kalerkantho

ভালুকা

ফসল কমছে

মোখলেছুর রহমান মনির, ভালুকা (ময়মনসিংহ)   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



“হ্যালো, আপনি কি ‘স্টার ব্রিকস’ ইটভাটার মালিক?” ‘জি, বলছি। ’ ‘আপনি কত বছর ধরে ইটের ভাটা করছেন?’ ‘আট বছর।

’ ‘আপনার ভাটার কোনো লাইসেন্স বা পরিবেশের ছাড়পত্র আছে?’ ‘জি, না, আমার ভাটার নামে একটি ট্রেড লাইসেন্স আছে। আর কিছুই নাই। কাগজপত্র আমার তো নাই-ই, ভালুকার অন্য কোনো ভাটা মালিকেরও নাই। ’ ‘আপনাদের অটো ইটভাটা তো এখন নিষিদ্ধ, তাহলে সেগুলো চলে কী করে?’ ‘ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতির কাছে আমরা প্রত্যেকেই হারিমত টেকা (নির্দিষ্ট হারে টাকা) দিই। যেখানে যেখানে লাগে তিনি দিয়ে দেন। কখনো কখনো সাংবাদিকরাও আসেন। তাঁদের খুশি করে দেওয়ার চেষ্টা করি। এই তো কয় দিন আগে দুই সাংবাদিক আইছিন। তাগরেও কিছু দিছি। চিন্তার কুনু কারণ নাই। সইন্ধ্যায় দুই জন মিল্লা ভালুকা বাসস্ট্যান্ড চা খাইয়ামনে। ’

সম্প্রতি মোবাইল ফোনে বিভিন্ন প্রশ্নে এভাবে কথা বলছিলেন স্টার ব্রিকসের মালিক সিদ্দিক জামান। ময়মনসিংহের ভালুকা উপজেলার মেদুয়ারী ইউনিয়নের দক্ষিণ মেদুয়ারী গ্রামের ফসলি জমিতে স্থাপিত এই ইটের ভাটা।

সরেজমিনে গেলে মেদুয়ারী গ্রামের লোকজন জানায়, স্টার ব্রিকস ভাটা স্থাপনের আগে ওই জমিতে আমন ও বোরো ধানের চাষ হতো। মিলের কর্মচারীরা জানান, ইট তৈরির জন্য তাঁরা আশপাশের নিচু জমি ও মাছের খামার থেকে মাটি সংগ্রহ করেন। ভাটার অদূরে রাস্তার পাশে দেখা গেল স্তূপ করে রাখা অনেক লাকড়ি। স্থানীয় গিয়াস উদ্দিন জানান, লাকড়িগুলো সিদ্দিক জামানের এবং ভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য এগুলো রাখা হয়েছে। নূরুল ইসলাম নামের একজন জানান, ইটখোলার (ভাটা) ধোঁয়ার কারণে তাঁদের এলাকার গাছে আগের মতো আর ফল ধরে না। ছোট থাকতেই গাছের নারিকেল ঝরে যায়। গাছের পাতার রং বিবর্ণ হয়ে গেছে। মাটির ওপরের অংশ কেটে ভাটায় ইট তৈরিতে ব্যবহার করায় জমিতে আগের মতো ফসল হয় না। আবুল কাশেম জানান, রাতে ধোঁয়ার কারণে শিশুরা অনেক কাশে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, ভালুকায় নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে লাইসেন্সবিহীন ১৫টি ইটভাটাই স্থাপন করা হয়েছে আবাসিক ও ফসলি জমিতে। তা ছাড়া জমির ওপর অংশের মাটি কেটে নিয়ে ইট তৈরিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। তা ছাড়া ইট পোড়ানোয় বাধ্যতামূলক কয়লা ব্যবহারের নিয়ম থাকলেও অবাধে ব্যবহার করা হচ্ছে বনাঞ্চল থেকে কেটে আনা গাছ। ফলে একদিকে পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে পড়ছে, অন্যদিকে সরকার হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের পরিপত্রে হাইব্রিড হফম্যান, জিগজ্যাগ, ভার্টিক্যাল শ্যাফট ক্লিন অথবা পরীক্ষিত নতুন প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব ইটভাটা করার কথা থাকলেও ভালুকায় দু-চারটি ছাড়া অন্যগুলোতে ইট পোড়ানো হচ্ছে অটো (ফিক্সড বা স্থায়ী, যা পরিবেশবান্ধব নয়) চিমনি ব্যবহার করে।

ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন, ২০১৩-তে (১ জুলাই, ২০১৪ থেকে কার্যকর) বলা হয়েছে, আবাসিক, জনবসতি, সংরক্ষিত এলাকার বনভূমি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ইটভাটা করা যাবে না। সরকারি বনাঞ্চলের সীমারেখা থেকে দুই কিলোমিটার দূরত্বে ইটভাটা করা যাবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভালুকা উপজেলার খারুয়ালী, মেদীলা, মেদুয়ারী, ভান্ডাব, বিরুনীয়া, রাংচাপড়া, শান্তিগঞ্জ, চান্দরাটি, উরাহাটি, গোয়ারীসহ বিভিন্ন এলাকায় ১৫টি ইটভাটা রয়েছে। এসব ইটভাটার বেশির ভাগেরই লাইসেন্স নবায়ন নেই। অভিযোগ রয়েছে, বেশির ভাগ ইটভাটায় শিশু ও নারী শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়। বিভিন্ন ধরনের ডাইস ব্যবহার করে ইটের আকার ছোট-বড় করে ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।

এমবিসি ইটভাটার মালিক আনিসুর রহমান সবুজ জানান, ভালুকায় বর্তমানে ১৫টি ভাটায় ইট পোড়া হচ্ছে। এর মধ্যে অটো চিমনি রয়েছে ৯টিতে। অটো চিমনির ভাটার প্রতিটিতে প্রতি রাতে দেড় শ থেকে ২০০ মণ লাকড়ির প্রয়োজন হয়। এই চিমনি ২০০৬ সাল থেকে অবৈধ। তাঁর জানা মতে, চলমান ভাটাগুলোর দু-চারটির পরিবেশের ছাড়পত্র আছে। শরাফত আলীর ইটভাটা ছাড়া আর কারো ভাটার লাইসেন্স নেই। ‘কিভাবে চলে এসব ভাটা?’—প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, জেলা ও স্থানীয় প্রশাসন, বন বিভাগসহ প্রতিটি সেক্টর ম্যানেজ করেই ভাটা পরিচালনা করা হয়।

উপজেলা ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি আফজাল হোসেন মণ্ডল জানান, ভালুকায় লাইসেন্সবিহীন ১৫টি ইটভাটা রয়েছে। এর মধ্যে তাঁদের সমিতিভুক্ত ৯টি। সার্বিক দিক ম্যানেজ করেই ভাটাগুলো পরিচালিত হয়ে আসছে এবং লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কামরুল আহসান তালুকদার জানান, অবৈধ ও লাইসেন্সবিহীন ভাটাগুলোয় অচিরেই ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চালানো হবে।


মন্তব্য