kalerkantho


পাল আমলের মন্দিরের খোঁজ

বগুড়ার মহাস্থানগড়ে খনন

লিমন বাসার, বগুড়া   

২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



পাল আমলের মন্দিরের খোঁজ

বগুড়ার মহাস্থানগড়ে বৈরাগীর ভিটায় চলছে খননকাজ। ছবি : ঠাণ্ডা আজাদ

হাজার বছরের প্রাচীন নিদর্শন নিয়ে আবার জেগে উঠছে বগুড়ার মহাস্থানগড়। সার্ক সাংস্কৃতিক রাজধানী হওয়ায় গড়কে নতুন করে উন্মোচনের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

এখন থেকে খনন করে প্রাচীন যেসব নিদর্শন বের হবে সেসব দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

ইতিমধ্যে আড়াই হাজার বছরের প্রাচীন এ দুর্গনগরীর বৈরাগীর ভিটায় খননকালে পাল আমলের মন্দিরের সন্ধান মিলেছে। আরো মিলেছে মুসলিম শাসন আমলের শুরু ও পাল আমলের শেষ দিকের বেশ কিছু নিদর্শন। খননে বেরিয়ে এসেছে ৯০০ বছরেরও প্রাচীন আবাসস্থলের চিহ্ন। সেই সঙ্গে গৃহস্থালির কাজে ব্যবহার্য কিছু সামগ্রীও পাওয়া গেছে।

মহাস্থান সূত্র জানায়, গত ২০ ডিসেম্বর থেকে শুরু করে খননকাজ দুই মাস পার হয়েছে। আরো এক মাস চলবে। ইতিমধ্যে সেখানে কয়েকটি প্রাচীন দেয়ালের সন্ধান মিলেছে। তবে বিস্তারিত জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন।

প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বেশ কয়েক শতাব্দী ধরে সেখানে জনবসতির অবস্থান ছিল। এর আগে বৈরাগীভিটার দক্ষিণে ফ্রান্সের ভিটায় খনন করে গুপ্ত আমলের শেষ দিকে তৈরি ইটের দেয়ালের সন্ধান মেলে। সেখান থেকে আরো কাচের গুটিকা, মাছ ধরার জালে ব্যবহারের জন্য তৈরি পোড়া মাটির বল, ফুল অঙ্কিত ও পিরামিড আকারের নকশা করা ইট উদ্ধার করা হয়। যেগুলো যিশুখ্রিস্টের জন্মের ৬০০ বছর আগের হলেও তবে মৌর্য আমলে ব্যবহার করা হয়।

মহাস্থান দুর্গনগরীর মাঝামাঝি এলাকা লইয়েরকুড়ি বা ফ্রান্স মাঠ নামে পরিচিত ভিটার উত্তর-পশ্চিম কোণে এবং মহাস্থান জাদুঘর থেকে দক্ষিণ দিকে কয়েক শ গজ দূরে অবস্থিত বৈরাগীর ভিটা। এখানে প্রতিদিন সকাল সাড়ে ৬টা থেকে দুপুরে ২টা পর্যন্ত খনন চলছে।

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের তথ্য অনুসারে, প্রাচীন বাংলার পুণ্ড্রবর্ধনের ধ্বংসাবশেষ প্রথম আবিষ্কৃত হয় ১৮০৮ সালে। এটি আবিষ্কার করেন বুচানন হ্যামিল্টন নামক একজন প্রত্নতাত্ত্বিক। এরপর ১৮৭৯ সালে যুক্তরাজ্যের আলেকজান্ডার কানিংহাম আবার একে শনাক্ত করেন। এর পর থেকে মহাস্থানগড় খনন অনেক দিন স্থগিত ছিল। ১৯২৮-২৯ সালে ব্রিটিশ সরকার খননকাজ শুরু করে এবং ১৯৩১ সালে গড়কে প্রাচীন নগরী হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ১৯৬১ সালে পাকিস্তান সরকার খনন শুরু করে। সর্বশেষ বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৮৮ সাল থেকে বাংলাদেশ ও ফ্রান্স সরকারের যৌথ উদ্যোগে খনন হয়। বর্তমানে বেশির ভাগ খননকাজ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ নিজস্ব অর্থায়নে করছে। মহাস্থান জাদুঘরের তত্ত্বাবধায়ক (কাস্টডিয়ান) মজিবর রহমান বলেন, ‘বৈরাগীর ভিটায় প্রত্নতাত্ত্বিক খনন এটি দ্বিতীয় দফার। পাকিস্তান আমলে এখানে প্রথম খনন করা হয়। ভারতীয় প্রত্নতত্ত্ববিদ কে এন দিক্ষিত সেই সময় দুটি প্রাচীন মন্দিরের সন্ধান পান। তবে তিনি বিস্তারিত তথ্য পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারকে দেননি। এরপর সেখানে আর কোনো খননও করা হয়নি। ’

খননকাজে নিযুক্ত ছয় সদস্যের দলের মাঠ পরিচালক হিসেবে রয়েছেন প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের রাজশাহী বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিচালক নাহিদ সুলতানা। তিনি বলেন, ‘এত দিন মহাস্থানগড়ে যেসব খননকাজ চলেছে, গবেষণা শেষে সেসব স্থান মাটি দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। এ কারণে দর্শনার্থীরা মাটির নিচে এই ঘুমন্ত নগরীর কিছু দেখতে পেতেন না। ওপর থেকে এটি বোঝারও কোনো উপাই নেই। এ কারণে সরকারের সিদ্ধান্তে এখন থেকে প্রতিটি খনন শেষে স্থানটি বিশেষভাবে সংরক্ষণ করে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে এমন করা হচ্ছে। এটি করা হলে মহাস্থান ফিরে পাবে হাজার বছর আগের সেই রূপ। ’


মন্তব্য