kalerkantho


রংপুর

কুমারমাটির খোঁজে

ছাইদুল হক সাথী, রংপুর   

১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কুমারমাটির খোঁজে

মৃৎশিল্পের মাটি সংকট চলছে। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ থেকে মাটি কিনছেন মৃৎশিল্পীরা। সেই মাটি দিয়ে রংপুর সদরে বামনপাড়ার শিল্পীরা তৈজসপত্র বানাচ্ছেন (ইনসেটে)। ছবি দুটি সম্প্রতি তোলা। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘কুমারমাটি’র অভাবে রংপুর অঞ্চলের মৃৎশিল্পীরা বিপাকে পড়েছে। আগে এ মাটি হাতের কাছেই পাওয়া গেলেও এখন বেশ দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে। উপায় না পেয়ে কুমার সম্প্রদায়ের লোকজন দূর-দূরান্ত থেকে এ মাটি কিনতে বাধ্য হচ্ছে। এ জন্য একদিকে যেমন তাদের অনেক টাকা খরচ করতে হচ্ছে, তেমনি চাহিদা ও দাম কম থাকায় ওই মাটি দিয়ে তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করে তারা তেমন লাভবান হতে পারছে না। বর্তমান অবস্থায় মৃৎশিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। এ পেশার সঙ্গে জড়িতদের সঙ্গে কথা বলে আরো নানা সংকটের কথা জানা গেছে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, রংপুরের পীরগাছা এলাকার দুদিয়াবাড়ীর পালপাড়া থেকে মাটি কিনতে মিঠাপুকুরে আসেন কমলা চন্দ্র পাল। পীরগাছায় মাটির সংকট সৃষ্টি হওয়ায় ট্রাক ভাড়া করে মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ ইউনিয়নের চকেয়ারপাথার এলাকায় আসেন তাঁরা। কৃষকদের জমি থেকে ‘প্রতি পিস’ মাটি কেনেন ১৫ টাকা দরে। এ মাটি বহন করতে তাঁদের আরো খরচ পড়ে পাঁচ থেকে সাত টাকা। মিঠাপুকুরের খোড়াগাছ চকেয়ারপাথার, বকুলতলাসহ আশপাশের এলাকার মাটি মৃৎশিল্পের জন্য উপযোগী।

এ কারণে কুমার সম্প্রদায়ের লোকজন ওই সব এলাকা থেকে মাটি সংগ্রহ করে। কিন্তু সেখানেও বর্তমানে মাটি সংকট দেখা দিয়েছে।

পীরগাছার কমলা চন্দ্র পাল বলেন, এখন আর সহজে যেখানে-সেখানে এ মাটি পাওয়া যায় না। টাকা ছাড়া মাটি দেয় না কেউ। কোথাও খোঁজ মিললে সেখান থেকে মাটি কিনতে হয়। তিনি আরো জানান, নদী-নালা, খাল-বিল ভরাট হয়ে যাওয়ায় ওই মাটি পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। একসময় হাতের কাছেই কুমারমাটি পাওয়া যেত। কিন্তু দিনে দিনে ওই মাটি পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ছে।

মিঠাপুকুরে মাটি কিনতে আসা রংপুর সদরের সুবল কুমার পাল বলেন, কোথাও খোঁজ মিললে একেকটি কুমার পরিবার এক বছরের জন্য সেখান থেকে মাটি সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। এ জন্য বর্তমান মৌসুম উপযোগী। কারণ বর্ষায় ওই মাটি পানিতে তলিয়ে থাকে।

মিঠাপুকুরের পালপাড়ার গোপাল চন্দ্র পাল বলেন, ‘কেউ চাইলে আমরা পুকুর খুঁড়ে মাটি সংগ্রহ করে নিয়ে যাই। এতে দুই পক্ষই লাভবান হয়। আবাদি জমির ওপরের মাটি দিয়ে তৈরি হচ্ছে ইট। ইটভাটার মালিকরাও জমির ওপর থেকে মাটি সংগ্রহ করছে। এ কারণে মাটির অভাব বাড়ছে দিন দিন।

খোড়াগাছ এলাকার জমির মালিক আফজাল হাজি জানান, তিনি পুকুর খোঁড়ার জন্য কুমারদের কাছে মাটি বিক্রি করে দিয়েছেন। এভাবে বিনা টাকায় তাঁর পুকুর খোঁড়া হয়ে যাবে বলে তিনি জানান।

রংপুর সদরের দক্ষিণ মমিনপুর পালপাড়ার অপর্ণা রানী পাল বলেন, নানা রকম সিলভার ও প্লাস্টিকসামগ্রীর প্রতি দিন দিন মানুষের ঝোঁক বাড়ছে। তবে এটা ঠিক, আগের তুলনায় ভালো মানের মাটির পণ্য তৈরি করতে পারলে দাম পাওয়া যায়। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে এক গাড়ি (ট্রাক্টর) মাটি কিনতে লাগে তিন-সাড়ে তিন হাজার টাকা। একই এলাকার নন্দলাল পাল বলেন, যতই প্লাস্টিকের জিনিস বের হোক, মাটির তৈরি সামগ্রীর চাহিদা থাকবেই। এখনো ভালো জিনিস তৈরি করতে পারলে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।

বদরগঞ্জের মধুপুর ইউনিয়নের কুমারপাড়ার নরেশ পাল জানান, এমন একটা সময় ছিল যখন বাংলার ঘরে ঘরে মাটির তৈরি হাঁড়ি-পাতিল, কলস, থালাবাটি, ফুলের টব, ফুলদানি, মাটির তৈরি ব্যাংক, খেলনা, শৌখিন সামগ্রীসহ নানা জিনিস ব্যবহার হতো। মৃৎশিল্পে গ্রামবাংলার মানুষের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের ছবি ফুটিয়ে তুলতেন শিল্পীরা। তখন মৃৎশিল্পের কোনো বিকল্প ছিল না। কিন্তু এখন এ শিল্পের সঙ্গে জড়িতদের দুর্দিন চলছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বদরগঞ্জ উপজেলা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা কনক চন্দ্র রায় বলেন, আসলে কুমারমাটি বলে কিছু নেই। মূলত এঁটেল ও সামান্য লাল এ দুই মাটির মিশ্রণে মৃৎশিল্প তৈরি হয়। কুমার সম্প্রদায়ের লোকজন এ মাটিকেই কুমারমাটি বলে। আগে নদী-নালা, খাল-বিল থেকে এ মাটি সহজেই সংগ্রহ করা যেত। কিন্তু এখন নানা কারণে তা দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছে।


মন্তব্য