kalerkantho


নড়াইল

মিনার ভাঙার ষড়যন্ত্র

নড়াইল প্রতিনিধি   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মিনার ভাঙার ষড়যন্ত্র

নড়াইলের নড়াগাতির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলার অপতত্পরতা চলছে। ছবি : কালের কণ্ঠ

নড়াইলের নড়াগাতি থানার প্রধান শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত শহীদ মিনারটি নিয়ে এলাকাবাসীর দুশ্চিন্তা কাটছে না। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমানে সেখানে আদালত ১৪৪ ধারা জারি করেছেন। অবশ্য শহীদ মিনারটি ভাঙা হবে না বলে আশ্বস্ত করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

নড়াইল-গোপালগঞ্জ সীমান্তে নড়াইলের কালিয়ায় ছয়টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নড়াগাতি থানা। ইউনিয়ন পরিষদের জায়গায় নির্মিত শহীদ মিনারটি ভেঙে একটি মহল এখানে দোকান নির্মাণের পাঁয়তারা করছে। এর আগে ১৯৯৮ সালে নড়াগাতি থানা ঘোষিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারসংশ্লিষ্ট জয়নগর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে থানার কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। পরে ২০০৯ সালে স্থানীয় উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর উদ্যোগে নড়াগাতি বাজারে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে নড়াগাতি থানার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মিত হয়। এর আগে প্রায় ২৫ বছর ধরে এলাকার মানুষ কলাগাছ দিয়ে শহীদ মিনার বানিয়ে সেখানে ফুল দিত। ক্রমে এলাকাবাসীর শ্রদ্ধা নিবেদনের একমাত্র জায়গায় পরিণত হয় এটি। এলাকার সব সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডও হয় একে কেন্দ্র করেই।

নড়াগাতি থানার উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি চৌধুরী হিরক পাশা বলেন, ‘এ এলাকায় কোনো শহীদ মিনার না থাকায় আমরা নিজেরা চাঁদা তুলে শহীদ মিনারটি তৈরি করি। এলাকার প্রগতিশীল মানুষজন এ শহীদ মিনার তৈরিতে সহায়তা করে। ’

কালিয়া উপজেলা কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ইউনিয়ন পরিষদ ভবনটি জরাজীর্ণ হয়ে যাওয়ায় তা নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করা হয়। গত বছরের ১৫ ফেব্রুয়ারি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার আদেশে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম নিলামে কিনে তা ভেঙে বিক্রি করেন। একই সময়ে এলাকার একজন ভূমি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশে ওই ছাত্রলীগ নেতাসহ স্থানীয় আরো কয়েক যুবক শহীদ মিনারসহ বাজারের ওই স্থানকে দোকান নির্মাণের জন্য ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে উপজেলা ভূমি অফিস থেকে বন্দোবস্ত নেন।

নড়াগাতি থানা যুবলীগের সভাপতি সোহরাব হোসেন বলেন, ‘সরকারি দলের সমর্থক হয়েও ভূমি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগসাজশে দলের কিছু লোকের সমর্থনে শহীদ মিনারটি ভেঙে ফেলার চক্রান্ত চললেও আমরা কিছুই করতে পারছি না। ’

জয়নগর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি মো. ওমর চৌধুরী বলেন, ‘আমরা স্থানীয় এমপির সমর্থনপুষ্ট ছাত্রলীগ নেতা আলমের সঙ্গে পেরে উঠছি না। দুই বছর ধরে এই শহীদ মিনার রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছি। এখানে শহীদ মিনার ভেঙে স্থাপনা তৈরি করা হলে তা এলাকার জনগণ প্রতিহত করবে। ইতিমধ্যে শহীদ মিনারটি আংশিক ভেঙে ফেলা হয়েছে। ’

উদীচী নড়াগাতি থানার সভাপতি আবদুস সাত্তার বলেন, ‘উদীচী এ স্থানে প্রতিবছর বইমেলা থেকে শুরু করে সব জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠান করে থাকে। এ বছর ১৪৪ ধারা জারি থাকায় আমাদের মহান একুশে পালন করতে হবে আতঙ্কের মধ্যে। ’

নড়াগাতি থানা আওয়ামী লীগ নেতা জাহান চৌধুরী বলেন, ‘এখানে দল-মত নির্বিশেষে সবাই জাতীয় অনুষ্ঠানে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে। এটি এলাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। আমরা যেকোনো মূল্যে এটি রক্ষা করব। ’ জয়নগর ইউপি চেয়ারম্যান আলাউদ্দিন চৌধুরী জানান, ইউনিয়ন পরিষদের জায়গা দখলের পাঁয়তারা চলছে। সরকারি কিছু কর্মকর্তা টাকা খেয়ে বন্দোবস্ত দিচ্ছে। এলাকায় এটা নিয়ে উত্তেজনা বিরাজ করছে।

তবে নড়াগাতি থানা ছাত্রলীগের সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের যে অংশটি শহীদ মিনারের নামে কথা বলছে, তারাও মূলত টাকা খাওয়ার জন্যই ঘুরছে। আমরা বন্দোবস্ত নিলেও তারা চাচ্ছে প্রতিটি দোকান বরাদ্দ থেকে তাদের একটি অংশ দিতে হবে। আমরা তাতে রাজি না হওয়ায় তারা ক্ষেপেছে। তবে শহীদ মিনারের কোনো ক্ষতি হবে না। ’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, ইউনিয়ন পরিষদটি জরাজীর্ণ হয়ে পড়ায় নিলাম করে ভেঙে ফেলা হয়েছে। বাজারের ভেতর হওয়ায় শহীদ মিনারের জন্য তিন ফুট জায়গা রেখে বাকিটুকু বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। শহীদ মিনার ভেঙে ফেলার প্রশ্নই ওঠে না। ইউপি চেয়ারম্যানের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই স্থানে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। সেখানে শান্তিশৃঙ্খলার অবনতি হলে সব ধরনের কর্মকাণ্ডই বন্ধ থাকবে।

নড়াইলের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কাজী মাহবুবুর রশীদ বলেন, ‘সরকারি খাসজমি হিসেবে উপজেলা ভূমি অফিস বন্দোবস্ত দিচ্ছে। তবে আমি কালিয়া ইউএনওর সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছি, শহীদ মিনার ভাঙা হবে না, সেটা যেখানে আছে সেখানেই থাকবে। ’


মন্তব্য