kalerkantho


হাতকড়া এড়াতে ২২ লাখ খরচা, তার পরও ধরা!

লিমন বাসার, বগুড়া   

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



হাতকড়া এড়াতে ২২ লাখ খরচা, তার পরও ধরা!

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান হাসপাতালে চিকিৎসাধীন হাসি এখনো সংকটাপন্ন (বাঁয়ে); গ্রেপ্তার হওয়া স্বামী রিপন। ছবি : কালের কণ্ঠ

‘হিংস্র’ ছেলের হাতে পুলিশের কড়া না পরাতে ২২ লাখ টাকা ইতিমধ্যে খরচ করে ফেলেছেন রিপনের বাবা। এত টাকা ঢালার পরও পুলিশের জাল ভেদ করতে পারলেন না বাবা-ছেলে।

বগুড়ার গৃহবধূ হাসির শরীরে রামদার ১৬ কোপ দেওয়া সেই ‘হিংস্র’ স্বামী রিপন (৩০) অবশেষে ধরা পড়ল। টানা ১৪ দিন পালিয়ে থাকার পর বুধবার ভোরে পুলিশের হাতকড়া পরে রিপন। একই সঙ্গে নির্মম এ ঘটনায় সহযোগিতা এবং মামলা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টার অপরাধে রিপনের বাবা হবিবর রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ প্রাথমিক তদন্তেই জানতে পেরেছে হাসির মামলা ম্যানেজ করতে ইতিমধ্যেই একটি চক্রের মাধ্যমে রিপনের বাবা ২২ লাখ টাকা খরচ করেছেন।   কিন্তু বগুড়া জেলা পুলিশের তত্পরতা ও কালের কণ্ঠ’র ধারাবাহিক প্রতিবেদনের কারণে এ অপচেষ্টা সফল হয়নি।

বগুড়ার পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান জানান, বগুড়ার শিবগঞ্জের কিচক ইউনিয়নের গৃহবধূ মনিকা শারমিন হাসির (২৮) স্বামী আবু নাসের ইলিয়াস রিপন বিভিন্ন জেলায় পালিয়ে ছিল।

পুলিশ যখন তাকে ধরতে অভিযান চালায় তখন সে আগে থেকেই বিষয়টি জেনে যেত। রিপনের বাবা হবিবর এলাকার প্রভাবশালী ও ধনাঢ্য ব্যক্তি হওয়ায় টাকার বিনিময়ে সোর্স তাকে অভিযানের খবর পৌঁছে দিত। তবে রিপনের শেষ রক্ষা হয়নি।

বুধবার মধ্যরাতে বগুড়া শহরের সূত্রাপুর এলাকায় তাদের এক নিকটাত্মীয়র বাড়ি থেকে প্রথমে হবিবর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর তাঁর দেওয়া তথ্যে রিপনকে ভোরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের ফুলপুকুরিয়া গ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

শিবগঞ্জ থানার ওসি শাহিদ মাহমুদ খান জানান, ঢাকা ছাড়াও রিপন বিভিন্ন জেলায় আত্মগোপন করে ছিল। পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালিয়ে ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত তার বাবাকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি ছেলের খোঁজ দেন।

গত ৬ ফেব্রুয়ারি রিপনের কৃতকর্ম তুলে ধরে ‘আবার হাসুক হাসি’ শিরোনামে কালের কণ্ঠ সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এরপর হাসিকে নিয়ে টানা ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে কালের কণ্ঠ।

শিবগঞ্জের কিচক এলাকার বাসিন্দা হামিদুর নামের একজন জানান, রিপনের বাবা ও পরিবারের সদস্যরা প্রথম থেকেই জানতেন রিপন কোথায় আছে।

তাঁরা পুলিশকে সহযোগিতা না করে উল্টো ছেলেকে বাঁচাতে তত্পর ছিলেন। তিন-চার দিন আগে রিপনের বাবা হবিবর রহমান ছেলেকে বাঁচাতে বিভিন্ন মহলে তদবির করতে জমি বিক্রি করেন। ইতিমধ্যে তিনি ২২ লাখ টাকা খরচ করেছেন।

হাসি ভালোবেসে বিয়ে করছিল সমবয়সী রিপনকে। তার চোখে ছিল একরাশ স্বপ্ন। হৃদয়ে আকাশছোঁয়া ভালোবাসা। দুজন শপথ নিয়েছিল এ জনমে কখনো আলাদা হবে না।

সেটি ছিল আট বছর আগে ২০০৮ সালের কথা। আর এখন সব ভালোবাসা রূপ নিয়েছে ঘৃণায়। শরীরে স্বামীর রামদার ১৬টি কোপ নিয়ে হাসপাতালের বিছানায় এখনো মৃত্যু লড়াইয়ে আছে হাসি।

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জন সুশান্ত পাল জানান, হাসির অবস্থা এখনো ভালো নয়। মাথা ও গলার ক্ষত ঝুঁকিমুক্ত হচ্ছে না।

তার হাত ও পায়ের মূল ভেইন (রগ) কাটা পড়েছে। সেগুলো শরীরের অন্য অঙ্গ থেকে কেটে জোড়া লাগাতে হবে। তার শারীরিক অবস্থার কারণে এখনো সেই অপারেশন করা যায়নি।

এ ছাড়া মাথার আঘাতও এখনো শঙ্কামুক্ত হয়নি।

হাসির বাবা হান্নান চীেধুরী জানান, ১০ লাখ টাকা যৌতুকের জন্য প্রায়ই মারধর করা হতো হাসিকে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জানলেও কখনো বাধা দেয়নি রিপনকে।

কারণ সে ছিল মাদকাসক্ত। গত ৩১ জানুয়ারি রাতে শিশুসন্তানদের সামনেই রামদা দিয়ে স্ত্রী হাসির শরীরের মাথা, মুখ, গলা, বুক, পেটসহ ১৬টি স্থানে কুপিয়ে ক্ষতবিক্ষত করে রিপন।

বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চতুর্থ তলায় হাসির অবস্থা গতকাল বুধবারও ছিল অপরিবর্তিত। তার শয্যার পাশে ছিল ছয় বছরের শিশু ফাহাদ ও চার বছরের ফারিয়া।


মন্তব্য