kalerkantho


তাড়াইল

৪১ ভূমিহীনের টাকা মারলেন দুই নেতা!

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে ৪১ জন ভূমিহীনের নামে সোনালী ব্যাংক থেকে প্রায় ১০ লাখ টাকা তুলে আত্মসাৎ করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই নেতা। সম্প্রতি ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর এক নেতা এলাকা ছেড়ে পালিয়েছেন।

আরেকজন পালিয়ে যাওয়া নেতার ওপর দোষ চাপিয়ে নিজেকে নির্দোষ দাবি করছেন। এ ঘটনায় চার সদস্যের একটি তদন্ত দল তাদের কাজ শুরু করেছে। এছাড়া সোনালী ব্যাংক তাড়াইল শাখার ব্যবস্থাপক কাশেম উদ্দিনকে রবিবার প্রত্যাহার করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, তাড়াইলের ধলা ইউনিয়নের উত্তর ধলা গ্রামের পিতৃ-মাতৃহীন দরিদ্র দিনমজুর বাক্প্রতিবন্ধী মো. খেলন মিয়ার (৩৫) বসবাসের ভিটাও নেই। তিনি তেউরিয়া বাজারের একটি রাইসমিলে থাকেন। অথচ তাঁর নামে গত বছরের ১২ ডিসেম্বর তাড়াইলের সোনালী ব্যাংক থেকে ২০ হাজার টাকা কৃষিঋণ উত্তোলন দেখানো হয়েছে। তবে ঋণটি নতুন নয়, পুরনো ঋণকে নবায়ন করে খেলনের নামে তা তোলা হয়েছে। অন্য ৪০ জনের সবাই তাঁর মতোই দরিদ্র। ব্যাংকের ঋণ বিতরণের রেজিস্টার ও ফাইল ঘেঁটে দেখা যায়, একই ইউনিয়নের গজেন্দ্রপুর গ্রামের মৃত আবদুর রহমানের স্ত্রী নুরেছা খাতুন ২০১৫ সালের ১০ নভেম্বর ১০ হাজার টাকার ঋণ নেন।

গত বছরের ২৩ নভেম্বর নুরেছা খাতুনের ঋণের সুদসহ ১২ হাজার টাকা জমা দেখিয়ে ২৩ ডিসেম্বর খেলনের নামে নুরেছার ঋণ নবায়ন করে ২০ হাজার টাকা তোলা হয়। এ ঋণের বিপরীতে খেলনের বাবা মৃত আলতু মিয়ার নামে ধলা মৌজার ৪৩৫ খতিয়ানের ছয়টি দাগে এক একর ২৩ শতক কৃষিজমির একটি মাঠ রেকর্ডের কপি দেখানো হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় ভূমি অফিসের মাঠ রেকর্ডের ভলিউমে ওই জমির মালিক হিসেবে ধলা গ্রামের মৃত মজলিস মিয়ার ছেলে কাশেম আলীর নাম রয়েছে। শুধু খেলন নন, এভাবে তাড়াইলের সোনালী ব্যাংক থেকে উত্তর ধলা ও তেউরিয়া গ্রামের ৪১ জনের নামে পুরনো ঋণের ফাইল থেকে ঋণগ্রহীতাদের কাগজপত্র সরিয়ে ভুয়া কাগজপত্র জমা দিয়ে দিনমজুর ও ভূমিহীনের নামে নবায়ন দেখিয়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা কৃষিঋণ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

উত্তর ধলা গ্রামের আবু চান, খুর্শিদ মিয়া, সুজন মিয়া, রুজেন মিয়া, মোহাম্মাদ আলী, বজলু মিয়াসহ ভুক্তভোগী লোকজন বলে, আওয়ামী লীগ নেতা তনু মিয়া আমাদের জানান, গরিব লোকজনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কিছু টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তিনি জনপ্রতি এক হাজার টাকা ব্যাংক থেকে তুলে দিতে পারবেন। তনু আমাদের তাড়াইল বাজারের একটি স্টুডিওতে নিয়ে সবার ছবি তুলে সোনালী ব্যাংকে নিয়ে যায়। সেখানে আগে থেকেই ছিলেন আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হক। প্রত্যেকের ভোটার আইডি কার্ড, কয়েকটি কাগজে স্বাক্ষর ও টিপসই নিয়ে ১০০ টাকা খরচ দেখিয়ে আমাদের ৯০০ টাকা করে দিয়েছেন। এখন ব্যাংকের লোকজন বলছে, আমরা নাকি ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছি।

অভিযোগ উঠেছে, ওই ৪১ জনকে সরকারি অনুদান দেওয়ার কথা বলে কিছু কাগজপত্রে তাদের টিপসই নিয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে স্থানীয় আওয়ামী লীগের দুই নেতা এসব ঋণ উত্তোলন করেন। সোনালী ব্যাংক তাড়াইল শাখা সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের ২৩ নভেম্বর থেকে চলতি বছরের ২২ জানুয়ারি পর্যন্ত ৪১ জনের নামে ২০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ উত্তোলন করা হয়। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর এসব নিরীহ দরিদ্র মানুষ ঋণ থেকে মুক্তি পেতে স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ গণ্যমান্য লোকদের কাছে ধরনা দিচ্ছে।

এদিকে অবস্থা বেগতিক দেখে এলাকা ছেড়েছেন অভিযুক্ত ধলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল হক ও সাবেক প্রচার সম্পাদক ও উত্তর ধলা গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে তনু মিয়া। জানা গেছে, প্রতিটি ঋণ বিতরণের ফরমে জামিনদার হিসেবে আবদুল হক স্বাক্ষর করেছেন।

নিয়ম অনুযায়ী জমি রয়েছে এবং কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদেরই কৃষিঋণ দেওয়া হয়। কিন্তু ওই ৪১ জনের নামে নবায়ন করে কৃষিঋণ উত্তোলন করা হলেও তারা সবাই ভূমিহীন দিনমজুর। তাদের সামান্য পরিমাণ কৃষিজমিও নেই। তারা আগে কখনো ব্যাংক থেকে কোনো ঋণও নেয়নি। অথচ তাদের নামে পুরনো ঋণ নবায়ন দেখানো হয়েছে।

এসব অভিযোগের বিষয়ে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক তনু মিয়ার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করা হলে তাঁকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয় লোকজন জানিয়েছে, ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর তিনি গাঢাকা দিয়েছেন। তাঁর মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে।

অভিযুক্ত ধলা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল হক বলেন, ‘তনু এসব লোককে ব্যাংকে নিয়ে গেছে, আর ঋণ দিয়েছেন ব্যাংকের ম্যানেজার ও আইও (ঋণ তাদারকি কর্মকর্তা)। আমি কিছু জানি না। ’ সব ঋণের জামিনদার হওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এসব লোককে চিনি, তাই জামিনদার হিসেবে স্বাক্ষর করেছি। ’

ধলা ইউনিয়নের কৃষিঋণ তদারকির দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যাংকের সিনিয়র কর্মকর্তা মো. শামছুজ্জামানের কাছে এ ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি জুনিয়র কর্মকর্তা মহেন্দ্র সরকারের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এ সময় তিনি আরো বলেন, ‘এসব ঋণের যাবতীয় কাজ তিনি করেছেন, আমি শুধু স্বাক্ষর করেছি। ’

সোনালী ব্যাংকের তাড়াইল শাখার জুনিয়র কর্মকর্তা মহেন্দ্র সরকার বলেন, ‘তড়িঘড়ি করে ঋণ বিতরণ করায় কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করার সময় পাইনি। ’ একজনের নামে দেওয়া ঋণ আরেকজনের নামে নবায়ন করে বিতরণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দেননি।

তাড়াইল শাখার ব্যবস্থাপক মো. কাশেম উদ্দিন প্রথমে সঠিক নিয়মে এসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে বলে দাবি করেন। তখন ভুয়া কাগজপত্র ও একজনের নেওয়া ঋণ আরেকজনের নামে নবায়ন করা যায় কি না জানতে চাইলে তিনি ঋণ বিতরণে অনিয়মের কথা স্বীকার করে বলেন, দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের কথা বিশ্বাস করে এসব ঋণ বিতরণ করা হয়েছে।

সোনালী ব্যাংক কিশোরগঞ্জ প্রিন্সিপাল শাখার ডিজিএম মীর আবদুল লতিফ বলেন, পুরনো গ্রাহকদের ঋণ নতুন গ্রাহকদের নামে নবায়ন করে বিতরণের নিয়ম নেই। এ ধরনের ঘটনা ব্যাংকিং আইনের পরিপন্থী। এমন হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 


মন্তব্য