kalerkantho


সুনামগঞ্জে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই

কমিটিতে বিতর্কিতরা

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা নন বা এ বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে, এমনকি যিনি মুক্তিযোদ্ধা কি না তা যাচাই-বাছাই চলছে এমন একাধিক ব্যক্তিও রয়েছেন কমিটিতে।

এ অবস্থায় যাঁরা নিজেরাই বিতর্কিত, তাঁদের দিয়ে কতটা স্বচ্ছতার সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাইয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করা যাবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, গত ২১ জানুয়ারি থেকে সুনামগঞ্জের ১১ উপজেলায় যাচাই-বাছাই কার্যক্রম চলছে। এ কাজে নিয়োজিত কিছু মুক্তিযোদ্ধা অনিয়মের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন—এমন একাধিক লিখিত অভিযোগও পাওয়া গেছে। সদর ও দক্ষিণ উপজেলা কমিটিতে সভাপতি হয়েছেন হাজী নূরুল মোমেন। তিনি জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সভাপতি হলেও এই এলাকার মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে তাঁর স্পষ্ট ধারণা নেই। তিনি অন্য জেলার বাসিন্দা এবং যুদ্ধও করেছেন অন্য জেলায়। তা ছাড়া জেলা কাউন্সিলের প্রতিনিধি হিসেবে এ কমিটির অন্য সদস্য মতিন মিয়া মুক্তিযোদ্ধা নন—এমন অভিযোগও রয়েছে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা কি না, বিষয়টি যাচাই-বাছাই চলছে। এ কমিটির আরেক সদস্য মো. আব্দুল মজিদ মুক্তিযোদ্ধা হলেও তাঁর যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা নেই।

শেষ ব্যাচের এ মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধক্ষেত্রে আসতে আসতে দেশ স্বাধীন হয়ে যায়। ফলে সাক্ষাৎকার নিতে গিয়ে তাঁর সমস্যা হচ্ছে।

তা ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা নন—এমন অভিযোগ রয়েছে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলা কমিটির সদস্য আপ্তাব উদ্দিনের বিরুদ্ধে। তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে মামলাও বিচারাধীন। আবদুল হেকিমের বিরুদ্ধেও মুক্তিযোদ্ধা নন—এমন বিতর্ক রয়েছে। কমিটির নজরুল ইসলামকে নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। তিনি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা না হলেও ভাতা উত্তোলন করছেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার।

ছাতক উপজেলা কমিটির সদস্য জিতু মিয়া ও আতাউর রহমান তোতা মিয়ার বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা নন—এমন অভিযোগ রয়েছে। জামালগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে এলাকার ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধা সম্প্রতি লিখিত অভিযোগ জানিয়েছেন। এ কমিটির সফর আলীর বিরুদ্ধেও সমালোচনা রয়েছে। শাল্লা উপজেলা কমিটির সদস্য হিসেবে মুজিবুর রহমান চৌধুরীর বিরুদ্ধে নানা বিতর্কিত কাজে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে।

তাহিরপুর উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা রমিজ উদ্দিন আহমদ মারা গেলে আইন লঙ্ঘন করে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন আব্দুস শহীদ নামের আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা। দোয়ারাবাজার উপজেলা কমিটির সদস্য বিনোদ রঞ্জন তালুকদার মুক্তিযোদ্ধা নন—এমন বিতর্ক রয়েছে। এ উপজেলা কমিটির আরেক সদস্য আতাউর রহমানের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে।

শাল্লা উপজেলা কমিটির সদস্য তাজুল ইসলামের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। ধর্মপাশা উপজেলা কমিটির সদস্য রমিজ উদ্দিন আহমদ মারা গেছেন। তাঁর স্থলে নীতিবহির্ভূতভাবে মতিলাল দাস নামের আরেকজনকে সদস্য করা হয়েছে।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা কমিটির সদস্য আতাউর রহমান মুক্তিযোদ্ধা নন—এমন বিতর্ক আছে। একই কমিটির রবীন্দ্র কুমারের বিরুদ্ধেও একই অভিযোগ রয়েছে। দোয়ারাবাজার উপজেলার যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য আবদুর রশিদকে নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কমিটির বেশির ভাগ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় যাচাই-বাছাই কমিটিতে তাদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি এ কমিটিকে প্রশ্নবিদ্ধ ও অসচ্ছ করে তুলেছে বলে মনে করেন মুক্তিযোদ্ধারা।

সুনামগঞ্জের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখক আইনজীবী বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন, যাচাই-বাছাই কমিটিতে এমন অনেক সদস্য আছেন, যাঁরা নিজেরাই যাচাই-বাছাইয়ের আওতাধীন। তাঁরা কমিটির সদস্য হওয়ায় প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে। তা ছাড়া যুদ্ধ এলাকার অভিজ্ঞতা নেই, সাক্ষাৎকার নেওয়া-সংক্রান্ত কোনো ধারণা নেই—এমন অনেকে সদস্য হওয়ায় যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় সমস্যা হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়ে কমিটি করার আগে সব কিছু ভাবা উচিত ছিল।

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি পরিষদের আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান বলেন, যাচাই-বাছাই চলছে এমন এক মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেটে ‘এমএফ’ (মুজাহিদ ফাইটার) লেখা। এই এমএফের ধারণা নেই কমিটির সদস্যের। তাঁরা প্রতিনিধিদের প্রশ্ন করে বিভ্রান্ত করছেন। বিতর্কের বাইরের প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই কমিটিতে স্থান দেওয়া হলে এবং যুদ্ধ এলাকার স্পষ্ট ধারণা আছে এমন মুক্তিযোদ্ধাদের কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হলে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া সুন্দরভাবে সম্পন্ন হতো। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও যাচাই-বাছাই কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইশরাত জাহান বলেন, ‘কমিটি হয়েছে মন্ত্রণালয় থেকে। এতে আমাদের কোনো ধারণা নেই। তবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে তারা যাতে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া প্রভাবিত করতে না পারেন সেদিকে আমরা সচেতন আছি। ’

এদিকে গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানিয়েছেন, জেলার সাদুল্যাপুর উপজেলার অনলাইন ও হার্ডলাইনে আবেদন করা, প্রকৃত ও অভিযুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের যাচাই-বাছাই শনিবার শেষ হওয়ার সিদ্ধান্ত থাকলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশে তা স্থগিত করেছে স্থানীয় যাচাই-বাছাই কমিটি। এ বিষয়ে সাদুল্যাপুরের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রশিদ আজমী ও আনছার আলী জানান, উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই কমিটির বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়েছিল। যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যসচিব ছাড়া ওই কমিটির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকায় উচ্চ আদালতে রিটটি করা হয়, যা শুনানির জন্য অপেক্ষায় রয়েছে। রিটটি শুনানি না হওয়া পর্যন্ত যাচাই-বাছাইসংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম স্থগিত রাখার জন্য শনিবার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে আবেদন করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সাদুল্যাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান হাবিব জানান, মুক্তিযোদ্ধা যাচাই-বাছাই স্থগিত করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ পাওয়া গেলে যাচাই-বাছাই শুরু করা হবে।


মন্তব্য