি সমীক্ষা চালানো হয়েছে। এ সমীক্ষায় কুমিল্লা অঞ্চলের ১০৮টি এলাকাকে কালোচিহ্নিত (ব্ল্যাকস্পট) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব স্পটে দুর্ঘটনা তুলনামূলক কমিয়ে আনার জন্য বেশ কিছু পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ক্লোজসার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপন। গাড়ির গতি ও সংখ্যা নির্ণায়ক রাডার স্পিডগান স্থাপন।

এ বিষয়ে হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের সুপার (এসপি) রেজাউল করিম বলেন, ‘নিরাপত্তার স্বার্থে মহাসড়কে সিসি ক্যামেরা বসাতে হবে। যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণের জন্য রাডার স্পিডগান স্থাপন করতে হবে। তবে এটা ব্যয়বহুল পরিকল্পনা। ’ এ পরিকল্পনা কি বাস্তবায়ন হবে? প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। আপাতত সড়কের পাশের ফুয়েল স্টেশন ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা মালিকদের সিসি ক্যামেরা স্থাপনে আমরা উদ্বুদ্ধ করছি। চালকদের প্রশিক্ষণ ও জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে উদ্যোগ নিয়েছি। ’


মন্তব্য