kalerkantho

নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজ.

হায়রে ছাত্রাবাস!

দিলীপ কুমার মণ্ডল, নারায়ণগঞ্জ   

১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হায়রে ছাত্রাবাস!

নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজের শেরেবাংলা ছাত্রাবাসটি দেখে মনে হতে পারে কোনো ভাসমান তরী ছবি : কালের কণ্ঠ

নারায়ণগঞ্জ সরকারি তোলারাম কলেজে প্রায় ১৯ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে। এর মধ্যে ছাত্র প্রায় ১১ হাজার। কিন্তু এই ছাত্রদের থাকার জন্য কোনো ছাত্রাবাস নেই। ১৯৬৯ সালে নির্মিত শেরেবাংলা ছাত্রাবাসটি এখন বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। দেখলে মনে হবে কোনো ভাসমান তরী।

কলেজ সূত্র জানায়, ক্যাম্পাস থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার দূরে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ পুরনো সড়কের পাশে অক্টোফিস এলাকায় শেরেবাংলা ছাত্রাবাসটি। সেখানে কলেজের নিজস্ব ৭৫ শতাংশ জমির কিছু অংশ নিয়ে তৈরি করা হয় দ্বিতল ভবন। তখন আশপাশের জেলার শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার বিষয়টি চিন্তা করে এ ছাত্রাবাসটি গড়ে তোলা হয়। একসময় ছাত্রদের পদচারণে এটি মুখরিত থাকত।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, শেরেবাংলা ছাত্রাবাসটির নিচতলার পুরোটা পানিতে তলিয়ে আছে। সেই পানি থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।

দোতলা ভবনটির আশপাশের এলাকায় ময়লা-আবর্জনা জমে আছে। চারদিকের স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ দেখে মনে হলো ভবনটি যেকোনো সময় ধসে যেতে পার। ভবনের ছাদ ও দেয়ালের বহু জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়েছে। কোনো কোনো দরজা-জানালার পাল্লা নেই। আবার কোনো জানালার পাল্লা ভেঙে ঝুলে আছে। ছাত্রাবাসের প্রবেশমুখে জায়গা দখল করে তৈরি করা হয়েছে দোকানপাট ও গোডাউন। সেখানে ঝুটের ব্যবসা করা হচ্ছে। ছাত্রাবাসের আটটি কক্ষের দোতলার চার কক্ষে বসবাস করছে কলেজে চাকরিরত চারটি পরিবার।

কলেজে পিয়নের চাকরি করেন তাপস আচার্য। তিনি স্ত্রী অনিতাকে (তিনিও পিয়ন) নিয়ে বসবাস করেন ছাত্রাবাসে। তাঁরা জানান, পুরো ভবন সারা বছর পানিতে তলিয়ে থাকে। যেকোনো সময় এটা ভেঙে পড়তে পারে। বৃষ্টি হলে ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে।

পিয়ন ইব্রাহিমের স্ত্রী জেবুন্নাহার বলেন, ‘সন্ধ্যা হলে জায়গাটি মাদকসেবী ও বখাটেদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়। আমরা ভয়ে কাউকে কিছু কইতে পারি না। মূল গেটে তালা মারা থাকলেও মাদকসেবীরা অন্য একটি ভবনের ছাদ টপকে এ ভবনে আসে। ’

চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী উদ্যম মণ্ডল কলেজে চাকরি করেন ৩০ বছর হলো। আগে অন্যত্র বসবাস করলেও কয়েক বছর ধরে ছাত্রাবাসে বসবাস করেন। তিনি বলেন, ‘এখানে কলেজের তত্ত্বাবধানে পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা নেই। সম্প্রতি বিশেষ ব্যবস্থায় পানি ও বিদ্যুতের সমস্যা সমাধান করা হয়েছে। তবে লাকড়ির চুলায় রান্নাবান্না করি। ’

পিয়ন ইব্রাহিম বলেন, ‘এখানে আমরা মানবেতর জীবন যাপন করছি। টয়লেটগুলো পানিতে ডুবে আছে। তাই দোতলায় নিজেরা টয়লেট বানিয়ে নিয়েছি। ওপরের সব ময়লা নিচের পানিতে পড়ছে। নিচ থেকে অনবরত পচা পানির গন্ধ আসে। এখানে থাকলেও কলেজকে কোনো ভাড়া দিতে হয় না। ’

ছাত্রবাসের প্রবেশমুখে বিরাট দুটি গোডাউন তুলে ঝুটের ব্যবসা করছে স্থানীয় প্রভাবশালীরা। আছে যাত্রীবাহী বাসের পার্কিংও। সেখানে ঝুট বাছাই করছিলেন জাহাঙ্গীর, পানফুল, জেলহাজসহ কয়েকজন। জাহাঙ্গীর বলেন, ‘এখানে ঝুটের ব্যবসা করলেও কলেজকে কোনো টাকা-পয়সা দিতে হয় না। কলেজ কর্তৃপক্ষও কোনো বাধা দেয় না। ’

তোলারাম কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি হাবিবুর রহমান রিয়াদ বলেন, ‘অনেক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাস বহনকারী এই কলেজ। বিপুলসংখ্যক ছাত্র পড়ালেখা করলেও তাদের জন্য একটা ভালো হোস্টেল নেই, এটা খুবই দুঃখজনক।

তবে এ সমস্যা সমাধানে এক হাজার ২০০ আসনের একটি হোস্টেলের জন্য স্থানীয় সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের মাধ্যমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। ’

সরকারি তোলারাম কলেজ শিক্ষক পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ও সহকারী অধ্যাপক জীবনকৃষ্ণ মোদক বলেন, ‘শেরেবাংলা ছাত্রাবাসটি ১০ বছর আগে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে। ’

কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মধুমিতা চক্রবর্তী বলেন, ‘পরিত্যক্ত হোস্টেলটি যেখানে অবস্থিত, ওই জায়গা নিয়ে একটু সমস্যা আছে। সেটা সমাধান হয়ে গেলে পুরনোটি ভেঙে নতুন হোস্টেল তৈরির প্রক্রিয়া শুরু হবে। এ ছাড়া ছাত্রাবাসের আশপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অচিরে অভিযান চালানো হবে। ’


মন্তব্য