kalerkantho

নাঙ্গলকোট

আবাদি জমি নষ্ট

আবদুর রহমান, কুমিল্লা (দক্ষিণ)   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



আবাদি জমি নষ্ট

কুমিল্লার নাঙ্গলকোট উপজেলার মৌকরা-তিলিপ গ্রামের কৃষি জমিতে তৈরি হচ্ছে ইটভাটা। ছবি : কালের কণ্ঠ

কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে এবার আবাদি কৃষিজমিতেই বিশাল এলাকা নিয়ে ইটভাটা নির্মিত হচ্ছে। প্রায় দেড় মাস ধরে উপজেলার মৌকরা-তিলিপ গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে ওই ইটভাটা গড়ে তোলা হচ্ছে। এর নির্মাণকাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে। প্রতিদিন অর্ধশতাধিক শ্রমিক ওই ইটভাটা নির্মাণকাজে ব্যস্ত সময় পার করছে। বিষয়টি এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরে বারবার জানানো হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, আবাদি কৃষিজমির ওপর এভাবে লোকালয়ে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি নির্মিতব্য ওই ইটভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য এরই মধ্যে সব প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছে। ওই ভাটার পাশের বিভিন্ন আবাদি ও ফসলি কৃষিজমির টপ সয়েল (জমির ওপরিভাগের উর্বর মাটি) কেটে নিয়ে মজুদ করা হয়েছে ইট প্রস্তুতের জন্য। উপজেলার মৌকরা-তিলিপ গ্রামের প্রায় ৩০ একর ফসলি জমির ওপর আজিজ ব্রিকস নামের ওই ইটভাটাটি নির্মাণ করছেন স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারের ইটভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩ অনুযায়ী নিষিদ্ধ এলাকা (বিশেষ করে আবাসিক, সংরক্ষিত ও বাণিজ্যিক এলাকা, পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা, কৃষি আবাদি জমি, বন ও বাগানকে বোঝানো হয়েছে) থেকে কমপক্ষে এক কিলোমিটার ও এলজিইডি নির্মিত সড়কের আধা কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। বিদ্যমান আইনে আবাসিক ও কৃষিজমিতে ইটভাটা স্থাপন করলে পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ডে আর নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় না রাখলে এক বছর কারাদণ্ড ও এক লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। তবে সরকারের এসব আইনের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি ওই ভাটা স্থাপনে।

গত সোমবার সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না নিয়েই এলজিইডি নির্মিত উপজেলার নাঙ্গলকোট-মৌকরা পাকা সড়কের ২০০ গজের মধ্যে প্রায় ২৫ একর আবাদি কৃষিজমি নিয়ে আজিজ ব্রিকস নামের ওই ইটভাটার নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। গ্রামীণ আবাসিক এলাকা, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী মৌকারা মাদ্রাসা থেকে ওই ইটভাটা খুবই কাছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো ওই ভাটা মালিকরা পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র না পেলেও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে এরই মধ্যে একটি কৃষি ছাড়পত্র নিয়ে নিয়েছেন। যদিও ইটভাটার পাশের জমিগুলোতেও বর্তমানে বোরো ধান আবাদ করা হয়েছে। ওই ইটভাটার প্রভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হবে কৃষকসহ স্থানীয়দের।

স্থানীয়দের কাছ থেকে আরো জানা গেছে, নাঙ্গলকোট পৌরসভার চৌবুরি গ্রামের মৃত আবদুল আজিজের ছেলে মাস্টার কামাল হোসেন, মজিবুল হক বাদল, মাঈন উদ্দিনসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি মিলে কৃষিজমিতে ওই ইটভাটা নির্মাণ করছেন। বর্তমানে এর নির্মাণকাজের তদারকিতে রয়েছেন মাঈন উদ্দিন। ভাটা নির্মাণকারীরা এলাকার প্রভাবশালী হওয়ায় প্রকাশ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পায় না।

উপজেলার তিলিপ গ্রামের কয়েকজন কৃষক জানায়, গত আমন মৌসুমেও ওই ভাটার জমিতে ধান চাষ হয়েছে। কিন্তু এখন ফসলের বদলে জমিতে ইটভাটা নির্মাণ করা হচ্ছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল হাছান আলামিন বলেন, ‘আমরা সরেজমিনে গিয়ে দেখি ভাটা নির্মাণকারীরা জমি ভরাট করে ফেলেছে। সেখানে কৃষিজমির কোনো অস্তিত্বই রাখেনি। ’ পাশের জমিতে বোরো ধান লাগানো হয়েছে তাহলে কিভাবে ছাড়পত্র দিলেন—এ প্রশ্নের জবাবে তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলে ওঠেন, ‘ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়পত্র দিয়েছে, তাই আমিও দিয়েছি। ’

এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাইদুল আরীফ বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। খোঁজ নিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপপরিচালক মো. ছামছুল আলম বলেন, ‘আমরা ওই ইটভাটা মালিকদের কোনো ছাড়পত্র দিইনি। দু-এক দিনের মধ্যে ওই ইটভাটায় অভিযান পরিচালনা করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য