kalerkantho


নান্দাইলে কর্মসৃজন প্রকল্প

দুর্নীতির নজির, গরিবের তালিকায় টাকার কুমির

আলম ফরাজী, ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ)    

১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দুর্নীতির নজির, গরিবের তালিকায় টাকার কুমির

হতদরিদ্র, কর্মহীন ও শ্রমজীবীদের জন্য কাজের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ময়মনসিংহের নান্দাইলে ফের চালু হয়েছে ৪০ দিনের কর্মসৃজন প্রকল্প। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই দরিদ্র-বঞ্চিত-অসহায়দের তালিকায় যুক্ত হয়েছে বিশাল সম্পত্তির মালিক, ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যানের বোনজামাই, ইউপি সদস্যের স্বামী-শাশুড়ি, সরকারদলীয় নেতা ও সম্পদশালীর ছেলে কলেজ ছাত্র। তাদের দিয়ে কাজ না করিয়ে মজুরির টাকা উঠিয়ে আত্মসাতের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ফলে প্রকল্পের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে উপজেলার ৫ নম্বর গাঙাইল ইউনিয়নের শ্রমজীবীরা।

নান্দাইল উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ১২টি ইউনিয়নে মোট পাঁচ হাজার ৬২৯ জন কার্ডধারীর বিপরীতে চার কোটি ৫০ লাখ ৩২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। গাঙাইল ইউনিয়নে কার্ডধারী আছে ৪৭৮ জন। গত ১১ জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু করার কথা থাকলেও শুরু হয়েছে ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে।

অভিযোগ উঠেছে, ৫ নম্বর গাঙাইল ইউনিয়নে কর্মসৃজন প্রকল্প (ইজিপিপি) তালিকায় চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান খোকনের ভগ্নিপতি ছাড়াও অন্য আত্মীয়স্বজন, দলীয় নেতাকর্মী, কলেজ ছাত্র ও এলাকার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির নাম রয়েছে। এই অভিযোগ যাচাই করতে গত সোমবার সকালে ৮ নম্বর ওয়ার্ডের সুরাশ্রম গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, দুটি ভাগে ৩৮ জন শ্রমিক মাটি কাটার কাজ করছে। এ সময় সেখানে তদারক কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন না। হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে ইউপি সদস্য (৭, ৮ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ড) চম্পা আক্তার দেখাতে পারেননি।

এই শ্রমিকদের দলনেতা হচ্ছেন চেয়ারম্যানের বোনজামাই ৪৩১ নম্বর কার্ডধারী মো. মেজবাহ উদ্দিন জিলু। জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁর নেতৃত্বে এখানে দুটি ভাগে ৭৫ জন শ্রমিক কাজ করছে। তিনিও কোনো হাজিরা খাতা দেখাতে পারেননি। তবে গণনায় দেখা যায়, দুই ভাগে শ্রমিক আছে ৩৮ জন। যারা কাজে আসেনি তাদের মধ্যে আছে ছয় একর জমির মালিক ৪২৭ নম্বর কার্ডধারী সাদেক মিয়া, ৪০৮ নম্বর কার্ডধারী সম্পদশালীর ছেলে কলেজ ছাত্র রিদয় মিয়াসহ ৩৭ জন।

লুঙ্গি ও ইস্ত্রি করা শার্ট পরে হাতে খাতা নিয়ে শ্রমিকদের দেখভাল করছেন মেজবাহ উদ্দিন জিলু। ‘চেয়ারম্যানের আত্মীয় ও ধনী হয়েও কেন শ্রমিকের খাতায় নাম তুললেন’—জানতে চাইলে তিনি হেসে বলেন, ‘এতে কী অইছে। অবসর পাইলে তাদের (শ্রমিক) একটু দেখশোন করি। ’ জানা যায়, স্থানীয় বাজারে তাঁর একটি ওষুধের দোকানও আছে।

আরেক শ্রমিক সুরাশ্রম গ্রামের ছন্দু মিয়ার ছেলে মো. সাদেক মিয়া। সাদেকের এক প্রতিবেশী জানায়, সাদেকদের প্রায় ৭০-৮০ কাঠা ফসলি জমি আছে। সাদেকের আছে একটি সেচ পাম্প। তার পরও তিনি কিভাবে শ্রমিক হন, তা কল্পনার বাইরে। সাদেকের বাড়ি গেলে দেখা যায়, বাড়ির বাইরে বাংলাঘরটি আধাপাকা। বাড়ির ভেতর আছে আরো দু-তিনটি আধাপাকা ঘর। রয়েছে এলজিএসপির দেওয়া একটি টিউবওয়েল। জানতে চাইলে সাদেক বলেন, দলীয়ভাবে তাঁর নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এক প্রশ্নের উত্তরে সাদেকের বাবা ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ছন্দু মিয়া বলেন, ‘আল্লাহ আমারে অনেক দিছে। আমার ছেড়া (ছেলে) শ্রমিক অইবো কেরে! চেয়ারম্যান পছন্দ কইর্যা (তালিকায় নাম) দিছে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ৭ নম্বর ওয়ার্ডের তালিকায় আছেন ওয়ার্ড মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আকলিমা আক্তারের স্বামী ৩৫৮ নম্বর কার্ডধারী বকুল মিয়া ও ইউপি সদস্য জিলু মিয়ার বোন ৩৫১ নম্বর কার্ডধারী আকলিমা আক্তার। ৯ নম্বর ওয়ার্ডের তালিকায় আছেন নারী ইউপি সদস্য চম্পা আক্তারের স্বামী ৪৬৭ নম্বর কার্ডধারী সবুজ মিয়া ও ৪৬৮ নম্বর কার্ডধারী শাশুড়ি চম্পা আক্তার এবং ওয়ার্ড কৃষক লীগের সভাপতি ৪৭২ নম্বর কার্ডধারী সম্পদশালী মো. আঞ্জু মিয়া।

ইউপি সদস্য চম্পা আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীর ২ শতাংশ জমিও নাই। গত বছর স্বামীর নাম থাকায় এবারও দেওয়া হয়েছে। আমার শাশুড়িও দরিদ্র। তা ছাড়া আমাদের প্রাধান্য আছে নিজেদের লোকজনকে তালিকায় দেওয়ার জন্য। ’ আওয়ামী লীগ নেত্রী আকলিমা আক্তার বলেন, ‘আমাদের অবস্থা ভালো না। তাই মেম্বারকে বলে তালিকায় স্বামীর নাম দেওয়া হয়েছে। ’

চেয়ারম্যান আশরাফুজ্জামান খোকন বলেন, ‘নিজেদের মধ্যে গরিব-অসহায় লোকজন থাকলে তাদের নাম তালিকায় দিলে দোষের কিছু নয়। তারা কাজ করেই টাকা নেবে। অন্যদিকে যেসব শ্রমিক কাজে অনুপস্থিত থাকে তারা দলের লোক। দল থেকে তাদের নাম দেওয়া হয়েছে। ’

হতদরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন প্রকল্পের উপজেলা বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ‘এটা (তালিকায় সম্পদশালী) হতে পারে না। ঘটনাটি তদন্ত করে দেখা হবে। ’


মন্তব্য