kalerkantho


নিকলীর ছাতিরচরে শোকের ছায়া

মা, দাদা-দাদি ও চাচার পর চলে গেল শিশু রাব্বিও

নাসরুল আনোয়ার, সুমন বর্মণ ও শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ থেকে   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



মা, দাদা-দাদি ও চাচার পর চলে গেল শিশু রাব্বিও

ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে বসবাস করে কিশোরগঞ্জের নিকলীর ছাতিরচর ইউনিয়নের কয়েক শ পরিবার। গায়ে খেটেই জীবন চলে এদের।

কেউ রিকশা-ভ্যান চালায়। কেউ বা তরিতরকারি বিক্রি ও দিনমজুরি করে। নিজ গ্রামের বার্ষিক মেলার পর্ব এলে একখণ্ড আনন্দের আশায় প্রায় সবাই গ্রামে ফিরে আসার প্রস্তুতি নেয় সারা বছর। আসছে বুধবার (১৫ ফেব্রুয়ারি) থেকে মেলা শুরু।

গ্রামের চারটি পরিবারের নারী-শিশুসহ ১৪ জন গতকাল রবিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) ভোরেই সব কিছু গুছিয়ে বাড়ির পথে মাইক্রোতে রওনা করে। নরসিংদীর বেলাব উপজেলার নারায়ণপুর ইউনিয়নের দড়িকান্দি এলাকায় যাত্রীবাহী বাসের সঙ্গে মুখোমুখি ভয়াবহ এক সংঘর্ষ সব কিছু ভণ্ডুল করে দিয়েছে। মর্মান্তিক এ সড়ক দুর্ঘটনায় মাইক্রোতে থাকা তিনজন বাদে বাকি ১২ জনই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এ ছাড়া মারা যান গাড়িটির চালকও।

বেঁচে যাওয়া তিন যাত্রীর মধ্যে রাব্বি নামের এক বছরের এক শিশু মৃত্যুর সঙ্গে লড়েছে সারাটা দিন।

গতকাল সন্ধ্যায় সেও না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মায়ের সঙ্গে তাকেও চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল। আত্মীয়রা জানায়, রাব্বির মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টা আগে একই হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন রাব্বির মা শারমিন আক্তার (২৮)। ওদিকে দুর্ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান রাব্বির দাদা মানিক মিয়া (৫৫), দাদি মফিয়া আক্তার (৪৫) ও চাচা অন্তর (১০)।

প্রিয় সন্তান, স্ত্রী, মা, বাবা ও ছোট ভাই হারানোর শোকে পাথর হয়ে গেছেন রাব্বির বাবা নূরে আলম। গতকাল সারা দিন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আহত ছেলে ও স্ত্রীর চিকিৎসায় ব্যস্ত ছিলেন তিনি। নূরে আলম সন্ধ্যায় মোবাইল ফোনে জানান, তিনি দুই দিন পর বাড়ি যেতেন। কামরাঙ্গীরচরে থেকেই তিনি দুর্ঘটনার খবর পান। বেঁচে যাওয়া স্ত্রী ও ছেলেকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠালে তিনি সেখানেই ছুটে যান। হাসপাতালে ভর্তির কয়েক ঘণ্টা পর তাঁর স্ত্রী মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ছেলেও আর নেই। এখন তিনি কী নিয়ে বাঁচবেন!

পরিবারের পাঁচজন সদস্যকে হারিয়ে পাগলপ্রায় পরিবারের অন্য সদস্যরাও। অন্যদের সঙ্গে রাব্বির আরেক চাচা নূর নবী মা-বাবা ও ছোট ভাইয়ের মৃতদেহ নিতে গতকাল দুপুরে ভৈরব হাইওয়ে থানায় এসেছেন। থেমে থেমে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন তিনি। কালের কণ্ঠকে নূর নবী জানান, তাঁর মা-বাবাসহ পরিবারের সদস্যরা বছরব্যাপী গ্রামের মেলায় আসার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে। আজ সব শেষ হয়ে গেল।

একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছে ছাতিরচরের মো. হাসান মিয়া ও তাঁর পরিবারকে। গ্রামবাসী জানায়, হাসান ঢাকার কামরাঙ্গীরচরে রিকশা চালাতেন। পরিবার নিয়ে থাকতেন সেখানেই। মেলা উপলক্ষে তিনিও স্ত্রী হালিমা আক্তার (৩০), ছেলে ইশান (১০) ও শ্যালিকা জুম্মা আক্তার ওরফে ঝুমাকে (১৫) নিয়ে একই মাইক্রোতে বাড়ি ফিরছিলেন। দুর্ঘটনায় চারজনই প্রাণ হারায়।

হালিমার চাচা আব্দুল লতিফ চারজনের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন। গতকাল দুপুরে ভৈরব হাইওয়ে থানা চত্বরে পা বিছিয়ে বসে ছিলেন লতিফ। কথা প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে তিনি তাঁর ভাষায় বলেন, ‘রিকশা চালিয়ে সংসার চালাতেন হাসান। তাঁর আর আয়-রোজগার করতে হবে না। যাদের জন্য তিনি উপার্জন করতেন, তারাও তো কেউ নাই। ’

গতকাল দুপুরে একসঙ্গে এতগুলো লাশ ছাতিরচর গ্রামে পৌঁছার পর গ্রামজুড়ে ওঠে কান্নার রোল। লাশবাহী নৌকা ঘাটে ভেড়ার সঙ্গে সঙ্গেই হুমড়ি পেয়ে পড়ে হাজারো নারী-পুরুষ। বিকেলে জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে ১০ জনকে দাফন করা হয়। বাকি আরো দুজন; মা শারমিন ও ছেলে রাব্বির মৃতদেহ গ্রামে আসার অপেক্ষায় রয়েছে সবাই। গতকাল ছাতিরচর যেন মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়।


মন্তব্য