kalerkantho


জামালপুর

অবৈধ ইটভাটায় পরিবেশ বিপন্ন

আজিজুর রহমান চৌধুরী, জামালপুর   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



অবৈধ ইটভাটায় পরিবেশ বিপন্ন

জামালপুর শহরে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভাটায় পোড়ানো হচ্ছে কয়লার পরিবর্তে কাঠ। ছবি : কালের কণ্ঠ

গাছগাছালি উজাড়

জামালপুর পৌর শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ফসলি জমিতে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ইটভাটাগুলোতে দেদার পোড়ানো হচ্ছে কয়লার পরিবর্তে কাঠ। এতে একদিকে গ্রামের গাছগাছালি উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ হচ্ছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, পৌর শহরের বিলপাড়া, লাঙ্গলজোড়া, আলিহারপুর, বোর্ডঘর ও ভেলা পিঙ্গলহাটি এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে ১০টি ইটভাটা। এসব ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে পোড়ানো হচ্ছে কাঠ। আবার ইটভাটার জন্য প্রতিনিয়ত তুলে নেওয়া হচ্ছে ফসলি জমির উপরিভাগের মাটি। এসব মাটি, কাঠ ও ইট আনা-নেওয়ার কাজে স্থানীয় সব রাস্তাঘাট ব্যবহার করা হয়। বেপরোয়াভাবে চলে অবৈধ যান ভটভটি, নছিমন ও করিমন। এসব যানের মাধ্যমে বায়ু ও শব্দদূষণ হয়।

ঘনবসতিপূর্ণ বোর্ডঘর এলাকায় গত রবিবার ঘুরে দেখা গেছে, জীবন ব্রিকস, রাজু ব্রিকস, রাহাত ব্রিকস ও জনতা ব্রিকসের প্রতিটিতেই জ্বালানি হিসেবে স্তূপাকারে রাখা হয়েছে ২০০ থেকে ৩০০ মন করে কাঠ। এসব কাঠ দিয়ে পোড়ানো হচ্ছে ইট। পাশের লাঙ্গলজোড়া গ্রামে অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে যমুনা ব্রিকস, মুন্না ব্রিকস, রূপালী ব্রিকস এবং আলিহারপুরে আজিম ব্রিকস।

এসব ভাটার চারদিকে ঘনবসতিপূর্ণ গ্রামগুলোতে রয়েছে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় ও হাট-বাজার। ভাটার কালো ধোঁয়ার প্রভাবে মরে যাচ্ছে গ্রামের গাছগাছালি। ইতিমধ্যে ওই সব গ্রামের বেশির ভাগ গাছে ফল ধরা বন্ধ হয়ে গেছে। আবার রাস্তাঘাটে চলাচলকারী বেপরোয়া যানবাহনের বিকট শব্দে অনেকের কানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। ভাটার মালিকদের খামখেয়ালিপনায় প্রতিটি ইটের নেই সঠিক মাপ, একেক ভাটার ইট একেক মাপের। এতে ভবন নির্মাণ শ্রমিকসহ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ করতে গিয়ে প্রতারিত হচ্ছে।

লাঙ্গলজোড়া গ্রামের কৃষক জমির উদ্দিন, সোহেল রানা, আসাদ আলী ও আব্দুল জব্বার জানান, কয়েক বছর আগে তাঁদের এলাকার জমিতে তিনটি করে ফসল হতো। তখন তাঁরা পরিবার নিয়ে সুখেশান্তিতে চলেছেন। এখন ইটভাটা হওয়ায় তাঁদের জমিতে আগের মতো ফসল হয় না। গাছপালায় আগের মতো ফল ধরে না। কালো ধোঁয়ার প্রভাবে মাটির উর্বরতা হ্রাস পেয়েছে, ফসলের উত্পাদন ও গাছের ফল কমেছে এবং মড়ক শুরু হয়েছে।

জামালপুর ভাটা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন খান বলেন, ‘ভাটায় আগে কাঠ পোড়ানো হতো। বর্তমানে কয়লার চেয়ে কাঠের দাম বেশি। তাই এখন কাঠ পোড়ানো হয় না। ’

জামালপুর পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি জাহাঙ্গীর সেলিম বলেন, ‘ইটভাটার জন্য গ্রামগঞ্জের গাছগাছালিতে আগের মতো আর ফল ধরে না। রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ যানবাহনের বিকট শব্দে অনেকের কানে সমস্যা দেখা দিয়েছে। তাই যেসব ইটভাটা সরকারি নিয়মনীতি মেনে চলছে না, সেগুলো জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করে দেওয়া উচিত। ’

জামালপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মঞ্জুরুল কাদের বলেন, ‘ভাটায় কাঠ পোড়ানোয় বনজঙ্গলসহ গ্রামগঞ্জের গাছগাছালি উজাড় হয়ে যাচ্ছে। গাছপালা হারিয়ে ফেলছে ফল ধারণের ক্ষমতা। এ ছাড়া ভাটার কালো ধোঁয়ার প্রভাবে ধ্বংস হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য। ’

জামালপুর-শেরপুর অঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক মো. আব্দুর রাজ্জাক জানান, জামালপুরের ইটভাটাগুলোতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানো সম্পূর্ণ বেআইনি। ইটভাটাগুলোতে কাঠ পোড়ানো হলে বন-জঙ্গলসহ গ্রামগঞ্জের গাছপালার ব্যাপক ক্ষতি হয়। এতে পরিবেশের ভারসাম্য দারুণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জেলা প্রশাসন থেকে কোনো উদ্যোগ নিয়ে বন বিভাগের সহযোগিতা চাইলে এ ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করা হবে।

জামালপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. শাহাবুদ্দিন খান জানান, ইটভাটাগুলোতে কয়লার পরিবর্তে কাঠ পোড়ানোসহ ফসলি জমি থেকে মাটি উত্তোলন করে জমির উর্বরতা হ্রাসের বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ভাটা মালিক, কর্মচারী ও সচেতন নাগরিকদের সমন্বয়ে শিগগির সভা-সমাবেশ করা হবে।

 

 

মন্তব্য